ছবি: নিজস্ব
সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার দুই ইউনিয়নের ১৫টি গ্রামের বাসিন্দাদের বিভক্তকারী নদীর নাম কাঁপনা নদী। নদীটি পার হতে এসব গ্রামের বাসিন্দাদের শীতকালে একমাত্র ভরসা একটি নড়বড়ে সাঁকো আর বর্ষাকালে খেয়া নৌকা। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দুই ইউনয়নের লক্ষাধিক মানুষকে যাতায়াত করতে হয় এই নদী দিয়ে।
জানা গেছে, স্বাধীনতার পর থেকে একটি সেতুর অভাবে উপজেলার ফতেপুর ও ডৌবাড়ী- এই দুই ইউনিয়নের লক্ষাধিক মানুষকে নদী পারাপারে পোহাতে হচ্ছে চরম দুর্ভোগ। ঘটছে প্রাণহানির মতো অনাকাক্সিক্ষত দুর্ঘটনা। বিশেষ করে স্কুল- কলেজ-মাদ্রাসা পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের বেশি ভোগান্তি পোহাতে হযচ্ছে। শিক্ষার্থীরা নদী পারাপারের সময় বই-খাতা পানিতে পড়ে নষ্ট হয়, ভিজে যায় পোশাক। তখন বিদ্যালয়ে না গিয়ে অনেককে ফিরতে হয় বাড়িতে। এভাবেই প্রতিনিয়ত শিক্ষার্থীরা ভোগান্তির শিকার হচ্ছে আর লেখাপড়ায় ব্যাঘাত ঘটছে।
ডৌবাড়ী ইউনিয়নের লংপুর গ্রামের বাসিন্দা সালিশ ব্যক্তিত্ব জাহাঙ্গীর ফারুক হেলাল বলেন, দুই ইউনিয়নের আন্তঃযোগাযোগ ব্যবস্থার প্রধান মাধ্যম লংপুর থেকে বাংলাবাজার সড়ক। বিভাগীয় শহরের সাথে যোগাযোগের ক্ষেত্রে স্বাধীনতার পর থেকে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে কাঁপনা নদীতে সেতু না থাকা। শিক্ষা, চিকিৎসা ও কৃষির উন্নয়নে প্রধান অন্তরায় দূরীকরণে কাঁপনা নদীতে একটি সেতু নির্মাণ অতীব জরুরি।
তিনি বলেন, আমরা বাপ-দাদার আমল থেকে সেতুর দাবি তুলে এলেও কাজ হচ্ছে না। বাপ-দাদারা অতীত হয়েছেন। আমরাও সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে দাবি বাস্তবায়নের লক্ষে যোগাযোগ করছি। কাঁপনা নদীতে একটি সেতু নির্মাণ হলে হাওরবেষ্টিত জনপদের মানুষ শহরের সুবিধা পাবে, এলাকা আলোকিত হবে। কৃষকরা পাবে আধুনিক কৃষির সুবিধা। শিক্ষার্থীরা ভালো মানের শিক্ষা পাবে। চিকিৎসাসেবায় নিম্নআয়ের মানুষেরা সুবিধা ভোগ করতে পারবে। তাদের অন্তত বিনা চিকিৎসায় মরতে হবে না।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, পারিবারিক ও ব্যবসাসহ নানা কাজে আমাদের সিলেটে যেতে হয়। কিন্তু দুঃখের বিষয় হচ্ছে, সন্ধ্যা হলেই নদী পার হওয়ার মতো কোনো ব্যবস্থা থাকে না। তখন আমাদের বাধ্য হয়ে ওপারে আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে রাত্রীযাপন করতে হয়। আমাদের পরিবারের লোকেরা আমাদের নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকে। তারা আরও বলেন, দুই পাড়ের বিশাল এই জনগোষ্ঠীর মাঝে রয়েছে গভীর সম্পর্ক। সবার উপজেলা একই, শিক্ষা-দীক্ষা, বাজার-ঘাট, কেনাকাটা সবই হয় এক সঙ্গে। তবুও তারা দুই পাড়ের বাসিন্দা। নদীর উপরে একটি সেতু নির্মাণ না হওয়ায় দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন দুই ইউনিয়নের লক্ষাধিক মানুষ। সেতুর আশায় এসব মানুষ বুক বেঁধে থাকলেও তাদের সে আশা পূরণ হয়নি। মাত্র একটি সেতুর অভাবে এই অঞ্চলের লোকজন অনেক পিছিয়ে রয়েছে। লংপুর খেয়াঘাটে কাঁপনা নদীর ওপর সেতু নির্মাণ হলে দুই পাড়ের বাসিন্দাদের জীবনমানের উন্নতি হবে।
সরেজমিনে গিয়ে স্থানীয় জনসাধারণ ও শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে কাঁপনা নদীর ওপর লংপুর খেয়াঘাটে বাঁশের সাঁকো দিয়ে ও বর্ষায় পানি বৃদ্ধি পেলে নৌকায় করে মানুষ পারাপার হচ্ছেন। পারাপারের জন্য তাদের গুণতে হয় ৫-১০ টাকা। নদীর এপারে রয়েছে বেশ কয়েকটি প্রাথমিক বিদ্যালয়, স্কুল, কলেজ, দাখিল মাদ্রাসা, মহিলা মাদ্রাসা ও কয়েকটি কিন্ডার গার্টেন স্কুল। প্রতিদিন এসব বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীসহ হাজার হাজার সাধারণ মানুষকে ঝুঁকিপূর্ণ সাঁকো বা নৌকা দিয়ে যাতায়াত করতে হয়। এছাড়া হঠাৎ কেউ অসুস্থ হলে রোগী বহনের কোনো যানবাহন পারাপারেরও ব্যবস্থা নেই। যার ফলে কাঁপনা নদীর লংপুর খেয়াঘাটে একটি সেতু নির্মাণের জোর দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।
বর্তমান সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে এলাকাবাসীকে নিয়ে গিয়ে সেতু নির্মাণের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন সমাজকর্মী এনামুল ইসলাম। তিনি বলেন, সেতু নির্মাণের দাবিতে বাপ-দাদারা সরব ছিলেন। আমরাও থেমে থাকিনি, প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। লক্ষাধিক মানুষের প্রয়োজনীয় জায়গায় সেতু নির্মাণ না হওয়ায় এলাকার মানুষ বড় কষ্টে আছে।
তিনি আরও বলেন, সিলেটে যেতে মাত্র ৩০ মিনিট সময় লাগে। কিন্তু এই নদী পার হতে ঘণ্টার বেশি সময় লাগে। এখন বুঝুন একজন মুমূর্ষু রোগীকে সুচিকিৎসা পেতে কতটা দুর্ভোগ পোহাতে হয়। এ ছাড়া কৃষকরা আধুনিক কৃষিসেবা থেকে বঞ্চিত। পারাপারের ব্যবস্থা না থাকায় ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত। এমনকি উৎপাদিত কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য থেকে কৃষকরা বঞ্চিত হচ্ছেন। লেখাপড়ায় শিক্ষার্থীদের অনাগ্রহ দেখা দিচ্ছে। একটি সেতুর অভাবে আলোকিত সমাজ ও আলোকিত মানুষ তৈরি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন দুই ইউনিয়নের বাসিন্দারা।
জৈন্তাবার্তা / মনোয়ার




