সংগৃহীত
সম্প্রীতি জুন-জুলাই-আগস্ট তিন মাস সুন্দরবনকে সকল ধরনের প্রবেশ নিষেধাজ্ঞা থাকায় অতি কষ্টে দিন পার করছেন উপকূলের জেলে ও সুন্দরবনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা। প্রতিনিয়ত বাড়ছে ঋণের বোঝা। ঋণ পরিশোধ করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদেরকে।
মুন্সিগঞ্জ জেলে পল্লীর সাগর মাঝি (৪৫) বলেছেন, ‘তিন মাস নদীতে মাছ ধরতে যেতে পারি না। সমিতির ঋণ নিয়ে সংসার চালাতে হচ্ছে। প্রতি সপ্তাহে সমিতির টাকা শোধ করতে মহাজনের কাছ থেকে সুদের টাকা নিয়ে কিস্তি দিতে হচ্ছে। ছেলে মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ দিতে পারছি না। প্রাইভেট পড়া বন্ধ করে দিয়েছে। ছেলে-মেয়ে নিয়ে খুব কষ্টে দিন পার করতে হচ্ছে।’তিনি বলেন, ‘৩৫ বছর সুন্দরবনের নদীতে মাছ ধরার অভিজ্ঞতা রয়েছে। বছরে পাঁচ মাস সরকারি নিয়ম অনুযায়ী সুন্দরবনে মাছ ধরা বন্ধ থাকে। বাকি সময়গুলোতে সুন্দরবনের নদীতে মাছ ধরে ঋণের টাকা শোধ করা সম্ভব হয় না। দিন দিন দিনের বোঝা বইতে হচ্ছে। সারা বছরের জন্য যদি মাছ ধরা যেত তাহলে কোনোরকম খেয়ে পরে দিন পার করতে পারতাম।’
সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলা গাবুরা ইউনিয়নের চাঁদনীমুখা গ্রামের নুর হোসেন আলী বলেন, ‘আমাদের একমাত্র আয়ের পথ সুন্দরবন বছরে সরকারিভাবে পাঁচ মাস বন্ধ। এ সময়টা সংসার চালাতে খুবই কষ্ট হচ্ছে। মহাজনের কাছ থেকে চড়া সুদে দাদন নিয়ে সংসার চালাতে হচ্ছে। সরকার যদি সুন্দরবনকে একেবারে বন্ধ করে দিয়ে আমাদের বিকল্প কোনো আয়ের ব্যবস্থা করে দিত, তাহলে বেঁচে যেতাম। তা না হলে প্রতিনিয়ত এই ঋণের বোঝা টানতে টানতে মারা যেতে হবে। কে পরিশোধ করবে এই ঋণের বোঝা। সংসারে তিনটা মেয়ে ছাড়া আয় করার কোন মানুষ নেই।’এদিকে বন্ধের সময় সরকারিভাবে জেলেদের জন্য ৮৬ কেজি চাউল বরাদ্দ থাকলেও সেটা থেকেও বঞ্চিত থাকেন অনেকে। রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের দখলে থাকে চাউল বিতরণের রাজত্ব। সংসারের আনুষঙ্গিক খরচ বহন করতে মহাজন, বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ করে থাকেন জেলেরা। এ সময় পর্যটক আসতে না পারায় অনেক ট্রলার মালিকরা জড়িয়ে যান ঋণের সঙ্গে। বাজার ঘাট দোকানপাটে কেনাবেচার পরিমাণ খুব কম বললেই চলে।
ট্রলার মালিক আব্দুল হালিম বলেন, ‘তিন মাস সুন্দরবনে পর্যটক না যাওয়ায় আমাদের ট্রলারগুলো অকেজ হয়ে পড়ে আছে। যান্ত্রিক সমস্যা হয়। পরবর্তীতে সেগুলো মেরামত করার জন্য সমিতি ও মহাজনের কাছ থেকে চড়া সুদে টাকা নিতে হয়। এছাড়া আমাদের সংসার চালাতে অনেক কষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এ কারণে আমরা প্রতিনিয়ত ঋণগ্রস্ত হয়ে যাচ্ছি।’কলবাড়ি মৎস্য আড়তের মাছ ব্যবসায়ী আবু মুসা বলেন, ‘তিন মাস সুন্দরবনে পাশ বন্ধ থাকায় বেশিরভাগ জেলেরা আমাদের কাছ থেকে আগাম টাকা নিয়েছেন। এই টাকা পরিশোধ করে সুন্দরবন খোলার পরে। তবে বেশিরভাগ সময় সুন্দরবন বন্ধ থাকায় তারা সম্পূর্ণ টাকা পরিশোধ করতে পারে না। ওই ঋণের ওপর আবার নতুন করে ঋণ হয়ে যায়।’জেলেদের সংখ্যা নিয়ে বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সাতক্ষীরা রেঞ্জে ৪ টি স্টেশনের ২ হাজার ৯ শত বিএলসির মধ্যে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মাছ আহারণের জন্য ১১৭০ বিএলসিতে ১২ হাজার ২৩৭ টা পাস নিয়ে মাছ ধরতে যায় ৩২ হাজার ৭১১ জন জেলে। ১৭২২ বিএলসিতে ১৯ হাজার ৫৩২ টা পাস নিয়ে কাঁকড়া ধরতে যায় ৪৪ হাজার ৩৫০ জন জেলে।এছাড়া ভ্রমণের জন্য ৯১ টি ইঞ্জিন চালিত ট্রলারের বিএলসিতে ৪৫ হাজার ৫৩৯ জন দেশি পর্যটক ও ৭০ জন বিদেশি পর্যটক ভ্রমণ করে থাকে।
নওয়াবেকী গণমুখী সমবায় সমিতির মুন্সিগঞ্জ ব্রাঞ্চের ম্যানেজার মো. ইকরামুল বলেন, মুন্সিগঞ্জ ব্রাঞ্চে ৩ হাজার ৫৬৫ জন গ্রাহক আছে। এর মধ্যে বেশিরভাগই সুন্দরবনের উপর নির্ভরশীল। এই তিন মাসে কিস্তি আদায়ের হার আর্ধেকের একটু বেশি। অনেকের কাছে কিস্তি আদায় করতে গেলে সুন্দরবন বন্ধ আছে সেই অজুহাত দেখায় এবং বলে সুন্দরবন খোলার পরে আপনাদের টাকা দেব।শ্যামনগর উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. তৌহিদুল ইসলাম জানান, শ্যামনগর উপজেলায় ২৩ হাজার ৯২৬ জন মাছ, কাঁকড়া ধরা জেলে আছে। এর মধ্যে গভীর সমুদ্রগামী জেলে রয়েছে ৮ হাজার ৪৫০ জন । পুরুষ জেলে ১৬ হাজার ৮৫৯ জন এবং নারী জেলের রয়েছে ৭ হাজার ৭৩ জন। সরকারের পক্ষ থেকে শুধুমাত্র সমুদ্রগামী ছেলেদের জন্য ৮৬ কেজি করে দুই কিস্তিতে চাউল দেয়া হয়। বেসরকারি সংস্থার মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের সুবিধা ও দেওয়া হয়ে থাকে। প্রকৃত জেলেদের তথ্য হালনাগাদ কার্যক্রম চলমান আছে। তাদেরকে নিবন্ধনের তালিকায় আনা হচ্ছে।
সাতক্ষীরা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক মশিউর রহমান জানান, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী সুন্দরবনকে তিন মাসের জন্য সকল ধরনের পরিবেশ নিষেধাজ্ঞা করা হয়েছে। যে কারণেই পর্যটক থেকে শুরু করে কোনো জেলেই সুন্দরবনে প্রবেশ করতে পারছেন না। তিনি বলেন, ‘আমাদের পক্ষ থেকে মৎস্য অধিদপ্তরের একটা তালিকা দেয়া হয়েছে। সুন্দরবন বন্ধের সময় জেলে বাওয়ালিরা ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ে। চাউল বিতরণের দায়িত্বটা যদি বন বিভাগের উপর থাকত, তাহলে চেষ্টা করতাম প্রকৃত জেলেদের কাছে পৌঁছে দিতে।’
জৈন্তাবার্তা/সুলতানা




