ফাইল ছবি
সিলেটের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে যে কজন মানুষ যুগান্তকারী ভূমিকা রেখে গেছেন, এনামুল মুনির তাঁদের মধ্যে অগ্রগণ্য। নাট্যজগতের মঞ্চে তিনি ছিলেন যেমন দক্ষ অভিনেতা, তেমনি ছিলেন নির্ভরযোগ্য নির্দেশক ও সংগঠক। আজ তিনি আর নেই — এই বেদনাবিধুর সংবাদ শোকের ছায়া ফেলেছে সারা সিলেটবাসীর হৃদয়ে।
শনিবার (৩১ মে) দিবাগত রাত পৌনে ১টার দিকে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি সিলেট মহানগরীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। হঠাৎ অসুস্থতা বোধ করায় তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হলেও, শেষ রক্ষা হয়নি। চিকিৎসকেরা জানান, হাসপাতালে পৌঁছার আগেই তাঁর প্রাণপাখি উড়ে যায়।
মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৩ বছর। তিনি স্ত্রী, এক পুত্র, এক কন্যা এবং অসংখ্য শুভানুধ্যায়ী ও সংস্কৃতি অনুরাগী রেখে গেছেন।
রবিবার (১ জুন) বাদ জোহর নগরীর কুমারপাড়া জামে মসজিদ প্রাঙ্গণে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা শেষে স্থানীয় কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়। জানাজায় অংশগ্রহণ করেন বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধি, সহকর্মী, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং সমাজের বিশিষ্টজনেরা। চারপাশে শুধু একটাই কথা: এনামুল ভাই আর নেই, এটা বিশ্বাস করা কঠিন।
এনামুল মুনিরের নাট্যজীবনের সূচনা হয়েছিল বাংলাদেশ বেতারে তালিকাভুক্ত নাট্যশিল্পী হিসেবে। কণ্ঠনাট্য থেকে শুরু করে মঞ্চনাট্য— প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি রেখে গেছেন দক্ষতার ছাপ। তাঁর অভিনীত নাটকগুলো ছিল সমাজ ও মানবিক বোধের আয়না। নাট্যরচনায় যেমন ছিল ভাষার সৌন্দর্য, তেমনি নির্দেশনায় ছিল দৃঢ়তার স্পর্শ।
তিনি ছিলেন নাট্যসংগঠন ‘কথাকলি’-এর সাধারণ সম্পাদক, যেখানে তাঁর নেতৃত্বে গড়ে উঠেছে অনেক নতুন নাট্যকর্মী, যাঁরা এখন নিজ নিজ অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত। এনামুল মুনির ছিলেন একজন সত্যিকারের পথপ্রদর্শক, যিনি নিজে যেমন কাজ করেছেন, তেমনি অন্যদেরও উদ্বুদ্ধ করেছেন।
তিনি ‘সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট সিলেট’-এর প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক হিসেবে নেতৃত্ব দিয়েছেন স্থানীয় সংস্কৃতি আন্দোলনে। একসময় যখন সিলেটের মঞ্চনাট্য ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড স্থবির হয়ে পড়েছিল, তখন তাঁর হাত ধরেই নতুন প্রাণ ফিরে পায় নাট্যচর্চা।
নাট্যচর্চা ছিল এনামুল মুনিরের নিঃশ্বাসের মতো। তিনি কোনোদিন এটিকে চাকরি বা দায়িত্ব মনে করেননি— এটি ছিল তাঁর জীবনের ভালোবাসা, তাঁর নেশা। বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি থেমে যাননি। বরং সে সব প্রতিবন্ধকতাকে শিল্পচর্চার শক্তিতে পরিণত করেছেন।
তাঁর নির্দেশিত নাটকগুলোয় বারবার উঠে এসেছে গণমানুষের কথা, প্রতিবাদ, মুক্তির আকাঙ্ক্ষা, এবং মানবতাবাদী মূল্যবোধ। তাঁর রচনায় ফুটে উঠেছে বাংলার মাটি, মানুষ, সংগ্রাম ও ইতিহাসের গন্ধ। তরুণ প্রজন্মকে নাট্যচর্চায় আগ্রহী করে তোলার জন্য তিনি কাজ করেছেন নিজ অর্থে, নিজের শ্রমে
এনামুল মুনিরের মৃত্যুতে যে শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে, তা সহজে পূরণ হবার নয়। তাঁর মতো অভিজ্ঞ, পরিশ্রমী, দূরদর্শী নাট্যব্যক্তিত্ব আজ দুর্লভ। তাঁর প্রয়াণে শুধু একটি মানুষ নয়, একটি প্রতিষ্ঠান, একটি প্রজন্মের অভিভাবক হারিয়ে গেল।
সিলেটের বিভিন্ন নাট্য ও সাংস্কৃতিক সংগঠন তাঁর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছে। অনেকেই সামাজিক মাধ্যমে স্মৃতিচারণ করেছেন তাঁর সঙ্গে কাটানো সময়, নির্দেশনায় অংশ নেওয়া নাটক, বা ব্যক্তিগত পরামর্শের কথা।
এনামুল মুনির ছিলেন এমন একজন মানুষ, যিনি নিজের নামের চেয়ে কাজ দিয়ে বেশি পরিচিত ছিলেন। তিনি নিজেকে বড় করে তোলেননি—বরং আশেপাশের মানুষদের বড় হতে সাহায্য করেছেন। এটাই একজন সত্যিকারের সাংস্কৃতিক যোদ্ধার পরিচয়।
তাঁর মৃত্যু আমাদের কাঁদায়, কিন্তু তাঁর কর্ম আমাদের শেখায় কিভাবে ভালোবাসতে হয় সংস্কৃতিকে, কিভাবে লড়াই করতে হয় নীরব থেকে, কিভাবে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যেতে হয় নাট্যচর্চার পথ ধরে। তাঁর স্মৃতি ও অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

জৈন্তাবার্তা / মনোয়ার




