প্রতীকী ছবি
সিলেটের বিয়ানীবাজারে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র–জনতার আন্দোলনের পর বিজয় মিছিলে গুলিবর্ষণের ঘটনায় তিনজন নিহত হওয়ার ঘটনায় দায়ের হওয়া একাধিক মামলা ঘিরে এলাকায় এখনও উদ্বেগ ও আতঙ্ক বিরাজ করছে। মামলার তদন্ত ও বিচারিক কার্যক্রমে ধীরগতির পাশাপাশি নিরীহ সাধারণ মানুষ হয়রানির শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে আওয়ামী লীগের একাধিক কর্মী-সমর্থক ও কয়েকজন অরাজনৈতিক ব্যক্তি জানান, ‘তালিকায় নাম আছে’ বলে তাদেরকে বিভিন্ন মাধ্যমে ভয় দেখানো হচ্ছে। এতে তারা পরিবার নিয়ে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
ওইদিনের ঘটনায় নিহতদের পরিবারের পক্ষ থেকে বিয়ানীবাজার থানায় একাধিক হত্যা মামলা দায়ের করা হয়। এসব মামলায় সাবেক শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদসহ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের নাম এজাহারভুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি বিপুল সংখ্যক অজ্ঞাতনামা আসামির নামও উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া ২০২৪ সালের ১ অক্টোবর রাতে গুলিবিদ্ধ হয়ে এক আহত যুবক পৃথক মামলা দায়ের করেন, যেখানে পুলিশসহ কয়েকজনকে আসামি করা হয়। অন্যদিকে ২০ আগস্ট পাঁচজন সাংবাদিককে আসামি করে দায়ের করা মামলাটিও ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্কের জন্ম দেয়।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নিহতদের ময়নাতদন্ত না হওয়ায় মামলার তদন্তে জটিলতা তৈরি হয়েছে। এর ফলে চার্জশিট দাখিল ও বিচারিক কার্যক্রম বিলম্বিত হচ্ছে।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, মামলার প্রকৃত আসামিদের অনেকেই এলাকা ছেড়ে পলাতক। এখন আবার রাজনৈতিকভাবে সম্পৃক্ত নন- এমন সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের ভয়ভীতি দেখানোর উদ্দেশ্যে ইউনিয়নভিত্তিক তালিকা তৈরি করা হয়েছে বলে প্রচার করা হচ্ছে। এই আতঙ্কে গত এক মাস ধরে বহু সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ী বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন।
সম্প্রতি বিয়ানীবাজারে অনুষ্ঠিত একাধিক সভা ও সমাবেশে জামায়াতে ইসলামীর এমপি প্রার্থী সেলিম উদ্দিন এবং বিএনপির এমপি প্রার্থী অ্যাডভোকেট এমরান আহমদ চৌধুরী বলেন, ‘৫ আগস্টের ঘটনায় কোনো নিরীহ ও সাধারণ মানুষকে হয়রানি করা যাবে না। মামলা ও তদন্তকে যেন ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা বাস্তবায়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার না করা হয়।’
এ অবস্থায় স্থানীয়দের প্রশ্ন- যখন প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর প্রার্থীরাই সাধারণ মানুষকে হয়রানি না করার আহ্বান জানাচ্ছেন, তখন কারা এই তথাকথিত তালিকা তৈরি করছে এবং ভয়ভীতি প্রদর্শন করছে?
এ বিষয়ে সিলেট জেলা বিএনপির স্থানীয় সরকার বিষয়ক সম্পাদক ও বিয়ানীবাজার পৌর বিএনপির সাবেক সভাপতি আবু নাসের পিন্টু বলেন, ‘বিএনপি কোনোভাবেই মামলা বাণিজ্য বা তালিকা বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত নয়। আমরা চাই দোষী আওয়ামী লীগ নেতাদের বিচার হোক। তবে যারা নির্দোষ তারা যেন কোনোভাবেই কষ্ট না পান। আমাদের চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্ট ঘোষণা দিয়েছেন— যে মামলা বাণিজ্য করবে, তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হবে।’
বিয়ানীবাজার উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ছরয়ার হোসেন বলেন, ‘বিএনপির পক্ষ থেকে প্রশাসনকে জোরালোভাবে বলা হয়েছে- মামলা ছাড়া কোনো সাধারণ মানুষকে যেন গ্রেপ্তার করা না হয়। আমাদের প্রার্থী এমরান চৌধুরীও এ বিষয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। আর বিএনপির পক্ষ থেকে নতুন কোনো তালিকা তৈরি করা হয়নি। তিনটি হত্যা মামলা ও একটি বিস্ফোরক মামলার আসামিরা ছাড়া আর কারও নাম
তালিকাভুক্ত করা হয়নি। তবে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা যেদিন বলেছিলেন মামলা থাকুক বা না থাকুক ডেভিলদের গ্রেপ্তার করতে হবে, তার বক্তব্যের পর থেকেই পুলিশি অভিযান জোরদার হয়েছে।’
বিয়ানীবাজার উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মো. আবুল কাশেম বলেন, ‘আমাদের প্রার্থী সেলিম উদ্দিন স্পষ্টভাবে বলেছেন কোনো নিরপরাধ মানুষকে হয়রানি করা যাবে না। দলের বক্তব্যও একই। আমরা ওসি সাহেবের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলেছি এবং আমাদের অবস্থান জানিয়ে দিয়েছি। যারা এসব করছে তারা নির্বাচন বানচালের ষড়যন্ত্র করছে। জামায়াতের কেউ এর সঙ্গে জড়িত নয়।’
জামায়াত নেতা সালেহ আহমদ বলেন, ‘জামায়াতের স্পষ্ট অবস্থান- মামলা ছাড়া কাউকে হয়রানি করা যাবে না। তবে আমিও শুনেছি কিছু মানুষকে তালিকায় নাম আছে বলে ভয় দেখানো হচ্ছে। এই সুযোগে অনেকে পুরনো শত্রুতা, গোষ্ঠীগত বিরোধ কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক দ্বন্দ্ব চরিতার্থ করছে।’
এ বিষয়ে বিয়ানীবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ওমর ফারুক বলেন, ‘তালিকা হয়েছে কি না, সেটি একটি গোপনীয় বিষয়। এ বিষয়ে বলা যাবে না। আর তালিকা থাকলেও সেটি আমার জানা নেই, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বলতে পারবেন। সরকার যদি কাউকে তালিকাভুক্ত করে, তা আইনগতভাবে মানতে হয়। তবে পুলিশের পক্ষ থেকে কাউকে অযথা হয়রানি করা হচ্ছে না, হবেও না। কেউ যদি পুলিশের নাম ব্যবহার করে ভয়ভীতি দেখায় বা চাঁদাবাজির চেষ্টা করে, তাহলে লিখিত অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
সচেতন মহলের মতে, আইনের শাসন ও জনআস্থা রক্ষায় প্রকৃত অপরাধী ও নির্দোষ মানুষের মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় এই আতঙ্ক বিয়ানীবাজারের সামাজিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
জৈন্তা বার্তা/আরআর




