ছবি: নিজস্ব
সিলেট বিভাগীয় পাসপোর্ট অফিসে ঢুকলেই বোঝা যায়, এখানে যেন টাকাই আসল পাসপোর্ট! ‘জাতীয় পরিচয়পত্রে সামান্য একটি স্পেলিং ভুল, জন্মসনদে বয়সের হেরফের কিংবা ফরম পূরণে ভুল’ এইসব সাধারণ সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় সাধারণ মানুষের দুর্ভোগের কারণ। আর দুর্নীতির সুযোগে ভাগ্য খুলে যায় কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও দালালের।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক দালাল জানান, ‘আইডিতে একটা ভুল থাকলেই খেলা শুরু। হাজার নয়, লাখও চলে যায়। কিন্তু ভাই, আমরা কয় টাকা পাই? সব যায় অফিসের ভেতরে। আমরাও তো খেলায় অংশ নেই, কিন্তু খেলোয়াড় বড় যারা ভেতরে বসে!’
আরও চমকপ্রদ তথ্য জানালেন ‘বা’ আদ্যাক্ষরের এক অভিজ্ঞ দালাল। জানালেন, আগের সরকার আমলে এক পরিচালককে দুর্নীতির অভিযোগে বদলি করা হয়েছিল। কিন্তু... নাটকীয়ভাবে কয়েক মাসের মধ্যেই আবারও সিলেটে ফিরে আসেন সেই একই কর্মকর্তা।
‘ওই পরিচালক ক্ষমতাধর। সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রীর স্ত্রী সেলিনা মোমেনের আনুক‚ল্য ছিল তার পেছনে। বিনিময়ে প্রতি সপ্তাহে মোমেন ফাউন্ডেশনে ২ লাখ টাকা দিতে হতো তাকে, ’ বললেন ওই দালাল।
দুর্নীতির এমন মহোৎসব দীর্ঘদিন চলতে থাকলে প্রশাসন দুএকবার কর্মকর্তাদের বদলি করা ছাড়া কোনো ব্যবস্থাই নেয়নি। গত মাসে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠেন সিলেট পাসপোর্ট অফিসের পরিচালক আব্দুল্লাহ আল মামুন। রাতারাতি ক‚টনৈতিক পাসপোর্টকে সাধারণ পাসপোর্টে রূপান্তরের মতো গুরুতর অভিযোগসহ, দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চার্জশিটের মুখে পড়ে বরখাস্ত হন তিনি। সরকারি চাকরি আইনের ৩৯ ধারার উপবিধি ২ মোতাবেক তার বরখাস্ত এখন অনেকের চোখে প্রতীকী বিজয়, কিন্তু আদতে কি সিন্ডিকেট ভাঙল?
কারণ, দুদক যতবার অভিযান চালায়, বাইরে থাকা দালালদের ধরেই যেন সব শেষ হয়ে যায়। অফিসের ভেতরের মূল পরিকল্পনাকারীরা বরাবরই থেকে যান ধরা ছোঁয়ার বাইরে।
একদল দালাল ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘সব সময় প্রশাসন আমাদের টার্গেট করে। অথচ মূল নাটের গুরু তো ভেতরে বসে! তাদের কিছু হয় না। আর আমরাই শুধু মিডিয়ার শিরোনাম হই।’
সিলেট পাসপোর্ট অফিস যেন এখন আর শুধু সরকারি একটি দপ্তর নয় এটি এক প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের দুর্গ, যেখানে সাধারণ মানুষের দুর্দশা এবং টাকার পাহাড় পাশাপাশি বাস করে।
অনুসন্ধানে জানা যায় সিলেট আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের এক অফিস সহকারি কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক ও ডাটা এন্ট্রি অপারেটরের নামের সিন্ডিকেটের বাণিজ্য অনেকটাই অপেন সিক্রেট। তাদের বিরুদ্ধে দুদুকে লিখিত অভিযোগও দেওয়া হয়েছে বারবার। সিলেট পাসপোর্ট অফিসের নিয়ন্ত্রণ এখন তাদের হাতে। ওদের একজন আগে নিজেকে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগনিক সম্পাদক শফিউল আলম চৌধুরী নাদেলের বিশ^স্ত হিসেবে নিজেকে পরিচয় দিতেন। সরকার পটপরিবর্তনের পর এখন তিনি নিজেকে যুবদল নেতার ভাই হিসেবে পরিচয় দেন। সিলেট জেলা যুবদলের ‘ম’ আদ্যাক্ষরের শীর্ষ এক নেতার নাম ভাঙ্গিয়ে তিনি নতুন মার্কার সিন্ডিকেট গড়েন বলে সূত্র জানিয়েছে। যদিও ওই যুবদল নেতা বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। তিনি জানান, বিষয়টি সম্পূর্ণ মিথ্যা। এই নামে তিনি কাউকে চেনেন না। এই সিন্ডিকেটের সাথেও তার কেনো সম্পর্ক নেই।
‘জ’ ‘ম’ ‘স’ ‘র’ আদ্যাক্ষরের চারজনই পাসপোর্ট অফিস নিয়ন্ত্রণ করেন। এর বাইরে আরো দুটি সিন্ডিকেট রয়েছে অফিসের ভিতরে, অফিসের আনসার সদস্য কয়েকজন। তাদের রয়েছে একটি নিজস্ব সিন্ডিকেট। তারা পাসপোর্ট অফিসের বাইরের ফটোকপির দোকাগুলোর সাথে যোগাযোগ রক্ষা করেন।
সূত্র আরও জানায়, অফিসের বাইরের আলমপুরের রুবেল আহমদ, আমিন উদ্দিন, কবির মিয়া, জানু মিয়া, তামিম আহমদ, দেলোয়ার হোসেন, শামিম আহমদসহ আরো ১০/১২ জনের একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। সকাল হলেই এরা পাসপোর্ট অফিসের ভেতরে বাহিরে অবস্থান নেয়।
পাসপোর্ট প্রত্যাশীদের অভিযোগ, দালাল না ধরে নিজে পাসপোর্টের জন্য আবেদন করলে পদে পদে হয়রানির শিকার হতে হয়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে আবেদনপত্র জমা দেওয়ার পর ‘অযথা ভুল’ ধরেন কর্মকর্তারা। অনেক সময় সেটি গ্রহণ করেন না। সংশোধন করে জমা দিলেও আবার আরেকটি ভুল ধরা হয়। এভাবে ভুল শুধরে আবেদন জমা দিতে দিনের পর দিন ছোটাছুটি করতে হয়। তবে দালাল ধরে আবেদন করলে আবেদনপত্রে ‘বিশেষ চিহ্ন’ দেওয়া থাকে। এতে এক দিনেই ফিঙ্গারপ্রিন্ট, ছবি তোলার সুযোগসহ দ্রæত পাসপোর্ট পান আবেদনকারীরা।
পাসপোর্ট প্রত্যাশীদের দাবি, প্রতিদিন গড়ে ৮০০ জন পাসপোর্টের জন্য আবেদন করেন। এর ৮৫ শতাংশ আবেদনকারীই দালালের শরণাপন্ন হন। এতে সরকারি ফির অতিরিক্ত খরচ হয় আড়াই হাজার টাকা। কোনো জটিলতা থাকলে পাসপোর্ট পেতে আরও বেশি টাকা দিতে হয়। প্রতিদিন কার্যালয়টিতে গড়ে ১৮ লাখ টাকার অবৈধ লেনদেন হয়।
আলমপুরে পাসপোর্ট অফিসে সক্রিয় ৫০ থেকে ৬০ জন দালাল। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক দালাল জৈন্তাবার্তার এই প্রতিবেদকের কাছে দাবি করে, শতাধিক ট্রাভেল এজেন্সি পাসপোর্ট প্রত্যাশীদের আবেদনপত্র পূরণ করে থাকে। দালাল ও ট্রাভেল এজেন্সির পূরণ করা আবেদনপত্র শনাক্তে বিশেষ চিহ্ন দেওয়া থাকে। এসব আবেদনকারী হয়রানি ছাড়াই পাসপোর্টের আবেদন জমা দিতে পারেন। চিহ্ন হিসাব করে দালাল ও এজেন্সিগুলো প্রতিদিনের নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা প্রতিদিন সন্ধ্যায় কর্মকর্তাদের বুঝিয়ে দেন। এ ক্ষেত্রে ২ হাজার ৫০০ টাকার মধ্যে ২ হাজার ১০০ টাকা কর্মকর্তাদের দিতে হয়।
তবে দৈনিক গড়ে ১৮ লাখ টাকা অবৈধ লেনদেনের অভিযোগ সঠিক নয় বলে দাবি করেছেন সিলেট পাসপোর্ট অফিসের সহকারী পরিচালক (তথ্য প্রদানকারী কর্মকর্তা) এ কে এম মোতাহার হোসেন। তিনি বলেন, ‘আবেদনপত্র পূরণ করতে গিয়ে অনেকে নাম, জন্মস্থান, জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) নম্বর লেখায় ভুল করছেন। যথাযথ তথ্য দিয়ে আবেদন না করার কারণে তাঁদের সংশোধন করতে বলা হয়ে থাকে। তাঁর দাবি, দালাল বা ট্রাভেল এজেন্সিকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয় না। আবেদনে কোনো বিশেষ চিহ্নও থাকে না।’
এ কে এম মোতাহার হোসেন আরও বলেন, ‘কখনো কখনো সরকারি-বেসরকারি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি বা তাঁদের সুপারিশপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে লাইন ছাড়াও ফিঙ্গার প্রিন্ট ও ছবি তোলার সুযোগ দেওয়া হয়। তবে পুলিশ বা আনসার সদস্যরা এর জন্য টাকা নেন না।’
এদিকে, পাসপোর্ট আবেদন করতে গিয়ে নির্দিষ্ট আটটি ভোগান্তির শিকার হতে হয় বলে উল্লেখ করেছেন আবেদনকারীরা। এসবের মধ্যে রয়েছে পাসপোর্ট কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের দুর্ব্যবহার, বিশেষ চিহ্ন ছাড়া আবেদন গ্রহণে অনীহা, দালালের মাধ্যমে আবেদন না করলে সব তথ্য ঠিক থাকলেও ইচ্ছাকৃত ভোগান্তিতে ফেলা, দায়িত্বরত পুলিশ ও আনসার সদস্যদের অনৈতিক সুবিধা গ্রহণ, সার্ভার ডাউনজনিত সমস্যা, নির্ধারিত সময়ে পাসপোর্ট না পাওয়া।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে সিলেট পাসপোর্ট অফিসের সহকারী পরিচালক (তথ্য প্রদানকারী কর্মকর্তা) এ কে এম মোতাহার হোসেন জৈন্তা বার্তাকে বলেন, ‘অধিকাংশ আবেদনকারি আবেদন করতে গিয়ে ভ‚ল করেন। অনেকের ফাইল অসম্পূর্ণ থাকে। এগুলো তো যাচাই-বাছাই করে নিতে হয়। এখন কেউ ভ‚ল আবেদন বা অসম্পূর্ণ ফাইল নিয়ে আসলে সেটা তো আমরা জমা রাখতে পারিনা।’
সিন্ডিকেট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমার অফিসের কেউ সিন্ডিকেটের সাথে জড়িত নয়। আপনি যাদের নাম বলেছেন। আমি তাদের ব্যাপারে খোঁজ নিয়ে দেখব। জড়িত প্রমাণ পেলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেব। আর বাইরের দালালদের বিষয়ে তো আমি কিছু বলতে পারি না। সেটা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দেখার কথা।’
জৈন্তাবার্তা / রহমান




