ছবি: নিজস্ব
সিলেটের নদীতীরবর্তী জকিগঞ্জ, বিয়ানীবাজার, গোলাপগঞ্জ ও ওসমানীনগর উপজেলায় বিস্তৃত হচ্ছে বন্যা। প্লাবিত হচ্ছে নতুন নতুন এলাকা। তলিয়ে যাচ্ছে বসতবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও হাটবাজার। কোথাও নদীর ডাইক ভেঙে আবার কোথাও নদী উপচে প্রবল¯্রােতে লোকালয়ে প্রবেশ করেছে বানের পানি। এসব এলাকার বাসিন্দাদের মাঝে ভিটেমাটি হারানো শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
অনেকে বাড়িঘর ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে ছুঁটছেন। কেউ স্বজন কেউবা আবার আশ্রয়কেন্দ্রে গিয়ে উঠেছেন। সংশ্লিষ্ট উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছে, বন্যা পরিস্থিতি মোকাবেলায় সব ধরণের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত ও পর্যপ্ত ত্রাণসামগ্রী মজুদ রাখা হয়েছে।
এদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের এক প্রতিবেনে দেখা গেছে, মঙ্গলবার সন্ধ্যা ছয়টায় সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর চারটি পয়েন্টে পানি এখনো বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। এর মধ্যে সুরমা নদীর কানাইঘাট পয়েন্ট ৯৯ সেন্টিমিটার, কুশিয়ারা নদীর আমলশীদ পয়েন্টে ১৯৪ সেন্টিমিটার, শেওলা পয়েন্টে ৪৮ সেন্টিমিটার এবং ফেঞ্চুগঞ্জ পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ৫৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল।
আমাদের জকিগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, সীমান্তবর্তী এই উপজেলার বিভিন্ন স্থানে বাঁধ ভেঙে পানি লোকালয়ে প্রবেশ করছে। প্লাবিত হচ্ছে নতুন নতুন এলাকা। জকিগঞ্জ বাজার প্লাবিত হওয়ায় ব্যবসায়ী ও পথচারীরা বেশ দুর্ভোগে পড়েছেন। অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে বানের পানি ঢুকে পড়েছে। স্থানীয় লোকজন জানান, জকিগঞ্জ সদর ইউনিয়নের রারাই ও ভাখরশাল গ্রাম, পৌরসভার ছয়লেন এলাকা, খলাছড়া ইউনিয়নের লোহারমহল, বীরশ্রী ইউনিয়নের সুপ্রাকান্দি, লাফাকোনা ও লক্ষীবাজারসহ শতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়েছে।
এছাড়া পৌর শহরের কেছরী গ্রামে নদী উপচে পানি লোকালয়ে প্রবেশ করছে। এতে জকিগঞ্জ পৌর শহরের বেশির ভাগ এলাকায় প্লাবন দেখা দিয়েছে। ছবড়িয়া, সেনাপতির চক, ইছাপুর, পিল্লাকান্দি, আমলসীদ, গদাধর ও বড়ছালিয়াসহ অর্ধশতাধিক এলাকায় নদীর বাঁধ উপচে পানি প্রবেশ করছে। নদীতীরবর্তী এলাকার ঘরবাড়ি পানিতে তলিয়ে গেছে। অনেকে বাড়িঘর ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাচ্ছেন।
জকিগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাহমুদুর রহমান বলেন, ‘প্রশাসন সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। দুর্গত লোকজনকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নিতে প্রস্তুতি চলছে। কয়েকটি আশ্রয় কেন্দ্র চালু করা হয়েছে।’
আমাদের বিয়ানীবাজার প্রতিনিধি জানান, উপজেলার অন্তত ৭টি ইউনিয়নের বিস্তৃর্ণ অঞ্চল এখন পানির নিচে। বন্যায় প্লাবিত হয়েছে রাস্তাঘাট। এছাড়া টানা বৃষ্টিতে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় কাঁচা ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। এখন পর্যন্ত উপজেলার লাউতা ইউনিয়নের নিজ বাহাদুরপুর, গজারাই, মোল্লাপুর ইউনিয়নের আলীনগর, লামানিদনপুর, কটুখালিপার, লাসাইতলা, দুবাগ ইউনিয়নের দক্ষিণ দুবাগ, চরিয়া, শেওলা ইউনিয়নের বালিঙ্গা, কাকরদিয়া শেওলা, মুড়িয়া ইউনিয়নের সারপার, তাজপুর, নয়াগ্রাম, কোনাগ্রাম, তিলপারা ইউনিয়নের মাটিজুরা, দাসউরা, তিলপারা, কুড়ারবাজার ইউনিয়নের গোবিন্দশ্রী, মোহাম্মদপুর, আখাজনা, বৈরাগীবাজার, এবং আলীনগর ও চারখাই ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রাম বন্যায় প্লবিত হয়েছে।
এছাড়া মোহাম্মদপুর মাদ্রাসা এবং বিয়ানীবাজার উপজেলার প্রায় ৩০টি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয় পানিতে তলিয়ে গেছে। বৈরাগীবাজার ও দুবাগ বাজার বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। এছাড়া রাস্ত—াঘাটে পানি উঠে যাওয়ার কারণে বেশ কয়েকটি সড়ক দিয়ে যানবাহন চলাচলে বিঘœ ঘটছে।
লাসাইতলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আশ্রয় নিয়েছেন আলতাফ হোসেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের বাড়িতে পানি উঠে গেছে, সে জন্য পরিবার নিয়ে গত পরশু থেকে এখানে আশ্রয় নিয়েছি। এখানে ৫টি পরিবার আশ্রয় নিয়েছে।’
বৈরাগীবাজার মাদ্রাসায় আশ্রয় নেওয়া হুছনা বেগম বলেন, ‘ঘরের ভিতর পানি ঢুক গেছে। খুব কষ্টে আছি, রাস্তার মধ্যে পানি। এভাবে কত দিন থাকতে হবে জানা নেই।’
বিয়ানীবাজার উপজেলা নির্বাহী অফিসার গোলাম মুস্তাফা মুন্না জানান, পর্যাপ্ত ত্রাণ সামগ্রী বরাদ্দ আছে। ইতোমধ্যে আশ্রয়কেন্দ্রে কবলিত এলাকার বাসিন্দারা আশ্রয় নিয়েছেন। বন্যার্তদের মাঝে বিতরণের জন্য ৪৪ মেট্রিক টন চাল, নগদ ৫০ হাজার টাকা ও ১৪৫ প্যাকেট শুকনো খাবার বরাদ্দ করা হয়েছে।
আমাদের গোলাপগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, গোলাপগঞ্জে কুশিয়ারা নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে উপজেলার বুধবারিবাজার ইউপির প্রায় ১২শত পরিবার বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়েছে৷
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বুধবারী বাজার ইউনিয়নের কালিজুরী, বাগিরঘাট, শিকপুর, ছত্তিশ সহ কয়েকটি গ্রাম বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়েছে। এছাড়াও বাঘা, গোলাপগঞ্জ সদর, ল²ীপাশা, ঢাকাদক্ষিণ, লক্ষণাবন্দ ও পশ্চিম আমুড়া ইউনিয়নের বিভিন্ন জায়গায় ভ‚মিধস হয়েছে। এতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার ফয়সল মাহমুদ ফুয়াদ জানান, গোলাপগঞ্জের মধ্যে একমাত্র বুধবারী বাজার ইউপির ১২ হাজার ৫০টি পরিবার পানিবন্দি হয়েছে। ইতোমধ্যে প্রশাসনের পক্ষ থেকে ৬০টি আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হয়েছে। প্রত্যেকটি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রয়েছে। পাশাপাশি ১৪৮ প্যাকেট শুকনা খাবার, ২০মেট্রিক টন চাল, শিশু খাদ্য বাবদ ১ লক্ষ টাকা এবং গো খাদ্য বাবদ ১ লক্ষ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।
আমাদের ওসমানীনগর প্রতিনিধি জানান, উপজেলায় বিভিন্ন এলাকায় বৃষ্টির পানিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে অনেকের ঘরবাড়ি ও রাস্তাঘাট তলিয়ে গিয়ে দুর্ভোগ তৈরি করেছে। নিম্নাঞ্চলের ঘরবাড়ির আঙ্গিনায় পানি চলে আসায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। জনপ্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, নিম্নাঞ্চলে বন্যা দেখা দিয়েছে এবং পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। সাদীপুর ইউনিয়নের খসরুপুর বাজার ও বিভিন্ন গ্রামের মানুষের ঘরবাড়ির আঙ্গিনায় পানি উঠেছে। কুশিয়ারার পানি বৃদ্ধি পেলে খসরুপুর, লামা তাজপুর, সুন্দিখলা, চর তাজপুরসহ কয়েকটি গ্রাম তলিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। উসমানপুর ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চলের রাস্তাঘাট তলিয়ে গেছে। পানি বৃদ্ধি পেলে মানুষের ঘরবাড়ি তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অতিবৃষ্টির কারণে বৃষ্টির পানি জমে বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে।
উপজেলা প্রশাসন জানায়, এরই মধ্যে ৭৩টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত করা হয়েছে। এ পর্যন্ত দয়ামীর ইউনিয়নের সদরুন্নেছা উচ্চ বিদ্যালয়ে তিনটি পরিবার আশ্রয় নিয়েছে। দয়ামীর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান এসটি এম ফখর উদ্দিন বলেন, আমার ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চলে বন্যা দেখা দিতে শুরু করেছে। এখন পর্যন্ত তিনটি পরিবার আশ্রয়কেন্দ্রে এসে আশ্রয় নিয়েছে।
ওসমানীনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জয়নাল আবেদীন বলেন, বন্যার আশঙ্কা সৃষ্টি হওয়ায় ৭৩টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে খাবার সামগ্রী প্রদান করা হয়েছে। এ ছাড়াও ১৫০ প্যাকেট শুকনো খাবার ও ২০ টন চাল রির্জাভ রাখা হয়েছে। প্রতিটি ইউনিয়নের জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে যোগাযোগ করে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। মেডিকেল টিম প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
জৈন্তাবার্তা / মনোয়ার




