সংগৃহিত
দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুনের মৃত্যুর ঘটনায় করা আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলায় আদালতে শুনানির সময় সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে মাথা নিচু করে থাকতে দেখা গেছে। এ সময় তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকছুদা ইসলাম কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে কাঁদছিলেন।
সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) বিকেলে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতের ৮ নম্বর আদালতে তাঁদের রিমান্ড শুনানি হয়। শুনানি শেষে গাজী নজরুল ইসলামের চার দিন এবং তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকছুদা ইসলামের এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ এহসানুল ইসলামের আদালত।
এর আগে বেলা ৩টা ৬ মিনিটে পুলিশের কঠোর নিরাপত্তায় হাজতখানা থেকে গাজী নজরুল ও মাকছুদা ইসলামকে আদালতের কাঠগড়ায় নেওয়া হয়। তাঁদের হাতে হাতকড়া না থাকলেও মাথায় হেলমেট ও বুকে বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পরানো ছিল। পরে আদালতকক্ষে নেওয়ার পর পুলিশ তাঁদের হেলমেট ও বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট খুলে দেয়।
বেলা ৩টা ১৪ মিনিটে বিচারক এজলাসে আসেন। এরপর ৩টা ১৫ মিনিটে শুনানি শুরু হয়। আদালতের পেশকার মামলার নম্বরসহ আসামি গাজী নজরুল ইসলাম (৭৫) ও তাঁর স্ত্রী মাকছুদা ইসলামের (৬৫) নাম ঘোষণা করলে গাজী নজরুল মাথা নিচু করেন। এ সময় তাঁর পেছনে সরে গিয়ে কান্না করতে দেখা যায় মাকছুদাকে। শুনানির বেশির ভাগ সময় গাজী নজরুল মাথা নিচু করে ছিলেন।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শেরেবাংলা নগর থানার এসআই শামসুজ্জোহা সরকার গাজী নজরুল ইসলাম ও মাকছুদা ইসলামের সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেন। তিনি আদালতকে বলেন, মরিয়ম খাতুন ফাঁস লাগিয়ে মারা যাওয়ার সময় তাঁরা একই বাসায় ছিলেন। এ ঘটনায় তাঁদের কোনো প্রভাব বা সংশ্লিষ্টতা ছিল কি না, তা উদঘাটনে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ড প্রয়োজন।
রিমান্ডের বিরোধিতা করে আসামিপক্ষের আইনজীবী মাহবুবুর রহমান জামিনের আবেদন করেন। তিনি বলেন, গাজী নজরুল একজন সংসদ সদস্য, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও চারবারের এমপি। তিনি ও তাঁর স্ত্রী বয়স্ক। মামলাটি আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে করা হলেও এর সঙ্গে তাঁদের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। তাই রিমান্ড আবেদন বাতিল করে তাঁদের জামিন দেওয়া হোক।
অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ওমর ফারুক ফারুকী রিমান্ডের পক্ষে যুক্তি দেন। তিনি বলেন, গাজী নজরুল মরিয়মকে বিয়ের পর তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকছুদার সঙ্গে মিলে মানসিকভাবে নির্যাতন করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। মৃত্যুর আগে মরিয়মের লেখা চিরকুটেও এসবের প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে তিনি দাবি করেন। দীর্ঘদিনের মানসিক যন্ত্রণার কারণে মরিয়ম আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
শুনানির একপর্যায়ে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী রাজনৈতিক প্রসঙ্গ তুললে বিচারক তাঁকে থামিয়ে বলেন, ‘আমরা এই মামলার প্রসঙ্গে থাকি। রাজনীতিতে না যাই।’
পরে আসামিপক্ষের আইনজীবী বলেন, গাজী নজরুল তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রীকে ভালোবাসতেন এবং এ ঘটনার সঙ্গে তিনি জড়িত নন। তদন্ত কর্মকর্তাকে সহযোগিতা করবেন বলেও তিনি জানান।
উভয় পক্ষের শুনানি শেষে আদালত গাজী নজরুল ইসলামের চার দিন এবং মাকছুদা ইসলামের এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
আদালতের আদেশের পর কাঠগড়া থেকে নামানোর সময় সাংবাদিকেরা অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে গাজী নজরুল বলেন, ‘আমাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ মিথ্যা। ঘটনার সময় আমি বাসায় ছিলাম না।’ মরিয়ম কেন আত্মহত্যা করেছেন—এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে আমি জানি না।’
পরে বেলা ৩টা ৩৪ মিনিটে পুলিশ তাঁদের আবার হেলমেট ও বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পরিয়ে আদালত থেকে হাজতখানায় নিয়ে যায়। এ সময় আদালতের বারান্দায় থাকা কয়েকজন আইনজীবী ‘ভুয়া ভুয়া’ বলে স্লোগান দেন।
এর আগে রোববার বিকেলে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের ন্যাম ভবনের একটি ফ্ল্যাট থেকে গাজী নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুনের (১৯) ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। গভীর রাতে মরিয়মের বাবা মাসুম বিল্লাহ বাদী হয়ে শেরেবাংলা নগর থানায় আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে মামলা করেন।
মামলায় গাজী নজরুল ইসলাম, তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকছুদা ইসলাম, সাবেক গাড়িচালক এবং মরিয়মের মামা ওবায়দুর রহমানকে আসামি করা হয়। পুলিশ গাজী নজরুল ও মাকছুদাকে গ্রেপ্তার করলেও ওবায়দুর রহমান পলাতক রয়েছেন বলে জানিয়েছে।
পুলিশের তথ্যমতে, সংসদ সদস্য হিসেবে গাজী নজরুল যে ন্যাম ভবনের ফ্ল্যাটটি ব্যবহার করতেন, সেখানে তিনি তাঁর প্রথম ও দ্বিতীয় স্ত্রীকে নিয়ে থাকতেন। মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, রোববার বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে গাজী নজরুল মরিয়মের বাবাকে ফোন করে দ্রুত ন্যাম ভবনের বাসায় যেতে বলেন। পরে সেখানে গিয়ে মরিয়মকে একটি কক্ষে ওড়না দিয়ে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পান তাঁর স্বজনেরা।
পুলিশের উপস্থিতিতে দরজা ভেঙে মরিয়মের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তাঁর বিছানার ওপর থেকে একটি ‘সুইসাইড নোট’ উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
মামলার বাদী মাসুম বিল্লাহ জানান, তাঁর মেয়ে মরিয়মের সঙ্গে জুন মাসে ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী গাজী নজরুল ইসলামের বিয়ে হয়। বিয়ের পর ন্যাম ভবনের ওই বাসায় তাঁরা থাকতেন। একই বাসায় গাজী নজরুলের প্রথম স্ত্রী মাকছুদাও থাকতেন। বিয়ের পর থেকেই বিভিন্ন বিষয় নিয়ে স্বামী ও তাঁর প্রথম স্ত্রীর বিরুদ্ধে মরিয়মকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ করেন তিনি। বিষয়টি মরিয়ম বিভিন্ন সময় মুঠোফোনে পরিবারের সদস্যদের জানিয়েছিলেন বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।
জৈন্তা বর্তা / ওয়াদুদ




