ছবি:সংগৃহীত
চলতি সাপ্তাহে সারাদেশে চারদফা ভ‚মিকম্প হয়েছে। এ পর্যন্ত ভূমিকম্পে দেশের বিভিন্ন স্থানে ১০ জন নিহত এবং প্রায় ৬ শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগামী ৭২ ঘন্টা আবারো ভ‚মিকম্পের আশঙ্কা রয়েছে। এ অবস্থায় সিলেটেও ভ‚মিকম্প আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। ভ‚তাত্তি¡ক অবস্থানগত কারণে ভ‚মিকম্পের ‘উচ্চ ঝুঁকিতে’ রয়েছে সিলেট অঞ্চল। ২০১৯ সালে ২৪টি ভবনকে ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ ঘোষণা করে তালিকা তৈরি করে সিটি করপোরেশন, তার মধ্যে এখনো ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে ১৮টি ভবন। ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ এসব ভবনের বিষয়ে এবার হার্ডলাইনে যাচ্ছে প্রশাসন। প্রশাসনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ইতোমধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত সব ভবন ভেঙ্গে ফেলা হবে। আরও কোনো ঝুঁকিপূর্ণ ভবন আছে কিনা তা যাচাই করতে নতুন করে এসেসমেন্ট করা হবে।
জানা গেছে, সিলেটের অবস্থান ডাউকি ফল্ট লাইনের খুব কাছে। অনেকটা ডাউকি ফল্টের ওপর দাঁড়িয়ে এই অঞ্চল। অত্যন্ত সক্রিয় এই ফল্টের কারণে অতিমাত্রায় ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে সিলেট। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যেকোনো সময় এই অঞ্চলে সংঘটিত হতে পারে শক্তিশালী ভ‚মিকম্প। ফলে যেকোনো সময় উচ্চমাত্রার ভ‚মিকম্পে অবর্ণনীয় ক্ষতির সম্মুখীন হলে কিছুই করার থাকবে না।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত অন্তত সাতটি ভ‚মিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল সিলেট বিভাগে। রিখটার স্কেলে এসব ভ‚মিকম্পের মাত্রা ছিল ২ দশমিক ৮ থেকে ৪ দশমিক ৫ পর্যন্ত। পাশাপাশি গত দুই বছরে সিলেট ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় অন্তত দেড় শতাধিক ভ‚কম্পন অনুভ‚ত হয়েছে।
এতো ঝুঁকিপূর্ণ ও বার বার আলোচনায় আসার পরও সিলেট রক্ষায় নগর কর্তৃপক্ষের নেই কোনো তৎপরতা। ২০১৯ সালে নগরীর ২৪টি ভবনকে ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করে একটি তালিকা তৈরি করে সিসিক। প্রায় ছয় বছর পার হলেও তালিকায় থাকা ৪টি ভবন অপসারণ এবং আরও দুইটি ভবন বিশেষজ্ঞদের দ্বারা পুনঃসংস্কার করা ছাড়া বাকি ১৮টি ভবনের বিষয়ে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। প্রশাসনের অবহেলা ও গাফিলতির সুযোগে খোলস পাল্টে ফেলা হয়েছে সেই ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলোর। ঘষামাজা করে নতুন রং দিয়ে ঢেকে ফেলা হয়েছে পুরোনো জরাজীর্ণ পরিবেশ। দূর থেকে দেখলে বোঝার কোনো উপায়ই নেই যে এটি ভ‚মিকম্পের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
সিলেট সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে সিলেট নগরে ২৭টি ওয়ার্ডে ১৫ হাজার বাণিজ্যিক এবং ২২ হাজার আবাসিক ভবন রয়েছে। ২০১৯ সালের এপ্রিল মাসে ২৪টি ভবনকে ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ ঘোষণা করে তালিকা তৈরি করে সিসিক, তার মধ্যে এখনো ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে ১৮টি ভবন। এগুলোর মধ্যে রয়েছে কালেক্টরেট ভবন-৩, সমবায় ব্যাংক ভবন মার্কেট, মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার সাবেক কার্যালয় ভবন, সুরমা মার্কেট, বন্দর বাজার এলাকার সিটি সুপার মার্কেট, মিতালী ম্যানশন, দরগা গেটের আজমীর হোটেল, মধুবন মার্কেট, কানিশাইল এলাকার মান্নান ভিউ, শেখঘাটের শুভেচ্ছা-২২৬, চৌকিদেখী এলাকার ৫১/৩ সরকার ভবন, যতরপুরের নবপুষ্প-২৬/এ, জিন্দাবাজারের রাজা ম্যানশন, পুরানলেনের ৪/এ কিবরিয়া লজ, খারপাড়ার মিতালী-৭৪, মির্জা জাঙ্গালের মেঘনা-এ-৩৯/২, পাঠানটুলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, উত্তর বাগবাড়ীর ওয়ারিছ মঞ্জিল একতা-৩৭৭/৭, হোসেইন মঞ্জিল একতা-৩৭৭/৮, শাহনাজ রিয়াজ ভিলা একতা-৩৭৭/৯, বনকলাপাড়ার নূরানী-১৪, ধোপাদিঘী দক্ষিণপাড়ার পৌর বিপণি ও পৌর শপিং সেন্টার এবং পূর্ব পীরমহল্লার লেচুবাগান এলাকার ৬২/বি-প্রভাতী, শ্রীধরা হাউস।
এছাড়াও সিলেট শহরে গড়ে ওঠা প্রায় ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ ভবন নির্মাণে যথাযথ বিধিমালা মানা হয়নি। ফলে ভ‚মিকম্প হলে এ অঞ্চলে বিপুল প্রাণহানি ও সম্পদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে।
এ বিষয়ে সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল ও এনভায়রনমেন্ট ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মুশতাক আহমেদ বলেন, বর্তমানে সিলেটের অধিকাংশ স্থাপনাই উচ্চ মাত্রার ভ‚-কম্পন সহ্য করতে সক্ষম নয়। সিলেট শহরে প্রায় ৪২ হাজার ভবন রয়েছে। এসবের বেশিরভাগই পুরোনো ও দুর্বল। যেগুলো মাঝারি মাত্রার ভ‚মিকম্পেই ধসে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ভ‚মিকম্প হলে এ অঞ্চলে বিপুল প্রাণহানি ও সম্পদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘সিলেট অঞ্চলের মাত্র ৩০ শতাংশ ভবন বিল্ডিং কোড মেনে তৈরি করা হয়েছে। ৭০ শতাংশ ভবন বিল্ডিং কোড মেনে তৈরি করা হয়নি। এর মধ্যে যেগুলো বেশি ঝুঁকিপূর্ণ সেগুলো আমরা চিহ্নিত করে সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষের কাছে দিয়েছি। আমরা বিল্ডিংগুলো না ভেঙে সংস্কার করার পরামর্শ দিয়েছি।’
সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার ও সিটি করপোরেশনের প্রশাসক খান মো. রেজা-উন-নবী, বলেন, ‘নগরবাসীকে নিরাপদ রাখতে ইতোমধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত সব ভবন ভেঙ্গে ফেলা হবে। আরও কোনো ঝুঁকিপূর্ণ ভবন আছে কিনা তা যাচাই করতে নতুন করে এসেসমেন্ট করা হবে। উচ্চ পর্যায়ের একটি কমিটির মাধ্যমে যাচাই-বাছাই করে সেগুলোকে ভাঙ্গা হবে।
সিলেটের জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলম বলেন, ‘সিলেট নগরীর ২৩টি বিপজ্জনক ভবন ইতোমধ্যে চিহ্নিত করা হয়েছে। যেগুলো খুব শীঘ্রই ভেঙে ফেলা হবে। আগামী সপ্তাহ থেকেই অপসারণের কাজ শুরু হবে। নাগরিকদের সুরক্ষার জন্যই আমরা ভাঙার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’
জৈন্তা বার্তা/ ওয়াদুদ




