ছবি: নিজস্ব
ওসমানীনগর উপজেলার পশ্চিম পৈলনপুর ইউনিয়নের সাদীখাল সংলগ্ন সুতারখালি খালের উপর একটি সেতুর অভাবে সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন খাল তীরবর্তী মোবারকপুর গ্রামের হাজারও মানুষ। সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের পার্শ্ববর্তী স্থানে গ্রামটির অবস্থান হলেও একটিমাত্র সেতুর অভাব তাদের আলাদা করে রেখেছে আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা থেকে। গ্রামবাসীকে পারাপার হতে হয় ঝুঁকিপূর্ণ বাঁশের সাঁকো ব্যবহার করে।
দেখা গেছে, গ্রামের বাসিন্দারা নিজ নিজ বসতঘরে বসে সিলেট-ঢাকা মহাসড়ক দিয়ে বিভিন্ন প্রকার যানবাহন চলাচল করতে দেখতে পেলেও সেতু না থাকায় এ গ্রামের ভেতরে কোনোদিন কোনো প্রকার যানবাহনের চাকা মাটিতে লাগেনি। গ্রামের চতুর্দিক খালবেষ্টিত হওয়ায় এ গ্রামের অবস্থান যেন কোনো এক হাওরপাড়ের তীরে ছোট্ট একটা দ্বীপের মতো। বর্ষাকালে নৌকা আর শুকনো মৌসুমে বাঁশের সাঁকোই এই গ্রামের যোগাযোগ ব্যবস্থার মূল মাধ্যম। গ্রামের ভেতরে ১টি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ১টি মসজিদ ও ৩টি মন্দির রয়েছে। স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ের নির্বাচনী ভোটকেন্দ্র গ্রামের ভেতরে। গ্রামের বাসিন্দা ও শিক্ষার্থীদের উন্নত যোগাযোগের জন্য অতি দ্রæত একটি সেতু স্থাপন করতে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের প্রতি দাবি জানিয়েছেন গ্রামবাসী।
জানা যায়, স্বাধীনতার দীর্ঘদিন পরেও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি মোবারকপুর গ্রামে। গ্রামে-হিন্দু মুসলিম মিলে অন্তত ২৫০টি পরিবারের লোকজনে বসবাস। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক মিলে শিক্ষার্থী রয়েছে অন্তত ১৫০ জন। গ্রামের ভেতরে একমাত্র প্রাথমিক বিদ্যালয় হচ্ছে মোবারকপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। স্থানীয় ও জাতীয় নির্বাচনে এ বিদ্যালয়েই ভোটকেন্দ্র হয়ে থাকে। কিন্তু গ্রামবাসীর দুঃখ, স্বাধীনতার পর থেকে কোনো সরকারই এ গ্রামের পাশে সাদীখাল সংলগ্ন সুতারখালি খালের উপর একটি সেতু স্থাপন করেনি। ফলে উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাবে এ গ্রামে তেমন কোনো উন্নয়নও সাধিত হয়নি।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গ্রামের অধিকাংশ মানুষ মাছ ধরা এবং কৃষিকাজের সাথে জড়িত। পার্শ্ববর্তী সাদীখাল থেকে মাছ আহরণ এবং স্থানীয় জমিতে চাষাবাদ করে তাদের জীবিকা নির্বাহ করতে হয়। কিন্তু যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকায় তাদের উৎপাদিত ফসল এবং ধৃত মাছ সময়মতো বাজারজাত করতে পারেন না। গ্রামের ভেতরে অবস্থিত প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাশের মোস্তফাপুর ও খারোকোনা গ্রাম দু’টি থেকে শিক্ষার্থীরা আসে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠ শেষে শিক্ষার্থীরা পার্শ্ববর্তী সাদীপুর আদর্শ উচ্চবিদ্যালয়ে ভর্তি হয়। কিন্তু খালের উপর একটি সেট না থাকায় শিক্ষার্থীরা অতি কষ্টে তাদের বিদ্যালয়ে যাতায়াত করে থাকে। বৃদ্ধ কিংম্বা শিশুরা অসুস্থ হলে বর্ষাকালে নৌকায় আর শুকনো মৌসুমে বাঁশের সাঁকো দিয়ে সীমাহীন কষ্টের মধ্যে রোগী নিয়ে যাতায়াত করতে হয়। তাছাড়া সেতু না থাকায় গ্রামের ভেতরের রাস্তাটি পাকাকরণ প্রকল্পও নেয়া হচ্ছে না।
গ্রামের বাসিন্দা এসএসসি পরীক্ষার্থী রাজু আহমদ (১৬) বলে, আমরা অনেক কষ্ট করে বিদ্যালয়ে যাই। বর্ষায় মাঝে মধ্যে নৌকা ঘাটে না থাকলে আমাদের গ্রামের শিক্ষার্থীদের আর সেদিন বিদ্যালয়ে যাওয়া হয় না।
বৃদ্ধ ধিরু দাস (৬০) বলেন, আমরা নদীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করি। কিন্তু যোগাযোগ ব্যবস্থার অসুবিধার কারণে সময়মতো মাছ বাজারজাত করতে পারি না।
হরেন্দ্র দাস (৫৩) বলেন, একটি সেতুর অভাবে বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের যাতায়াতে অনেক কষ্ট হয়।
খলিলুর রহমান (৬৪) বলেন, আমাদের গ্রামের কেউ অসুস্থ হলে নৌকায় কিংম্বা বাঁশের সাঁকো দিয়ে চরম কষ্টের মধ্যে চিকিৎসালয়ে নিতে হয়। ব্যবসায়ী রনজিৎ রায় (৫৮) বলেন, একটি সেতুর অভাবে আমরা দ্বীপের মধ্যে পড়ে রয়েছি।
স্থানীয় বিএনপি নেতা সাইফুল আলম মুজিব বলেন, আমাদের গ্রামের উন্নয়নের জন্য একটি সেতু দরকার। আমরা সরকারের সুদৃষ্টি কামনা করছি।
পশ্চিম পৈলনপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা ও আজাদ বখত উচ্চবিদ্যালয় অ্যান্ড কলেজের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক শিহাবুর রহমান বলেন, একটি সেতুর অভাবে এ গ্রামটি অনেক পিছিয়ে রয়েছে। এখানে সেতু স্থাপন করা খুবই জরুরি।
পশ্চিম পৈলনপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান গোলাম রব্বানী চৌধুরী সুমন বলেন, মোবারকপুর গ্রামের লোকজন একটি সেতুর অভাবে চলাচলের ক্ষেত্রে সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। আমি নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে গিয়ে চেষ্টা করেছি একটি সেতু স্থাপনের জন্য। সেতু নির্মাণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সাথে আমার যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।
জৈন্তাবার্তা / সুলতানা




