সিলেটে পর্যটক খরায় হতাশ ব্যবসায়ীরা
মঙ্গলবার, ০২ জুন ২০২৬, ০৩:০১ PM

সিলেটে পর্যটক খরায় হতাশ ব্যবসায়ীরা

মুহাজিরুল ইসলাম রাহাত, নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ০২/০৬/২০২৬ ০১:৪১:০৪ PM

সিলেটে পর্যটক খরায় হতাশ ব্যবসায়ীরা


ঈদুল আজহার ছুটিতে লোকসান কাটিয়ে ভালো ব্যবসার প্রত্যাশা করছিলেন সিলেটের পর্যটন ব্যবসায়ীরা। তবে তাদের প্রত্যাশা এবার ভেস্তে গেছে। ঈদের ছুটিতে দেশের অন্যতম শীর্ষ পর্যটন হাব সিলেটে এবার আশানুরূপ পর্যটক সমাগম হয়নি। বেশিরভাগ পর্যটনকেন্দ্রই ছিল শুনশান নীরব। অধিকাংশ হোটেল, মোটেল ও রিসোর্টের ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ কক্ষই ফাঁকা ছিল। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঈদের ছুটিতে সিলেটে এমন পর্যটক খরা এর আগে কখনো দেখা যায়নি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সিলেটের শীর্ষ পর্যটনকেন্দ্র জাফলং, ভোলাগঞ্জের সাদাপাথর, রাতারগুল সোয়াম্প ফরেস্ট ও বিছনাকান্দিসহ বিভিন্ন স্পটে ভ্রমণপিপাসুদের চিরচেনা সেই উপচে পড়া ভিড় এবার উধাও। আকর্ষণীয় এসব স্পটে পর্যটকদের উপস্থিতি ছিল হাতেগোনা। স্থানীয় কিছু দর্শনার্থী ছাড়া দূর-দূরান্ত থেকে আসা পর্যটকদের দেখা মিলছে না বললেই চলে।

সাদাপাথর পর্যটন কেন্দ্রের একাধিক নৌকাচালক ও ঘাট সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা যায়, বিগত বছরগুলোতে ঈদের ছুটিতে রযখানে দৈনিক ৪০০ থেকে ৪৫০টি ট্রিপ হতো, এবার তা নেমে এসেছে মাত্র ১০০-তে। একই অবস্থা জাফলংয়ের বিলাসবহুল রিসোর্টগুলোতেও, যেখানে বুকিংয়ের হার মাত্র ২০ থেকে ২৫ শতাংশ। অথচ স্বাভাবিক সময়ে এসব হোটেল-রিসোর্টে কক্ষ পাওয়াই দুষ্কর হয়ে পড়ে।

টানা বৃষ্টিপাত, ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের বেহাল দশা ও দীর্ঘ যানজট এবং দেশব্যাপী চলমান অর্থনৈতিক মন্দা- এই তিন মূল কারণে সিলেটে পর্যটক খরা দেখা দিয়েছে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা। পর্যটন সংশ্লিষ্টরা জানান, ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে ৬ লেনের উন্নয়নকাজ চলমান থাকায় বিভিন্ন স্থানে তীব্র যানজট লেগেই আছে। বিশেষ করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও শায়েস্তাগঞ্জ অংশে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গাড়ি আটকে থাকছে। আগে যেখানে ঢাকা থেকে সিলেটে পৌঁছাতে ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা লাগত, এখন সেখানে সময় লাগছে ১০ থেকে ১৫ ঘণ্টা। এই দীর্ঘ ও ভোগান্তিময় যাত্রার কারণে অনেকেই শেষ মুহূর্তে পরিবার নিয়ে সিলেট ভ্রমণের পরিকল্পনা বাতিল করছেন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রেলপথে জরাজীর্ণ দশা এবং ট্রেনের টিকিট সংকট। পাশাপাশি হামের প্রাদুর্ভাবের বিষয়টিও পর্যটকদের মনে কিছুটা নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।

জাফলং পর্যটনকেন্দ্র ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সভাপতি মো. হোসেন মিয়া হতাশা ব্যক্ত করে বলেন, ঈদের দীর্ঘ ছুটিতে এবার পর্যটকের ব্যাপক সমাগম হবে বলে আশা করছিলাম। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে গত ঈদের চেয়েও কম পর্যটক এবার।

জাফলং হোটেল-মোটেল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. ইলিয়াছ উদ্দিন লিপু বলেন, বছরের এ সময়টায় পর্যটকের চাপ সামলানোই কঠিন হয়; অথচ এবার হোটেল ও রিসোর্টের অনেক কক্ষ এখনও ফাঁকা পড়ে আছে।

সিলেট হোটেল ও গেস্ট হাউস ব্যবসায়ী সমিতির সাবেক সভাপতি সুমাত নূরী জুয়েল বলেন, গেল কয়েকদিনের টানা বৃষ্টি, মহাসড়কের দৈন্যদশা এবং অর্থনৈতিক সংকট- সবকিছুর সম্মিলিত প্রভাব পড়েছে আমাদের পর্যটন খাতে। তিনি আরও বলেন, এখন যারা সিলেট ঘুরতে আসেন তাদের বড় অংশই নিজস্ব গাড়ি বা রিজার্ভ পরিবহনে দিনে এসে দিনেই ফিরে যান। অন্যদিকে বিমানে ভ্রমণ করতে সক্ষম উচ্চ আয়ের পর্যটকদের উপস্থিতি থাকলেও সেই সংখ্যাও খুবই সীমিত। যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে সিলেটের হোটেল ও পর্যটন ব্যবসায়।

ট্যুরিজম ডেভেলপার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সহসভাপতি মোহাম্মদ খতিবুর রহমান বলেন, যোগাযোগ ব্যবস্থার দুর্ভোগই এখন বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে দ্বিগুণ সময় রাস্তায় পার করতে হলে পর্যটকদের আগ্রহ হারিয়ে ফেলাটাই স্বাভাবিক।

স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা জানান, দীর্ঘদিনের মন্দাভাব কাটিয়ে এবার ঈদে কোটি টাকার ব্যবসার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিলেন কসমেটিকস, হস্তশিল্প, খাবার হোটেল ও পর্যটন-নির্ভর ব্যবসায়ীরা। কিন্তু পর্যটক না আসায় এখন তাদের কপালে চিন্তার ভাঁজ।

ব্যবসায়ীদের দাবি, সিলেটের পর্যটন খাতকে বাঁচাতে হলে দ্রুত ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের দুর্ভোগ কমাতে হবে, ট্রেনের টিকিট সংকট নিরসন করতে হবে এবং সামগ্রিক যোগাযোগ ব্যবস্থাকে পর্যটনবান্ধব করতে হবে।

জৈন্তাবার্তা/আরআর