ছবি: জৈন্তা বার্তা
সিলেটের সীমান্তবর্তী উপজেলা গোয়াইনঘাটে গত কয়েক বছর ধরে প্রত্যাশিত বন্যা ও পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত না হওয়ায় দেশি মাছের চরম সংকট দেখা দিয়েছে। একসময় হাওর, বিল ও নদী-নালায় দেশি মাছের প্রাচুর্য থাকলেও বর্তমানে স্থানীয় হাটবাজারগুলোতে এসব মাছের সরবরাহ প্রায় তলানিতে নেমেছে। ফলে সামান্য কিছু দেশি মাছ মিললেও তা বিক্রি হচ্ছে চড়া দামে। এতে বিপাকে পড়েছেন সাধারণ ক্রেতার পাশাপাশি স্থানীয় মৎস্যজীবীরাও।
ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ভারতের মেঘালয়ঘেঁষা গোয়াইনঘাটে বর্ষা মৌসুমে প্রতিবছর পাহাড়ি ঢল ও বন্যা দেখা যায়। বন্যার পানিতে উপজেলার পিয়াইন, ডাউকি ও সারি নদীসহ বিভিন্ন হাওর-বিল পানিতে ভরে ওঠে। এ সময় পানির সঙ্গে বিভিন্ন প্রজাতির দেশি মাছের বিস্তার ঘটে এবং প্রাকৃতিকভাবে মাছের প্রজননও হয়।
স্থানীয়রা জানান, কৈ, মাগুর, শিং, টেংরা, পুঁটি, বোয়াল, শোল, টাকি, রুইসহ বিভিন্ন দেশি মাছ একসময় হাওর-বিল ও নদী-নালায় প্রচুর পাওয়া যেত। কিন্তু এবার উল্লেখযোগ্য বন্যা বা পাহাড়ি ঢল না আসায় এবং পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাতের অভাবে অধিকাংশ জলাশয়ে পানি কমে গেছে। এতে মাছের স্বাভাবিক প্রজনন ও বংশবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
সম্প্রতি গোয়াইনঘাট সদর, সালুটিকর, রাধানগর ও জাফলংয়ের বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা যায়, ক্রেতাদের উপস্থিতি থাকলেও দেশি মাছের সরবরাহ খুবই কম। দু-একজন বিক্রেতা দেশি মাছ নিয়ে বাজারে এলেও দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। ফলে বাধ্য হয়ে ক্রেতাদের চাষের পাঙ্গাশ, তেলাপিয়া ও কার্পজাতীয় মাছের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
গোয়াইনঘাটের সালুটিকর বাজারের এক ক্রেতা বলেন, ‘বন্যার সময় আমরা কম দামে প্রচুর হাওরের দেশি মাছ কিনতাম। কিন্তু এবার বন্যা না হওয়ায় দেশি মাছ চোখেই দেখা যাচ্ছে না। যেটুকু পাওয়া যাচ্ছে, তার দাম এত বেশি যে সাধারণ মানুষের তা কিনে খাওয়ার সামর্থ্য নেই।’
এদিকে পানির অভাবে গোয়াইনঘাটের বিস্তীর্ণ বিল-বাঁওড় ও কুড়ি-খাড়ি শুকিয়ে যাচ্ছে। এতে শুধু মাছের প্রজননই ব্যাহত হচ্ছে না, কৃষিতেও এর প্রভাব পড়ছে। স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, বোরো ধান কাটার পর জমিতে পড়ে থাকা নাড়া (নেরা) পর্যাপ্ত পানি না থাকায় পচছে না। খরায় মাটি শক্ত হয়ে যাওয়ায় পরবর্তী ফসলের জন্য জমি প্রস্তুত করতেও তাদের বাড়তি ভোগান্তিতে পড়তে হবে।
মাছের সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন হাওরপাড়ের জেলে সম্প্রদায়ের মানুষ। বর্ষা মৌসুমে উন্মুক্ত জলাশয়ে জাল ফেলে যে আয় হতো, তা দিয়েই অনেক জেলে পরিবার সংসার চালাত।
চলিতাবাড়ী হাওর এলাকার এক জেলে বলেন, ‘বন্যা না হওয়ায় হাওর-বিলে পানি নেই। সারাদিন জাল বাইয়াও আধা কেজি মাছ ধরতে পারি না। সংসার চালাব কীভাবে, সেই চিন্তায় রাতে ঘুম আসে না।’
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, প্রাকৃতিকভাবে বন্যা ও পর্যাপ্ত পানি না থাকায় দেশি মাছের প্রজনন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি অবৈধ ও ক্ষতিকর জাল ব্যবহারের কারণেও জলজ জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ছে। বিশেষ করে নিষিদ্ধ ‘চায়না দুয়ারি’ জাল ব্যবহারের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা। তাদের অভিযোগ, এ ধরনের জালে বিভিন্ন প্রজাতির ছোট-বড় মাছ ও জলজ প্রাণী নির্বিচারে আটকা পড়ে।
গোয়াইনঘাট উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা আমিনুর রহমান বলেন, বন্যা না হওয়া এবং দীর্ঘ সময় বৃষ্টিপাতের অভাবে উন্মুক্ত জলাশয়ে পানি কমে যাওয়ায় প্রাকৃতিকভাবে মাছের প্রজনন আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। এটি প্রকৃতিগত সমস্যা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবের সঙ্গেও এর সম্পর্ক রয়েছে।
তিনি বলেন, দেশি মাছের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা ও উৎপাদন বাড়াতে মৎস্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে উপজেলার বিভিন্ন উন্মুক্ত জলাশয় ও বিলে মাছের পোনা অবমুক্ত করাসহ নানা উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
গোয়াইনঘাটে শুকিয়ে যাচ্ছে বিল-বাঁওড়, বিপাকে জেলে ও কৃষক




