জকিগঞ্জে কুশিয়ারা গিলছে ভিটেমাটি, বদলে যাচ্ছে এলাকার মানচিত্র
রবিবার, ৩১ মে ২০২৬, ০৬:২৩ PM

জকিগঞ্জে কুশিয়ারা গিলছে ভিটেমাটি, বদলে যাচ্ছে এলাকার মানচিত্র

আব্দুল মুকিত, জকিগঞ্জ প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ১৮/০৫/২০২৫ ০৯:৫৮:৩২ AM

জকিগঞ্জে কুশিয়ারা গিলছে ভিটেমাটি, বদলে যাচ্ছে এলাকার মানচিত্র

ছবি: নিজস্ব


বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব সীমান্তে অবস্থিত সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলা। এর তিন দিক ঘিরে আছে ভারতীয় সীমান্ত আর একপাশে কানাইঘাট ও বিয়ানীবাজার উপজেলা। এই অঞ্চলেই ভারত থেকে প্রবাহিত বরাক নদীর মোহনায় জন্ম নেয় সুরমা ও কুশিয়ারা নদী। এর মধ্যে কুশিয়ারা নদীর ২২ কিলোমিটার অংশ সরাসরি সীমান্ত নদী হিসেবে পরিচিত, যা জকিগঞ্জের বারঠাকুরী ইউনিয়নের আমলসীদ থেকে শুরু হয়ে বিরশ্রী ইউনিয়নের লক্ষীবাজার পর্যন্ত বিস্তৃত। 

এই কুশিয়ারা নদী এখন সীমান্ত এলাকার হাজারো মানুষের জন্য বেদনার কারণ। প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে এই নদীর তীরবর্তী এলাকায় দেখা দেয় ভয়াবহ ভাঙন। আমলসীদ থেকে লক্ষীবাজার পর্যন্ত বিস্তীর্ণ ফসলি জমি, বসতবাড়ি আর জনপদ একে একে বিলীন হয়ে যাচ্ছে নদীগর্ভে। বহু পরিবার হারিয়েছে তাদের শেষ সম্বল, অনেক মানুষ হয়েছেন নিঃস্ব। বদলে যাচ্ছে এলাকার মানচিত্র। 

কিছু এলাকায় ভাঙন রোধে সরকার উদ্যোগ নিলেও কার্যকারিতা নিয়ে রয়েছে প্রশ্ন। সমন্বিত পদক্ষেপের অভাবে দিন দিন পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠছে। বিশেষ করে জকিগঞ্জ সদর ইউনিয়নের লালগ্রাম, ফেউয়া, সেনাপতিরচক, রারাই, মুমিনপুর, মানিকপুর, বাখরশাল, ষরিসা, শষ্যকুড়ী ও ছবড়িয়া গ্রামগুলোতে ভাঙনের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। সময়মতো কাজ না হওয়ায় আজও প্রতিনিয়ত বিলীন হচ্ছে ফসলি জমি ও বসতবাড়ি। কুশিয়ারা যেন প্রতিদিন একটু একটু করে গিলে নিচ্ছে মানুষ, মাটি আর মানচিত্র। এই অব্যাহত ভাঙন শুধু স্থানীয় জনজীবন নয়, প্রশ্ন তুলছে জাতীয় নিরাপত্তা ও ভৌগোলিক সীমানা নিয়েও। সীমান্তবর্তী এ নদী যদি এভাবে গ্রাস করতে থাকে জনপদ ও ভ‚খÐ, তবে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের মানচিত্রও যে বদলে যাবে, তা আর অমূলক আশঙ্কা নয়। 

কুশিয়ারার ভাঙন কবলিত রারাই গ্রামের বাসিন্দা সাংবাদিক জুবায়ের আহমদ বলেন, একসময় আমাদের গ্রামটি অনেক বড় ছিল। নদীর ডাইক অনেক দূরে ছিল। নদীর তীরে বিশাল মাঠে ছেলেরা খেলাধুলা করে সাঁতার দিয়ে একসময় ওই পাড়ে চলে যেত। নদী এতটাই কাছে এসেছে যে এখন আমাদের বাড়িই নদীর পাড়ে। এরই মধ্যে কত লোকের বাড়িঘর নদীতে চলে গেছে। তারা এখন অন্যের দয়ার ওপর বাস করছেন। 

পাউবো সিলেট অফিসের নির্বাহী প্রকৌশলী দীপক রঞ্জন দাশ জানান, সুরমা-কুশিয়ারার ভাঙন ও বন্যা রোধে একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় দুই নদীর ১০৫ কিলোমিটার ড্রেজিং ও ৮ কিলোমিটার বাঁধ মেরামত করা হবে। প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা। 

বাংলাদেশ প্রান্তে ভাঙন ও ভারত অংশে চর জেগে ওঠা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমাদের অংশে নদীর পাড়েই জনবসতি। আর সকল বাড়িতেই পুকুর রয়েছে। পুকুরের সাথে নদীর সংযোগ থাকায় মাটি ও বালু নিচে নেমে যায়। এতে ভাঙন দেখা দেয়। অন্যদিকে, ভারত অংশে নদীরপাড় থেকে প্রায় ৫শ মিটার দূরে জনবসতি হওয়ায় ওই প্রান্ত না ভেঙে চর জাগছে। 

স্থানীয়রা বলছেন, পাউবোর প্রকল্পটি ঠিকমতো বাস্তবায়ন হলে কিছুটা স্বস্তি মিলতে পারে। তবে তাদের আশঙ্কা, প্রকল্পের দীর্ঘসূত্রতা কিংবা রাজনৈতিক প্রভাব এতে ব্যর্থতা ডেকে আনতে পারে। এখনই সময় কুশিয়ারা নদীর ভাঙন রোধে দীর্ঘমেয়াদী, টেকসই ও সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের। নয়তো ইতিহাস একদিন সাক্ষ্য দেবে, আমরা চোখের সামনে দেশকে ভাঙতে দেখেও নিরুত্তর থেকেছি।

জৈন্তাবার্তা / সুলতানা