সিলেট-৬ আসন: প্রচারে এগিয়ে জামায়াত, শক্ত অবস্থানে বিএনপি
বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬, ০৬:৩২ PM

সিলেট-৬ আসন: প্রচারে এগিয়ে জামায়াত, শক্ত অবস্থানে বিএনপি

মুহাজিরুল ইসলাম রাহাত, নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ০৯/০২/২০২৬ ০৩:০০:৪১ PM

সিলেট-৬ আসন: প্রচারে এগিয়ে জামায়াত, শক্ত অবস্থানে বিএনপি


ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সারা দেশের মতো সিলেটের রাজনীতিও এখন উত্তপ্ত। ভোটের মাঠে প্রার্থী ও তাঁদের সমর্থকদের ব্যস্ততায় নাওয়া-খাওয়ার ফুরসত নেই। বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোট চাওয়া, পথসভা, উঠান বৈঠক, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা; সব মিলিয়ে নির্বাচনী আবহে সরগরম পুরো অঞ্চল।

জেলার ছয়টি সংসদীয় আসনের মধ্যে সিলেট-৬ (বিয়ানীবাজার ও গোলাপগঞ্জ) আসনটি এবার বিশেষভাবে আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে। জনসমর্থন, প্রচারণার গতি ও রাজনৈতিক সমীকরণ বিবেচনায় এই আসনে মূলত বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর দুই প্রার্থীর মধ্যেই হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাচ্ছেন স্থানীয় ভোটাররা। 

সিলেট-৬ আসনে মোট পাঁচজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও প্রচারণা ও জনভিত্তির দিক থেকে বিএনপির অ্যাডভোকেট এমরান আহমদ চৌধুরী এবং জামায়াতে ইসলামীর মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিনই এগিয়ে রয়েছেন। 

এই আসনটি আসলে আওয়ামী লীগের ঘাটি হিসেবে পরিচিত। এবারে আওয়ামী লীগ বিহীন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সমর্থকদের ভোট যিনি টানতে পারবেন তিনিই নির্বাচিত হবেন বলে রাজনৈতিক সচেতনমহল মনে করছেন। একসময় নৌকার পাশাপাশি লাঙ্গল প্রতীকের ভালো অবস্থান ছিলো। তবে তাদের সেই অবস্থান নেই। 

২০০১ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে এই আসনে প্রথমবারের মতো চমক দেখান ড. মকবুল হোসেন লেচু মিয়া, বিএনপি জামায়াত জোটের প্রার্থী ধানের শীষের প্রতীক নিয়ে আব্দুল হাসিব পান মাত্র ৬০৭ ভোট। ইসলামী ঐক্যজোটের প্রার্থী কুনু মিয়া সেবার ভোট পেয়েছিলেন ২৭ হাজার ভোট। 

এরপর থেকে টানা ৪ বার এ আসন থেকে বিজয়ী হন একসময়ের কমিউনিস্ট পার্টির নেতা পরবর্তীতে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা নুরুল ইসলাম নাহিদ। 

নৌকা প্রতীক না থাকায় এবার এ আসনে প্রার্থীদের টার্গেট আওয়ামী লীগের ভোট। এ আসনে জামায়াত থেকে অপেক্ষাকৃত দুর্বল প্রার্থী দিয়েছে বিএনপি। জামায়াতের প্রার্থী হয়েছেন কেন্দ্রীয় নেতা ও ঢাকা মহানগর উত্তরের আমীর মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন। অপরদিকে বিএনপির প্রার্থী হয়েছে সিলেট জেলা বিএনপি সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট এমরান আহমদ চৌধুরী যিনি বিগত গোলাপগঞ্জ উপজেলা নির্বাচনে ৪র্থ হয়েছিলে। সে হিসেবে শুরু থেকেই হেভিওয়েট প্রার্থী হিসেবে এগিয়ে রয়েছেন জামায়াতের প্রার্থী এমন ধারণা স্থানীয়দের। ছাত্রশিবিরের সাবেক এই নেতা তাঁর বিশাল ও সংগঠিত কর্মীবাহিনী নিয়ে শুরু থেকেই মাঠে সক্রিয়। দুই উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে শুরু করে হাট-বাজার, মসজিদ ও গুরুত্বপূর্ণ জনসমাগমস্থলে নিয়মিত দেখা যাচ্ছে তাঁকে। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ধারাবাহিক কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করছেন তিনি। জামায়াতের শক্ত সাংগঠনিক কাঠামো, শৃঙ্খলাবদ্ধ কর্মী ও নিয়মিত ভোটার যোগাযোগ সেলিম উদ্দিনকে এই আসনে শক্ত প্রতিদ্ব›দ্বী হিসেবে দাঁড় করিয়েছে। 

অপর দিকে বিএনপি প্রার্থী এমরান আহমদ চৌধুরীর বাড়ি গোলাপগঞ্জ উপজেলায়। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, নিজ উপজেলায় তিনি একচেটিয়া সমর্থন পাচ্ছেন। দুই উপজেলার মধ্যে গোলাপগঞ্জে ভোটারের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি হওয়ায় সেটিকে এমরানের বড় শক্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি বিয়ানীবাজার উপজেলাতেও তাঁর ব্যাপক পরিচিতি ও রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। বিশেষ করে প্রবাসী ভোটারদের একটি বড় অংশ তাঁর পক্ষে মাঠে ও অনলাইনে সক্রিয়ভাবে প্রচারণা চালাচ্ছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার, আর্থিক সহায়তা এবং মাঠপর্যায়ের সংগঠনে এই প্রবাসী নেটওয়ার্ক এমরানের অবস্থানকে আরও শক্ত করেছে বলে মনে করছেন স্থানীয় ভোটাররা। 

এ ছাড়া এই আসনে বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশী যুক্তরাজ্য বিএনপির সাবেক সভাপতি প্রয়াত কমর উদ্দিনের মেয়ে সাবিনা খান, বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য ড. মকবুল হোসেনের মেয়ে আদিবা সুলতানা এবং বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ড. এনামুল হক চৌধুরী শুরু থেকেই এমরানের পক্ষে মাঠে সক্রিয় রয়েছেন। যদিও ২০১৮ সালের নির্বাচনে বিএনপি থেকে মনোনীত প্রার্থী ফয়সল আহমদ চৌধুরী এবার মনোনয়ন না পেয়ে শুরুতে নিরব ভূমিকা পালন করেন, তবে গত কয়েক দিন ধরে তিনিও এমরানের পক্ষে প্রকাশ্যে প্রচারণায় নেমেছেন। ফলে দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশীরা একজোট হয়ে মাঠে নামায় বিএনপির প্রচারণায় নতুন করে গতি এসেছে বলে মনে করছেন তৃণমূলের ভোটাররা। 

এই দুই প্রধান প্রার্থীর বাইরে স্বতন্ত্র প্রার্থী জমিয়তের মো. ফখরুল ইসলাম (হেলিকপ্টার প্রতীক) আলোচনায় রয়েছেন তাঁর বয়স ও ভিন্নধর্মী প্রচারণার কারণে। সবচেয়ে তরুণ প্রার্থী হিসেবে তিনি নতুন ও তরুণ ভোটারদের টার্গেট করে প্রচার চালাচ্ছেন। আধুনিক ভাষা ও নতুন কৌশলের প্রচারণা তাঁকে আলাদা পরিচিতি দিলেও মূল লড়াইয়ে তাঁর প্রভাব কতটা হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। 

এ ছাড়া গণঅধিকার পরিষদের জহিদুর রহমান (ট্রাক) এবং জাতীয় পার্টির মোহাম্মদ আবদুন নূর (লাঙ্গল) নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী প্রচারণা চালালেও জনসমর্থনের দিক থেকে তাঁরা পিছিয়ে রয়েছেন বলে ধারণা স্থানীয়দের। 

সিলেট-৬ আসনের অতীত নির্বাচনী ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এখানে দলীয় পরিচয়ের পাশাপাশি প্রার্থীর ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা ও স্থানীয় প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে এসেছে। বিভিন্ন সময়ে আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি, স্বতন্ত্র প্রার্থীদের জয়-পরাজয়ের ইতিহাস এই আসনের ভোটারদের স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রবণতাকেই তুলে ধরে। তবে নৌকা বিহীন নির্বাচনে ধানের শীষ ও দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের মধ্যেই এবার মূল প্রতিযোগিতা হবে; এমনটাই মনে করছেন সাধারণ ভোটার ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। 

১৯৯১ সালে জাতীয় পার্টির শরফ উদ্দিন খসরু, ১৯৯৬ আওয়ামী লীগের নুরুল ইসলাম নাহিদ, ২০০১ সালে স্বতন্ত্র ড. সৈয়দ মকবুল হোসেন, ২০০৮ থেকে আওয়ামী লীগের নুরুল ইসলাম নাহিদ টানা চারবার এই আসন থেকে নির্বাচিত হন। 

১৯৯১ সালে জাতীয় পার্টির শরফ উদ্দিন খসরু ৩৯ হাজার ৬৫ ভোট পান তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন সিপিবির নুরুল ইসলাম নাহিদ পান ৩৩ হাজার ৩৩২ ভোট। 

২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নুরুল ইসলাম নাহিদ পান ৫৩ হাজার ৯৬৫ ভোট, তার নিকটতম প্রতিদ্ব›দ্বী ছিলেন জাতীয় পার্টির মো. মুজাম্মিল আলী। তিনি পান৩৪ হাজার ৬৯১ ভোট। ২০০১ সালে স্বতন্ত্র সৈয়দ মকবুল হোসেন পান ৭৬ হাজার ৫১৩ ভোট, তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগের নুরুল ইসলাম নাহিদ পান ৭১ হাজার ৫১৭ ভোট। 

২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের নুরুল ইসলাম নাহিদ পান ১ লাখ ৩৮ হাজার ৩৫৩ ভোট, তার নিকটতম প্রতিদ্ব›দ্বী জামায়াতে ইসলামীর মাওলানা হাবিবুর রহমান জামায়াত বিএনপি জোটের প্রার্থী হয়ে ৫১ হাজার ৭৯৪ ভোট পেয়েছিলেন। ১৯৯৬ সালে জামায়াতের প্রার্থী যিনি বর্তমানে সিলেট ১ আসনে নির্বাচন করছেন তিনি মাত্র ১৪ হাজার ১৬৩ ভোট। 

বর্তমানে সিলেট-৬ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৫ লাখ ৯ হাজার ৯৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৫৬ হাজার ৯৩৮ জন এবং নারী ভোটার ২ লাখ ৫২ হাজার ১৫৫ জন। বিপুলসংখ্যক ভোটার এবং প্রতিদ্ব›িদ্বতাপূর্ণ রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই আসনের ফলাফল নিয়ে শেষ মুহ‚র্ত পর্যন্ত উত্তেজনা বিরাজ করবে; এমনটাই মনে করছেন স্থানীয়রা। 

সব মিলিয়ে বলা যায়, প্রচারণার দিক থেকে জামায়াত প্রার্থী মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন এগিয়ে থাকলেও জনসমর্থন ও রাজনৈতিক ঐক্যের কারণে বিএনপি প্রার্থী এমরান আহমদ চৌধুরী রয়েছেন শক্ত অবস্থানে। শেষ পর্যন্ত সিলেট-৬ আসনের রায় কার পক্ষে যায়, তা নির্ধারিত হবে ভোটের দিনই।

জৈন্তা বার্তা/আরআর



শীর্ষ সংবাদ:

তাহিরপুরে বিদ্যুৎ পৃ*ষ্ট হয়ে এসএসসি পরীক্ষার্থী নিহ*ত
কিন্ডারগার্টেন শিক্ষার উন্নয়নে প্রতি বছর ৫ লাখ টাকা অনুদান দেওয়া হবে : এমপি ফয়সল
অনিয়ন্ত্রিতভাবে পাথর উত্তোলন হতে পারে ক্ষতির কারণ
কোম্পানীগঞ্জে ব্যবসায়ীকে মা*রধর করে টাকা ছি*নতাই
নবীগঞ্জে চু*রি-ছি*নতাই বৃদ্ধি, জনমনে উ*দ্বেগ
২০ মে ‘চা শ্রমিক দিবস’ হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও স্ববেতনে ছুটির দাবি
২৩ মে থেকে গোলাপগঞ্জ এমসি একাডেমি মাঠে বসছে পশুর হাট
জৈন্তাপুরে নিজের শি*শু ক*ন্যাকে এ*কাধিকবার ধ*র্ষণ, পিতা গ্রে*প্তার
বিয়ানীবাজারে পৃথক ঘট*নায় বৃদ্ধ ও শিশুর মৃ*ত্যু
‘গোলাপগঞ্জ-বিয়ানীবাজারের সব সমস্যার সমাধান করা হবে’ - এমপি এমরান চৌধুরী