লাল শাপলা বিলের সৌন্দর্য ম্লান করছে কচুরিপানা
সোমবার, ২৫ মে ২০২৬, ০৩:১৪ AM

লাল শাপলা বিলের সৌন্দর্য ম্লান করছে কচুরিপানা

সাইফুল ইসলাম বাবু, জৈন্তাপুর প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ১০/১১/২০২৫ ০১:২৪:১১ AM

লাল শাপলা বিলের সৌন্দর্য  ম্লান করছে কচুরিপানা

ছবি: জৈন্তা বার্তা


জৈন্তাপুর উপজেলার অন্যতম পর্যটনকেন্দ্র ডিবির হাওরের লাল শাপলা বিল। সারাদেশের ভ্রমণপিপাসু মানুষের কাছে এই ডিবির হাওরের লাল শাপলা বিল ইতোমধ্যে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেছে। সাধারণত নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত লাল শাপলা প্রাকৃতিকভাবে ফোটে। তবে চলতি বছর শীতকালীন পর্যটন মৌসুম শুরু হওয়ার সাথে সাথে লাল শাপলা বিলে প্রাকৃতিক এক বিপত্তি দেখা দিতে শুরু করেছে। 

দেখা গেছে, ডিবির হাওর এলাকায় সংরক্ষিত চারটি বিল ডিবি বিল, কেন্দ্রীবিল, ইয়ামবিল ও হরফকাটা বিলের বিশাল অংশজুড়ে গজিয়ে উঠেছে কচুরিপানা। দেখে মনে হয় লাল শাপলা বিল অল্প কয়েকদিনের মধ্যে কচুরিপানার রাজ্যে পরিণত হতে যাচ্ছে। 

২০১৪/১৫ সালের দিকে জৈন্তাপুর ফটোগ্রাফি সোসাইটির মাধ্যমে অপার সম্ভাবনার এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভ‚মি ডিবির হাওরের লাল শাপলা বিল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দর্শনার্থীদের নজরে আসে। ধীরে ধীরে শুরু হয় লোকসমাগম। এক পর্যায়ে জৈন্তাপুর উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই স্থাটিকে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে নেওয়া হয় কার্যকর পদক্ষেপ। শুকনো মৌসুমে বিলের পানি ধরে রাখতে বিশাল এলাকা নিয়ে দেওয়া হয় বাঁধ। পাশাপাশি বিশ্রামাগার ও শৌচাগার স্থাপন করা হয় এবং দর্শকদের জন্য উন্মুক্ত করা হয় ওয়াকওয়ে। 

শীতকালে শাপলার মৌসুমে পর্যটক ও দর্শনার্থীদের মৌলিক সুবিধা ও বিলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ধরে রাখতে গঠন করা হয় শাপলা বিল সুরক্ষা কমিটি। এই বিলের অন্যতম আরেকটি স্পট রাজা বিজয় সিংহের সমাধীর পুরাকীর্তি। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে থাকা এই পুরাকীর্তি সংরক্ষণে নেওয়া হয় কার্যকর পদক্ষেপ। সেই সাথে ডিবির হাওরের লাল শাপলা বিল এলাকায় বৃক্ষ না থাকায় সবুজের সমারোহ ঘটাতে ও দর্শনার্থীদের জন্য ছাড়াঘেরা পরিবেশ নিশ্চিত করতে বিলের বিশাল এলাকাজুড়ে তরুছায়া সামাজিক বনায়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হয়। বর্তমানে ২০২৫-২৬ পর্যটন মৌসুমে তরুছায়া সামাজিক বনায়ন দৃশ্যমান হওয়া শুরু করেছে, যা ডিবির হাওরের লাল শাপলা বিল এলাকায় বেড়াতে আসা পর্যটক ও দর্শনার্থীদের জন্য বাড়তি আকর্ষণ যোগ করেছে। এর পাশাপাশি গত মৌসুমে সিলেট-তামাবিল মহাসড়ক থেকে লাল শাপলা বিল পর্যন্ত যাওয়ার রাস্তাটি সংস্কারের আওতায় আনা হয়েছে। ব্যবস্থা করা হয়েছে সুবিশাল কার পার্কিংয়ের। 

ডিবির হাওরের লাল শাপলা বিলের ক্রমাগত এই উন্নয়নে বিপরীতে এর সৌন্দর্য গিলে খেতে বসেছে কচুরিপানা। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ইয়ানবিলের ৬৫ শতাংশ জুড়ে শুধু কচুরিপানা। এছাড়াও ডিবির হাওরের লাল শাপলা বিলের প্রবেশমুখের দুইপাশে বিলের অংশে কচুরিপানা ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়ে না। গত ২০২৪/২৫ মৌসুমে বিলের একটি অংশে উঁচু দ্বীপের মতো সৃষ্টি হলে সেখানে উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে সরিষা চাষ করা হয়েছিল। যার ফলে চারপাশে লাল শাপলার মাঝে হলুদ সরিষার সমারোহ বাড়তি আকর্ষণ সৃষ্টি করেছিল। কিন্তু বর্তমানে এই অংশটি শুধু কচুরিপানায় ভরপুর। এছাড়াও মূল ডিবি বিল এলাকা যেখানে পর্যটকরা নৌকায় উঠে রাজার সমাধি এলাকায় ভ্রমণ করেন, তার উত্তর প্রান্তে বড় এলাকাজুড়ে কচুরিপানা জন্মেছে। 

লাল শাপলা বিলে সপরিবারে বেড়াতে আসা সিলেট নগরীর দর্শনদেউড়ী এলাকার ইতালি প্রবাসী মোহাম্মদ শাহ্ নেওয়াজ জানান, ছাত্রজীবনে জাফলং এলাকায় একাধিকবার ঘুরতে এসেছিলেন। প্রবাসে থেকে ডিবির হাওরের লাল শাপলা বিলের অনেক ভিডিও ও কনটেন্ট নিয়মিত দেখে লাল শাপলা বিলে বেড়ানোর ইচ্ছা জাগে তার। তিনি দেশে এসে প্রথমবারের মতো লাল শাপলা বিল দেখতে আসেন। প্রথমে গাড়ি থেকে সাদা সাদা ফুল দেখে মনে করেছিলেন এগুলো শাপলা ফুল, হয়তো নতুন ফোটার পূর্বে সাদা রঙ ধারণ করেছে। কিন্তু কিছুদূর যেতেই তার ধারণা পাল্টে যায়। তিনি বুঝতে পারেন এই সাদা ফুলগুলো কচুরিপানার ফুল। এ সময় তিনি আক্ষেপ করে বলেন, লাল শাপলা দেখতে এসে কচুরিপানা দেখে গেলাম। 

এ বিষয়ে ডিবির হাওরের লাল শাপলা বিল সুরক্ষা কমিটির সভাপতি সাইফুল আহমেদ বলেন, বিগত সময়ে বিলে এত বেশি কচুরিপানা দেখা যায়নি। এ বছরই হঠাৎ এই সমস্যার দেখা মিলল। 

তিনি দাবি করেন, সুরক্ষা কমিটিতে যথেষ্ট বাজেট ঘাটতি রয়েছে। গত মৌসুমে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও কিছু উন্নয়নমুলক কাজের টাকা এখনও বাকি থেকে গেছে। 


কচুরিপানা অপসারণ করার বিষয়টি নিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সাথে আলোচনা করবেন বলে তিনি জানান। 

এ বিষয়ে জৈন্তাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জর্জ মিত্র চাকমা বলেন, নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে সুরক্ষা কমিটি, নৌকার মাঝি, ক্যামেরাম্যানসহ সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডারদের নিয়ে পর্যটন মৌসুমে সেবা নিশ্চিত করতে বৈঠকের মাধ্যমে দিকনির্দেশনা প্রদান করা হয়। কিন্তু কচুরিপানার এই সমস্যাটির কথা সেদিন কেউ তুলে ধরেননি। 

তিনি আরও বলেনচ, শাপলা বিল সুরক্ষা কমিটি এই দায়িত্ব পালন করার কথা। তাছাড়া লাল শাপলা বিল সুরক্ষা কমিটির পক্ষ থেকে আয়-ব্যয়ের কোনো সুনির্দিষ্ট হিসাবও দেওয়া হয়নি। এ ব্যাপারে অতিসত্বর সংশ্লিষ্টদের নিয়ে বৈঠক করা হবে। পাশাপাশি কচুরিপানা অপসারণে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। 



জৈন্তা বার্তা/ ওয়াদুদ