পাঠানপাড়ায় বিল্ডিং কোড অমান্য করে বহুতল ভবন নির্মাণ
শুক্রবার, ২৯ মে ২০২৬, ১১:০২ PM

৮ ফুটের রাস্তা হয়ে গেছে ১২ ফুট * সিসিকের ভুলে ক্ষতিগ্রস্ত ভবন মালিকেরা

পাঠানপাড়ায় বিল্ডিং কোড অমান্য করে বহুতল ভবন নির্মাণ

মুহাজিরুল ইসলাম রাহাত, নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৫/০৭/২০২৫ ১১:৫৫:৩৫ PM

পাঠানপাড়ায় বিল্ডিং কোড অমান্য করে বহুতল ভবন নির্মাণ

ছবি : সংগৃহীত


সিলেট মহানগরীর ২৭ নম্বর ওয়ার্ডের পাঠানপাড়া আবাসিক এলাকায় বিল্ডিং কোডের তোয়াক্কা না করে বহুতল ভবন নির্মাণের প্রতিযোগিতা চলছে। সিটি করপোরেশনের অসাধু কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করেই চলছে এই প্রতিযোগিতা। এর ফলে ভ‚মিকম্পপ্রবণ সিলেটে ঝুঁকি বাড়ছেই। ভবন মালিকদের ভাষ্য, তারা সিটি করপোরেশনের যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই ভবন নির্মাণ করছেন। অন্যদিকে ভবন মালিকদের সাথে সিসিকের দ্বৈত আচরণের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।

সিসিকের এমন আচরণ নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন অনেক ভবন মালিক। এ নিয়ে সচেতন নাগরিকদের কেউ কেউ প্রতিবাদ করে মিথ্যা মামলায় হয়রানিসহ জীবননাশের হুমকির শিকার হয়েছেন। এ রকম অবস্থায় যে যেভাবে পারছেন সেভাবেই নির্মাণ করছেন বহুতল ভবন। সিলেট সিটি করপোরেশনের কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও রয়েছে অভিযোগ।

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা ভ‚মিকম্পপ্রবণ সিলেট নগরীতে এভাবে বহুতল ভবন নির্মাণ আগামীতে ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনবে। বিল্ডিং কোড মেনে জায়গা ছাড়া তো পরের কথা, উল্টো অনেক এলাকায় ভবন ঘেঁষে একাধিক বহুতল ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। এ নিয়ে স্থানীয়রাও হতবাক। সম্প্রতি জৈন্তা বার্তার অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর বেশকিছু তথ্য। যেখানে সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রকৌশল শাখার অনিয়মের চিত্র ফুটে উঠেছে।

দক্ষিণ সুরমার ২৭ নম্বর ওয়ার্ডের পাঠানপাড়া আবাসিক এলাকার বাসিন্দা মো. বাছিত মিয়া জানান, সম্প্রতি সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রকৌশল শাখা থেকে তিনি একটি নোটিশ পেয়েছেন। যেখানে বলা হয়েছে তিনি নিয়ম না মেনে ভবন নির্মাণ করেছেন। এমতাবস্থায় তাকে বিধি বহিভর্‚ত অংশ এবং ৫ম তলার নির্মাণাধীন অংশ অপসারণের অনুরোধ করা হয়েছে। অন্যথায় তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়। ইতোমধ্যে সেই চিঠির লিখিত জবাবও দিয়েছেন মো. বাছিত মিয়া। তার দাবি, ২০১৫ সালে তিনি সিটি করপোরেশনের অনুমোদন নিয়েই ভবন নির্মাণ করেছেন। সেই অনুমোদনের একটি কপি জৈন্তাবার্তার কাছে সংরক্ষিত আছে। ওই কপি ঘেঁটে দেখা যায়, ২০১৫ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর মো. বাছিত মিয়াকে ২৭ নম্বর ওয়ার্ডের পাঠানপাড়া আবাসিক এলাকার ভবন নির্মাণের অনুমোদন দেয় সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রকৌশল শাখা। একই বছরের ৯ আগস্ট তার (বাছিত মিয়া) আবেদনের প্রেক্ষিতে অনুমোদনপত্রে বলা হয়, ‘সোনালী ব্যাংক চালান নং- ২৫৩০, ফিস দশ হাজার টাকা প্রস্তাবিত নির্মাণ/খনন কার্যের জন্য অনুমোদন করা হইল’। অনুমোদন পত্রে সিটি করপোরেশনের নির্বাহী প্রকৌশলীর স্বাক্ষর রয়েছে। এছাড়াও সিটি করপোরেশনের নিজস্ব প্রকৌশলী কর্তৃক অনুমোদিত নকশা সংযুক্ত আছে এখন প্রশ্ন হলো অনুমোদিত ভবন ভাঙার নির্দেশ কেন দিল সিটি করপেরেশন।

সরেজমিন দেখা গেছে, যে যায়গায় ভবন নির্মাণ করা হয়েছে সেখানে রাস্তা সরজমিনে আছে মাত্র ৮ ফুট। অথচ ভবনের নকশায় রাস্তা দেখানো হয়েছে ১২ ফুট। আসল গলদ এখানে। সিসিকের আইন বলছে নগরীতে ১০ তলার ওপরে ভবন নির্মাণে সম্মুখভাগে ২০ ফুট থেকে ৪০ ফুট রাস্তা থাকতে হবে। ৫ তলা ভবনের ক্ষেত্রে মালিককে সামনের দিকে ১২ ফুট রাস্তা ছেড়ে ভবন নির্মাণের কথা বলা হয়েছ। সেখানে মাত্র ৮ ফুট রাস্তায় মো. বাছিত মিয়ার ভবনের অনুমোদন হলো কি করে সেই প্রশ্ন উঠেছে।

ভবন মালিকের ভাই সালমান জানান, ওই ওয়ার্ডের দায়িত্বরত প্রকৌশলীকে ম্যানেজ করেই সবকিছুর অনুমোদন করিয়েছেন তিনি। ভবন নির্মাণের ১০ বছর পর হঠাৎ কি কারণে সিটি করপোরেশন এই আচরণ করছে সেটি তার বোধগম্য নয়।

অভিযোগ করে তিনি বলেন, ‘সিটি করপোরেশন বলছে আমি নিয়ম ভঙ্গ করেছি। তাহলে তারা আমার ফাইলে অনুমোদন দিল কীভাবে? অথচ আমার পার্শ^বর্তী অনেকে ৮ ফুট রাস্তা ছেড়ে ভবন নির্মাণ করেছেন। এরকম আরো ৮টি ভবন একইভাবে নির্মিত হয়েছে। কই তাদের বেলায় তো সিটি কোনো ব্যবস্থা নিতে দেখলাম না।’

অবশ্য সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী নুর আজিজুর রহমান বলেন, ‘সবার জন্য আইন সমান। আসলে একজনের বিরুদ্ধে যখন অভিযোগ ওঠে তখন অভিযুক্ত ব্যক্তি আরো দশজনের অনিয়ম তুলে ধরেন। আমরা সবার বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নিচ্ছি। যারাই অনিয়ম করেছেন তাদেরকে নেটিশ করা হবে।’

স্থানীয় সূত্র জানায়, সিলেট মহানগরীর ২৭ নম্বর ওয়ার্ডের পঠানপাড়া আবাসিক এলাকায় প্রভাবশালীরা বিল্ডিং কোডের তোয়াক্কা না করেই নির্মাণ করেছেন বহুতল ভবন। অভিযোগ সিটি করপোরেশন থেকে ৩ তলা ভবনের অনুমোদন নিয়ে অনেকে ৫ তলা ভবন নির্মাণ করছেন। কেউ কেউ ওয়ার্ডের প্রকৌশলীকে ম্যানেজ করে সরু ৮ ফুটের রাস্তা কাগজে ১২ ফুট দেখিয়ে অনুমোদন নিচ্ছেন। এ নিয়ে প্রতিবাদ করলে ষড়যন্ত্রমূলক মিথ্যা মামলায় হয়রানিসহ জীবননাশের হুমকিতে পড়েছেন সচেতন এলাকাবাসী।

জৈন্তা বার্তার অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সিলেট নগরীর দক্ষিণ সুরমার ২৭ নম্বর ওয়ার্ডের পাঠানপাড়া আবাসিক এলাকায় অন্তত ৮টি ভবন বিল্ডিং কোডের তোয়াক্কা না করেই নির্মাণ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে জলিল খাঁন, মুজস্তিদর খাঁন, গুলজার খাঁন, এখতিয়ার খাঁন, নাসির খাঁন, দিলদার খাঁন, দিলওয়ার খাঁন, নাজির খাাঁন। তারাও মো. বাছিত মিয়ার মতো ৮ রাস্তা ১২ ফুট দেখিয়ে বহুতল ভবন নির্মাণ করেছেন।

এলাকার শালিস ব্যক্তিত্ব ইকতার খান বলেন, ‘এলাকার অনেকে নিয়ম ভেঙে ভবন নির্মাণ করেছেন বলে আমরা শুনেছি। সম্প্রতি বিষয়টি নিয়ে এলাকায় বেশ ঝামেলা দেখা দিয়েছে। একে ওপরের বিরুদ্ধে সিটিতে অভিযোগ, এমনকি থানায় জিডি পর্যন্ত করেছেন। সম্প্রতি আমরা দুই পক্ষকে নিয়ে বসেছিলাম। কিন্তু একটি পক্ষ শালিস মানেনি। তারা এলাকার মুরুব্বিদের নিয়ে কটাক্ক করেছে। এখন যে অবস্থা উভয় পক্ষ যে কোনো সময় বিবাদে জড়ানোর আশঙ্কা রয়েছে।’

সিলেট সিটি করপোরেশনের ২৭ নং ওয়ার্ডের দ্বায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলী বিজিত দাস বলেন, ‘আমরা গত সোমবার সরেজমিন গিয়ে পাঠানপাড়া এলাকায় বেশকিছু বহুতল ভবনে অনিয়ম দেখতে পেয়েছি। শিগগিরই তাদেরকে নোটিশ করা হবে।’ তবে ৮ ফুট রাস্তা কীভাবে কাগজে ১২ ফুট হলো সেই প্রশ্নের কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি তিনি।

সিটি কর্তৃপক্ষ জানায়, নগরীতে ১০তলার ওপরে ভবন নির্মাণে সম্মুখভাগে ২০ ফুট থেকে ৪০ ফুট রাস্তা থাকতে হবে। ৫ তলার ক্ষেত্রে ভবন মালিককে সামনের ১২ ফুট রাস্তা ছেড়ে ভবন নির্মাণের কথা। অথচ এমন নিয়ম ভঙ্গ করেই চলছে বহুতল ভবন নির্মাণ। এ নিয়ে শঙ্কিত ও হতাশ নগরবাসী।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সিলেটের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ফারুক মাহমুদ চৌধুরী এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে জানান, ভ‚মিকম্প প্রবণ সিলেটে বিল্ডিং কোড না মেনে গায়ের জোরে এক শ্রেণির প্রভাবশালী ভবন মালিক ও ডেভেলপ ব্যবসায়ীদের বহুতল ভবন নির্মাণ আগামীতে ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনবে। তিনি এ নিয়ে সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষের জোরালো, কার্যকর ও দৃশ্যমান উদ্যোগ দেখতে চান।

এ বিষয়ে সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী নুর আজিজুর রহমান বিল্ডিং কোড না মেনে বহুতল ভবন নির্মাণের কথা স্বীকার করে জৈন্তাবার্তাকে বলেন, ‘যখনই কোনো অভিযোগ কিংবা নিয়ম ভেঙে ভবন নির্মাণের খবর আসছে তখনই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ৮ ফুটের রাস্তা কগজে ১২ হলো কী করে এমন প্রশ্নের

উত্তরে তিনি জানান, তথ্য গোপন করা হয়েছে। তাহলে আপনারা অনুমোদন দিলেন কীভাবেÑ এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন আমাদের লোক টাকাটুকা খেয়ে হয়তো এই কাজ করেছে। এখন কী করব বলেন?’

তিনি আরও বলেন, এই ক্ষেত্রে ভবন মালিক ও ডেভেলপারদের সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। আইন প্রয়োগ করে এই সমস্যার সমাধানের অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তিনি আরও জানান, অভিযোগ পাওয়া বেশকিছু ভবন মালিকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাসহ ভবনের অননুমোদিত অংশ ভাঙা হয়েছে। তার মতে, সিলেট এমনিতেই ভ‚মিকম্প প্রবণ এলাকা। এখানকার ভবন মালিকদের আরও সচেতন হওয়া প্রয়োজন।

জৈন্তাবার্তা / মনোয়ার