ছবি:সংগৃহীত
দেশে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বন্ধ কলকারখানা পুনরুজ্জীবিত করা এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতিশীলতা আনতে বাংলাদেশ ব্যাংক ঘোষিত ৬০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ অর্থায়ন প্যাকেজের সুবিধা প্রকৃত উদ্যোক্তাদের কাছে দ্রুত পৌঁছে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান এফসিএমএ।
শুক্রবার (৬ নভেম্বর) বিকেলে বাংলাদেশ ব্যাংক সিলেট অফিসের সম্মেলনকক্ষে ব্যাংকসহ বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ নির্দেশনা দেন।
সভায় সিলেটের বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংকের আঞ্চলিক প্রধান, আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা, সিলেট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির নেতৃবৃন্দ, নারী উদ্যোক্তা এবং কুটির, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের (সিএমএসএমই) প্রতিনিধিরা অংশ নেন। এ সময় অর্থায়ন প্যাকেজ বাস্তবায়নে মাঠপর্যায়ের চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
গভর্নর বলেন, বর্তমানে ব্যাংকঋণের সাধারণ সুদের হার ১২ থেকে ১৪ শতাংশ। এই উচ্চ সুদ ব্যবসা পরিচালনায় উদ্যোক্তাদের জন্য বড় চাপ সৃষ্টি করছে। এ পরিস্থিতিতে উদ্যোক্তাদের স্বস্তি দিতে এবং স্থবির শিল্প খাত পুনরুজ্জীবিত করতে বিশেষ এ প্যাকেজের আওতায় ৪ থেকে ৮ শতাংশ সুদে ঋণ দেওয়া হচ্ছে। ৬০ হাজার কোটি টাকার এ প্যাকেজের মধ্যে ১৯ হাজার কোটি টাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব তহবিল থেকে এবং বাকি ৪১ হাজার কোটি টাকা বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর উদ্বৃত্ত তারল্য থেকে জোগান দেওয়া হবে।
সিলেট অঞ্চলের বন্ধ উৎপাদনমুখী শিল্প ও সেবা খাত পুনরায় সচল করার ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, প্যাকেজের সবচেয়ে বড় অংশ, অর্থাৎ ২০ হাজার কোটি টাকা বন্ধ শিল্পকারখানা পুনর্গঠনে ব্যয় করা হবে। এ ছাড়া কৃষি ও পল্লী অর্থনীতি চাঙা করতে ১০ হাজার কোটি টাকা এবং বেকার যুবকদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে ১ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
তরুণদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন উদ্যোগের কথা জানিয়ে গভর্নর বলেন, চলতি নভেম্বর মাস থেকে ‘উদ্যোগ’ (Uddyog) নামে একটি প্রকল্প চালু হয়েছে। এ প্রকল্পের আওতায় দেশের প্রতিটি উপজেলা থেকে ১০ জন করে মোট ৫ হাজার তরুণকে বাছাই করে নতুন উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলা হবে। এ প্রক্রিয়ায় ব্যাংক বা আমলাতান্ত্রিক কোনো হস্তক্ষেপ থাকবে না বলেও তিনি জানান।
প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকদের ঋণপ্রাপ্তি সহজ করার বিষয়ে গভর্নর বলেন, ১০ হাজার কোটি টাকার কৃষি পুনঃঅর্থায়ন স্কিমের আওতায় কৃষকরা প্রচলিত জমির জামানতের পরিবর্তে বিকল্প জামানত ব্যবহার করেও সহজে ঋণ নিতে পারবেন।
ঋণ বিতরণ ও পরিশোধের বিষয়ে সতর্ক করে গভর্নর বলেন, প্রকৃত ও যোগ্য উদ্যোক্তাদের ঋণপ্রাপ্তি নিশ্চিত করা হবে। চলতি বছরের মধ্যে সুযোগ পাওয়ার পরও যারা ইচ্ছাকৃতভাবে ঋণ পরিশোধ করবেন না, আগামী বছর থেকে তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্যাকেজটি যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হলে দেশে ২৫ লাখের বেশি মানুষের নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
বাংলাদেশ ব্যাংক সিলেট অফিসের নির্বাহী পরিচালক খালেদ আহমদের সভাপতিত্বে সভায় শুরুতে প্রেজেন্টেশন উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের ব্যাংকিং রেগুলেশন পলিসি ডিপার্টমেন্টের অতিরিক্ত পরিচালক সালাউদ্দিন তাপাদার।
আলোচনায় অংশ নেন বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালক নওশাদ মোস্তাফা ও আব্দুস সালাম মাহমুদ, সিলেট প্রেসক্লাবের সভাপতি মুকতাবিস উন নূর, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী সাবেত নাঈম চৌধুরী, সানজিদা খাতুন, হিজকিল গুলজার, ফালাহ উদ্দিন আলী আহমদ, আলিমুল এহসান চৌধুরী, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মাহবুব উল হাকিম ও অধ্যাপক ড. শহিদুল হক এবং নারী উদ্যোক্তা অনিতা দাশ গুপ্তা।
সভায় অংশীজনরা সিলেট অঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্যের বিভিন্ন সমস্যা এবং ব্যাংকঋণ প্রাপ্তির জটিলতা গভর্নরের সামনে তুলে ধরেন। এসব সমস্যা সমাধানে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দেন।
এ সময় নগদ লেনদেনের পরিবর্তে বিনা খরচে ক্যাশলেস ব্যাংকিং ব্যবস্থা চালু করতে বাংলা কিউআর ব্যবহারের জন্য সবাইকে আহ্বান জানান গভর্নর। তিনি বলেন, অতীতে ব্যাংকিং খাতে যে লুটপাট হয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে আট বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
এ ছাড়া ব্যাংকার-গ্রাহক সম্পর্কের ভিত্তিতে ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে ওয়ান টাইম এক্সিট সুবিধা গ্রহণের জন্য ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে করপোরেট ঋণ কমিয়ে খুচরা, এসএমই ও কৃষি খাতে ঋণ বিতরণ বাড়াতে ব্যাংকারদের নির্দেশনা দেন গভর্নর।
সম্পাদনা-সংক্রান্ত নোট: প্রকাশের আগে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্যাকেজের বিভিন্ন খাতের বরাদ্দ, বিশেষ করে ২০ হাজার, ১০ হাজার ও ১ হাজার কোটি টাকার বরাদ্দ এবং ‘উদ্যোগ’ প্রকল্পের ৫ হাজার তরুণ নির্বাচনের তথ্য মূল প্রেস রিলিজের সঙ্গে মিলিয়ে নেবেন।
জৈন্তা বার্তা/ ওয়াদুদ




