মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে অতিভারী বর্ষণের ফলে সিলেটের সকল নদ-নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে এখনও কোনো নদী বিপৎসীমা অতিক্রম করেনি। ভারী বর্ষনের ফলে সিলেট নগরীর কিছু এলাকাসহ জেলার সীমান্তবর্তী একাধিক নিম্নাঞ্চলে দেখা দিয়েছে জলাবদ্ধতা।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্রের তথ্যমতে, মঙ্গলবার সকাল ৯টা পর্যন্ত পূর্ববর্তী ২৪ ঘন্টায় সিলেট শহরে ৯২ মিলিমিটার, জৈন্তাপুর উপজেলার লালাখালে ২১৬ মিলিমিটার, গোয়াইনঘাট উপজেলার জাফলংয়ে ১৩৬ মিলিমিটার, বৃষ্টিপাত হয়েছে। এই সময়ে সুরমা নদীর পানি সিলেট পয়েন্টে ৩৭ সেন্টিমিটার ও কানাইঘাট পয়েন্টে ৩০ সেন্টিমিটার বেড়েছে। কুশিয়ারা নদীর পানি জকিগঞ্জের অমলশীদ পয়েন্টে ২৪ সেন্টিমিটার ও বিয়ানীবাজারের শেওলা পয়েন্টে ৪১ সেন্টিমিটার বেড়েছে। পিয়াইন নদীর পানি গোয়াইনঘাটের জাফলং পয়েন্টে ১০২ সেন্টিমিটার এবং সারী নদী জৈন্তাপুরের সারিঘাট পয়েন্টে ৮৯ সেন্টিমিটার ও গোয়াইনঘাট পয়েন্টে ৬০ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়েছে।
গোয়াইনঘাট এবং কানাইঘাট উপজেলার নদী তীরবর্তী এলাকাগুলোতে পানির প্রবল গতি ও ভাঙনের খবর পাওয়া গেছে। এসব এলাকায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সড়ক ও বহু কাঁচা ঘরবাড়ি। ফলে বন্যার আশঙ্কায় আতঙ্কিত এই দুই উপজেলার বাসিন্দারা। তবে কিছুটা স্বস্তির খবর হলো, মঙ্গলবার রাত থেকে বুধবার দুপুর পর্যন্ত সিলেটে বৃষ্টিপাত কম হয়েছে।
গোয়াইনঘাট থেকে আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, মুষলধারে বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলে গোয়াইনঘাট উপজেলায় বৃদ্ধি পেয়েছে সারী, গোয়াইন ও পিয়াইন নদীর পানি। পাহাড়ি ঢল নেমে পিয়াইন নদীতে প্রবল স্রোতের সৃষ্টি হয়েছে। মঙ্গলবার সকাল ১০টার দিকে ভারতের মেঘালয় থেকে নেমে আসা ঢলটি পিয়াইন নদী হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। এতে জাফলংয়ের জিরো পয়েন্টসহ আশপাশের এলাকা দ্রæত প্লাবিত হয়। নদীর পানি প্রবল বেগে প্রবাহিত হওয়ায় শুরু হয়েছে ভাঙন। এতে আশপাশের বসতি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো হুমকির মুখে পড়েছে।
স্থানীয় প্রশাসনের বরাতে জানা গেছে, কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই নদীর পানি বিপৎসীমার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। জাফলংয়ের অধিকাংশ পর্যটন এলাকা ইতোমধ্যে পানিতে তলিয়ে গেছে। ফলে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে সব ধরনের পর্যটন কার্যক্রম। নিরাপত্তার স্বার্থে স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
জাফলং টুরিস্ট পুলিশের ইউনিট ইনচার্জ ওসি মোহাম্মদ শাহাদাত হোসেন জানান, প্রচুর বৃষ্টিপাতের কারণে জাফলংয়ে ডাউকি নদীতে পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। ভাসমান ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের নিরাপদে অবস্থান করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে এবং পর্যটকদের নিরাপত্তায় টুরিস্ট পুলিশের পাশাপাশি থানা পুলিশ রয়েছে।
অপরদিকে বৃষ্টির কারণে নিম্ন আয়ের মানুষের বেড়েছে ভোগান্তি। দিনমজুরদের কাজকর্ম বন্ধ হয়ে গেছে একেবারেই। বৃষ্টির কারণে দুর্ভোগ ও ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে স্কুল-কলেজে আসা শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা বাঁধন কান্তি সরকার জানান, গোয়াইনঘাট উপজেলার তিনটি পয়েন্টে সারী, গোয়াইন ও পিয়াইন নদীর বিপৎসীমার আড়াই সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। মঙ্গলবার সকালে সিলেটে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ছিল ১০১ মিলিমিটার।
এদিকে, এ বছর গোয়াইনঘাট উপজেলায় স্বস্তি ও আনন্দে বোরো ধান ঘরে তুলতে পেরেছেন কৃষকরা। কোনোরকম প্রতিক‚ল আবহাওয়ার কবলে পড়তে হয়নি উপজেলার কৃষকদের। মাঠেই ধান কাটা, মাড়াই, ঝাড়াই ও শুকিয়ে গোলায় তুলতে পেরেছেন তারা।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রায়হান পারভেজ রনি জানান, উপজেলায় শতভাগ বোরো ধান কর্তন শেষ। শুধুমাত্র সমলয় পদ্ধতিতে চাষাবাদের আওতায় আনুমানিক ৩০ হেক্টর জমির বোরো ধান কাটা বাকি রয়েছে। বন্যা হলেও কৃষকদের বোরো ধানের ক্ষতি হওয়ার কোনো ধরনের আশঙ্কা নেই।
আমাদের কানাইঘাট প্রতিনিধি জানান, ভারী বৃষ্টিপাত ও উজান থেকে আসা পাহাড়ি ঢলে কানাইঘাট উপজেলার লক্ষীপ্রসাদ পূর্ব ও লক্ষীপ্রসাদ পশ্চিম ইউনিয়নের অনেক এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে করে পাকা, ইটসলিং ও কাঁচা রাস্তার ক্ষতিসাধন হয়েছে।
সোমবার রাত থেকে ভারী বর্ষণের ফলে পানিতে উপজেলার অনেক এলাকা তলিয়ে গিয়ে জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। বিশেষ করে ভারতের মেঘালয় রাজ্যে প্রচুর পরিমাণ বৃষ্টিপাত হওয়ায় পাহাড়ি ঢল নামে কানাইঘাটের লোভা নদীতে। মঙ্গলবার সকাল থেকে ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে লোভা নদীতে তীব্র স্রোত দেখা দেয়। বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে সুরমা নদীর পানি ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেলেও এখন পর্যন্ত বিপৎসীমার নিচে প্রবাহিত হচ্ছে।
ভারী বৃষ্টিপাত ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের কারণে বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার শঙ্কা থাকায় নদীর তীরবর্তী এলাকায় বসবাসরত লোকজনের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক বিরাজ করছে। পাহাড়ি ঢলের কারণে সীমান্তবর্তী লক্ষীপ্রসাদ পশ্চিম ইউনিয়নে তলিয়ে গেছে রাস্তাঘাট ও ফসলি ক্ষেতের জমি। ভোর থেকে ভারী বৃষ্টিপাত হওয়ার কারণে কানাইঘাট পৌরসভার বিভিন্ন এলাকা বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে।
এদিকে, মঙ্গলবার সকাল থেকে ভারতের উজান থেকে পাহাড়ি ঢল নামার খবর পেয়ে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আগাম প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তানিয়া আক্তার উপজেলার ৯টি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও জনপ্রতিনিধিদের সার্বিক খোঁজ-খবর নেয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন।
লক্ষীপ্রসাদ পশ্চিম ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মাওলানা জামাল উদ্দিন জানিয়েছেন, সিলেটে ভারী বর্ষণের পাশাপাশি ভারত সীমান্ত এলাকায় কয়েকদিন থেকে বৃষ্টিপাত হওয়ার কারণে পাহাড়ি ঢলের পানি সুরই নদী, আমরি ও সিঙ্গারীখাল দিয়ে প্রবাহিত হয়ে মঙ্গলবার সকাল থেকে তার ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা তলিয়ে যায়। এতে করে সুরইঘাট থেকে বাঘরা দেড়শ ফুট রাস্তার কয়েকটি স্থান পানির স্রোতে ভেঙে গেছে। গোরকপুর জিসি সড়কের মাটির রাস্তা ও সুরইঘাট থেকে মুলাগুল এলজিইডির পাকা সড়কের আব্দুল করিমের বাড়ির সামনের অংশ ভেঙে গেছে। এছাড়া বাদশা বাজার সংলগ্ন পয়েন্ট থেকে ডগিরপার ইটসলিং রাস্তা পানির নিচে তলিয়ে গেছে এবং কানাইঘাট-সুরইঘাট পাকা সড়কের লাল মসজিদ রাস্তার উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে।
জৈন্তা বার্তা/আরআর




