ছবি: জৈন্তা বার্তা
নগরীর টিলাগড় ইকো পার্কের ভেতর গড়ে তোলা বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ কেন্দ্রটি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অধিকাংশ প্রাণীই মারা গেছে। যেগুলো অবশিষ্ট আছে সেগুলোও অবহেলায় দিন পার করছে। শুরুতে ৬২টি প্রাণী নিয়ে কেন্দ্রটি চালু হলেও এখন কাগজে-কলমে প্রাণী আছে ৩৯টি। অবশ্য বাস্তবে অনেক প্রাণীরই খোঁজ মেলেনি। দর্শনার্থীরাও এখন খুব একটা আসেন না। যারা আসেন সংরক্ষণ কেন্দ্রের দুরবস্থা দেখে ফিরতে হয় হতাশ হয়ে। এর কারণ হিসেবে স্থানীয়রা অব্যবস্থাপনাকে দায়ী করলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বলছে লোকবল সংকটের কথা।
সরেজমিন দেখা গেছে, খাঁচা আছে, প্রাণী নেই, আবার কোথাও খাঁচার অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া মুশকিল। জরাজীর্ণ খাঁচায় বসবাস করছে প্রাণী। ঠিকমতো পরিচর্যা করা হয়না। প্রাণীদের জন্য নির্ধারিত খাঁচাগুলোর অবস্থা বেহাল, অপরিচ্ছন্ন। খাঁচার ওপর গাছের পাতা ও বৃষ্টির পানি জমে পচে গেছে। রঙিন মাছ ‘কই কার্প’ রাখার জন্য নির্মিত পুলের ভেতর ভাসছে ময়লা-আবর্জনা। ওপরে টানানো নেটে জমে রয়েছে গাছের পাতা। তিনটি পাখির খাঁচা খালি পড়ে রয়েছে। প্রাণীদের খাবার তৈরির জন্য শেডের টিনের চালা নষ্ট হয়ে গেছে। এ ছাড়া দুটি জেব্রা মারা যাওয়ায় জেব্রার জন্য নির্ধারিত স্থানটি খালি রয়েছে। এ ছাড়া বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ কেন্দ্রের মাঝখান দিয়ে থাকা ব্যস্ত সড়কে অবাধে চলছে যানবাহন। এসব যানবাহনের শব্দে ভয়ে খাঁচাবন্দি প্রাণী ছটফট করছে।
বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮ সালে ১১২ একর জায়গায় সিলেটের টিলাগড় ইকো পার্কের ভেতর গড়ে তোলা হয় বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ কেন্দ্র। শুরুতে ৬২টি প্রাণী নিয়ে কেন্দ্রটি চালু হলেও কিছুদিন যেতে না যেতেই দুটি জেব্রা, পাঁচটি ময়ূর, ১১টি কই কার্প মাছ, চারটি খরগোশ মারা গেছে। বর্তমানে প্রাণী আছে ৩৯টি।
সূত্র আরও জানায়, শুরুতে কেন্দ্রের ইজারা পায় ‘অমি এন্টারপ্রাইজ’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটির মালিক সিলেট মহানগর যুবলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সুবেদুর রহমান মুন্না। পাশাপাশি ক্যাফেটেরিয়ার ইজারাও নিয়েছিলেন তিনি। তবে গত বছরের ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান কেন্দ্রের ইজারাদার সুবেদুর রহমান মুন্না। এর প্রায় দেড় মাস পর কেন্দ্রের ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব থেকে অব্যাহতির আবেদন করেন সুবেদুর রহমান। এরপর নতুন করে দরপত্র আহŸান করে সিলেট বন বিভাগ। ইজারা পায় ‘জালাল এন্টারপ্রাইজ’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। তবে নতুন করে ইজারা দেওয়া হলে ৮ মাসেও ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ কেন্দ্রটি। ইজারাদার জানিয়েছেন বন বিভাগ আমাদের সাথে যে চুক্তি করেছিল সেটি তারা রাখেনি। ৮ মাস পার হলে তারা প্রাণী হস্তান্তর করতে পারেনি। ইজরা নিয়ে আমরা লোকসানে আছি। প্রাণী না থাকায় দর্শনার্থীরা কেন্দ্র থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংরক্ষণ কেন্দ্রের এনিম্যাল কিপার বলেন, ‘প্রথম ইজারাদার ইজারা নেওয়ার সময় রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ২৯ জন কর্মী নিয়েছিলেন। যাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল, তারা প্রাণীদেও ঠিকমতো দেখভাল করেনি। তারা টিকিট বিক্রিতে বেশি মনোযোগী ছিলেন। অনেক সময় দর্শনার্থীরা প্রাণীদের অযথা বিরক্ত করেছে, মানব খাবার দিয়ে অসুস্থ করার মতো ঘটনা ঘটেছে। আবার বড় বড় ইট দিয়ে আঘাতের ঘটনাও ঘটেছে। এসব দেখেননি ইজারাদারের লোকজন।
তিনি আর বলেন, ‘বর্তমানে কেন্দ্রের দ্বায়িত্বে আছেন মাত্র চার পাঁচজন। এখন যে অবস্থা ঠিকমতো তাদের বেতনই হয়না।’
স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা জানান, আগে অনেগুলো প্রাণী ছিল। এখন অনেক প্রাণীই নাই। খাঁচাগুলো খালি অবস্থায় পড়ে আছে। আগে প্রচুর দর্শনার্থী ঘুরতে আসতেন। এখন প্রাণী না থাকায় দর্শনার্থীরাও খুব একটা আসেন না। কেন্দ্রটি সংস্কার করে পুণরায় চালুর উদ্দ্যোগ নিতে সংশ্লিষ্টদের প্রতি দাবি জানান তারা।
বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ কেন্দ্রটি ইজারাদার মো. আমীর হোসেন বলেন, ‘ইজারা নেওয়ার সময় বন বিভাগ আমাদের সাথে যে চুক্তি করেছিল, সেটি তারা রাখেনি। ইজারা নেওয়ার ৮ মাস সময় পার হয়ে গেছে। অথচ এখনো পর্যন্ত তারা খাঁচায় প্রাণী দিতে পারে নি। বারবার বলার পরও বন বিভাগ কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না। ইজরা নিয়ে লোকসানে আছি।’
এ বিষয়ে বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. হুমায়ুন কবির, ‘শুরুতেই এটি অপরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা হয়েছে। পর্কের ভেতর দিয়ে অবাধে যান চলাচল করছে। মানুষের বাসাবাড়ি রয়েছে, তারা অবাধে যাতায়াত করছে। যে কারণে প্রাণীরা বিরক্তি অনুভব করছে, ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছে।’
তিনি বলেন, ‘প্রাণী সংরক্ষণ কেন্দ্রটি নিয়ে আমরা দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা হাতে নিয়েছি। প্রাণীগুলো ইকো পার্কের ভেতর থেকে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হবে। পাশাপাশি মিনি চিড়িয়াখানা ও দর্শনার্থীদের জন্য চিত্ত বিনোদনের ব্যবস্থা রাখা হবে।’
জৈন্তা বার্তা/ ওয়াদুদ




