সংগৃহিত
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) প্রধান প্রকৌশলী জয়নাল ইসলাম চৌধুরীকে ঘিরে একের পর এক অভিযোগ সামনে আসছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে পুরো ক্যাম্পাসে তিনি যেন একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েম করে রেখেছেন। কর্মকর্তা থেকে কর্মচারী অনেকেই তাঁর প্রভাববলয়ের মধ্যে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। চাকরি টিকিয়ে রাখা নাকি অনিয়মের অংশীদার হওয়া এই প্রশ্নও ঘুরপাক খাচ্ছে ক্যাম্পাসে।
সাধারণ শিক্ষার্থীদের একাংশের ভাষ্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন কার্যক্রমে নানা বিতর্কিত সিদ্ধান্তের কারণে প্রধান প্রকৌশলী জয়নাল ইসলাম চৌধুরী এখন উন্নয়নের পথের অন্যতম ‘কাঁটা’ হয়ে উঠেছেন। অভিযোগ রয়েছে, লেক ভরাট, সরকারি নথিভুক্ত টিলা কাটা, অবকাঠামোগত কাজে অনিয়মসহ নানা বিষয়ে একাধিকবার সমালোচনা, অভিযোগ ও বিক্ষোভের মুখে পড়লেও থামেননি তিনি।
এরই মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের রাস্তা সংস্কারে ৮৭ লাখ টাকা ব্যয়ে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। তবে এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা দেননি প্রধান প্রকৌশলী। এতে জবাবদিহি নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন শিক্ষার্থীরা।
বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) সকালে ভারী বৃষ্টিতে তলিয়ে যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান সড়ক। এদিন ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের স্নাতক প্রথম বর্ষ, প্রথম সেমিস্টারের নবীন শিক্ষার্থীদের ওরিয়েন্টেশন অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু ওরিয়েন্টেশনে অংশ নিতে এসে চরম ভোগান্তির শিকার হন নবীন শিক্ষার্থী ও তাঁদের অভিভাবকেরা। বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম দিনেই পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার বেহাল চিত্র দেখে বিস্মিত হন অনেকে।
এ নিয়ে বর্তমান ও নবীন শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা যদি এতটাই নাজুক হয়, তাহলে প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্বে বসে জয়নাল ইসলাম চৌধুরী কী করছেন?
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী কাফি কাওসার প্রধান প্রকৌশলীর সমালোচনা করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন,
“অবিলম্বে ব্যর্থ চিফ ইঞ্জিনিয়ারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত সৎ উপাচার্য মহোদয়ের সদিচ্ছা থাকলেও, চিফ ইঞ্জিনিয়ার জয়নাল সাহেবের চরম গাফিলতিতেই আজ নবীন শিক্ষার্থীদের এমন ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে বলে আমি মনে করি।”
আরেক শিক্ষার্থী সরকার জীবন ব্যঙ্গাত্মক ভঙ্গিতে লিখেছেন,
'ধন্যবাদ মাননীয় উপাচার্য মহোদয়কে, বিশেষ ধন্যবাদ চিফ ইঞ্জিনিয়ার জয়নাল সাহেবকে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম দিন আসা নবীন শিক্ষার্থী ও তাঁদের অভিভাবকদের জন্য এমন ব্যতিক্রমী অভিজ্ঞতার আয়োজন সত্যিই প্রশংসনীয়। ৮৭ লাখ টাকা ব্যয়ে রাস্তা মেরামতের ফলাফল যে এত দ্রুত দৃশ্যমান হবে, তা হয়তো অনেকেই কল্পনা করেননি।
আজকের বৃষ্টিতে রাস্তার অবস্থা এমন হয়েছে যে কোথায় রাস্তা আর কোথায় গর্ত তা বোঝার জন্য আলাদা দক্ষতার প্রয়োজন হচ্ছে। নবীন শিক্ষার্থীদের প্রথম দিনেই বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের বাস্তবতার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে অভিনব।
ক্যাম্পাসের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার এই অসামান্য অবদানের জন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে আবারও আন্তরিক ধন্যবাদ।”
এদিকে, অন্য একটি প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রকৌশলী জয়নাল ইসলাম চৌধুরীর বিরুদ্ধে উন্নয়ন প্রকল্পের (ডিপিপি) দোহাই দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকের একটি অংশ ভরাট করে গ্যারেজ নির্মাণের মাধ্যমে জলাধারের সৌন্দর্য ও অস্তিত্ব ক্ষতিগ্রস্ত করার অভিযোগ।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, কিছুদিন আগে প্রায় সাড়ে সাত কোটি টাকা ব্যয়ে খনন করা হয় শহীদ রুদ্র সেন লেক। এটি যেমন ক্যাম্পাসের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করেছে, তেমনি শহীদ রুদ্র সেনের আত্মত্যাগের স্মৃতিও বহন করছে। কিন্তু ‘অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্প-২’-এর আওতায় বর্তমানে লেকের একটি অংশ ভরাট করে সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন বিভাগের জন্য একটি দোতলা গ্যারেজ নির্মাণ করা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, গ্যারেজ নির্মাণের জন্য পাশের টিলার কিছু অংশও কেটে ফেলা হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্টদের দাবি, নির্মাণাধীন ওই গ্যারেজে মাত্র ২২টি গাড়ি রাখা সম্ভব হবে। অথচ বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন পুলে রয়েছে ৪২টি যানবাহন। ভবিষ্যতে এ সংখ্যা আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে প্রকল্পটির যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
অন্যদিকে, আরেক প্রতিবেদনে বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ প্রায় ১ হাজার ৩০০ মিটার রাস্তা মেরামতে প্রায় ৮৭ লাখ টাকা ব্যয়ের অভিযোগ উঠে আসে। অভিযোগ অনুযায়ী, কয়েক হাজার ইট ও রাবিশ (ভাঙা ইট) দিয়ে রাস্তা সংস্কারের কাজ করা হলেও কোনো ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক চুক্তি ছাড়াই এ কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক থেকে গোলচত্বর পর্যন্ত রাস্তার এক পাশে রাবিশ দিয়ে মেরামতের কাজ করা হয়েছে, যাতে রাস্তা দেবে না যায়। আবার গোলচত্বর থেকে একাডেমিক ভবন ‘বি’-এর সামনে পর্যন্ত ইট দিয়ে প্রায় দুই ফুট রাস্তার প্রস্থ বাড়ানো হয়েছে। এ ছাড়া প্রধান ফটক থেকে কেন্দ্রীয় মসজিদের সামনে পর্যন্ত রাস্তার এক পাশের ভাঙা অংশও কয়েক হাজার ইট দিয়ে সংস্কার করা হয়েছে। এসব কাজের জন্য প্রায় ৮৭ লাখ টাকার বেশি ব্যয় দেখিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাব শাখায় বাজেট প্রস্তাব করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এসব অভিযোগের বিষয়ে প্রধান প্রকৌশলী জয়নাল ইসলাম চৌধুরী বলেন,
'আজকে টানা বৃষ্টি হয়েছে, এটা আমার দুর্ভাগ্য। সচরাচর এরকম ভারী বৃষ্টি দেখা যায় না। শুধু ক্যাম্পাসে নয়, শহরের বিভিন্ন সড়কেও দেখা গেছে রাস্তার ওপর দিয়ে পানির প্রবাহ।'
তিনি আরও বলেন,'সব জায়গায় কনস্ট্রাকশনের কাজ চলায় আশপাশে পানি যাওয়ার জায়গা ছিল না। এছাড়াও প্রধান খালের তলায় পলি জমায় পানি প্রবাহের ক্ষমতা কমে গেছে। তারপরও আমরা চেষ্টা করছি রাস্তাকে চলাচলের উপযোগী করার। তাৎক্ষণিকভাবে খোয়া-সুরকি দিয়ে চলাচলের উপযোগী করেছি।'
জৈন্তা বর্তা / ওয়াদুদ




