ছবি: নিজস্ব
সিলেট বিভাগের দ্বিতীয় দীর্ঘতম ও গুরুত্বপূর্ণ সেতুটি ধলাই নদীর ওপর নির্মিত। সেতুর এক পাশে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার পূর্ব ও উত্তর রনিখাই ইউনিয়ন, অন্য পাশে ইসলামপুর পশ্চিম ইউনিয়ন। সেতুটির কয়েকটি পিলারের গোড়ার মাটি সরে গেছে। উপরিভাগে ঢালাই উঠে গিয়ে বেশ কয়েকটি গর্ত তৈরি হয়েছে। অযতœ-অবহেলায় যান চলাচলের জন্য সেতুটি দিন দিন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।
এলাকাবাসী জানান, বর্ষাকালে বড় নৌযানের ধাক্কায় পিলারগুলোর নিরাপত্তাবেষ্টনী ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ছোট-বড় নৌযানের ধাক্কায় পিলারগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এমন অবস্থার পরেও দীর্ঘদিন ধরে মেরামতের কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি। সেতুটি মেরামতের ব্যাপারে কারো কোনো মাথাব্যথা নেই। বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে হয়তো সবার টনক নড়বে।
প্রতিবছর বর্ষায় ধলাই সেতুর গোড়া থেকে বালু তোলা হয়। বালু কারবারিরা স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী হওয়ায় ভয়ে কেউ কথা বলে না। সেতু রক্ষায় সচেতন নাগরিকেরা মাঝেমধ্যে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন। কিন্তু বালু কারবারিরা তা তোয়াক্কাই করে না। ফলে সেতুর ভবিষ্যত নিয়ে উদ্বিগ্ন দুই পাড়ের মানুষ।
সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, সেতুর নিকটে বালু উত্তোলনের ফলে ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে সেতুটি। সেতুর পিলার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পিলারের গোড়া থেকে মাটি সরে গিয়ে গর্ত তৈরি হয়েছে। সেতুর এপ্রোচের পাশে ভাঙন দেখা দিয়েছে। অতিরিক্ত ভারী যানবাহন চলাচলের কারণে সেতুর উপরিভাগে অন্তত দশটি গর্ত তৈরি হয়েছে।
সওজ সূত্র জানায়, ভোলাগঞ্জ পাথর কোয়ারির পাশের ধলাই নদের উভয় তীরের মানুষের যাতায়াতের জন্য ২০০৩ সালে সেতুটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। ১২ কোটি ৩১ লাখ ৫০ হাজার টাকা ব্যয়ে নির্মিত প্রায় ৪৩৪ দশমিক ৩৫ মিটার দীর্ঘ ও ৯ দশমিক ৫ মিটার প্রস্থের সেতুটি সিলেট বিভাগের দ্বিতীয় দীর্ঘতম। টানা তিন বছর কাজ চলার পর সেতুটি ২০০৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। সেতুর স্থায়িত্ব ধরা হয় ৭৫ বছর। ওই বছরের ৯ সেপ্টেম্বর তৎকালীন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী এম সাইফুর রহমান সেতুর উদ্বোধন করেন। সেতু নির্মিত হওয়ায় কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার পূর্ব ইসলামপুর ও উত্তর রণিখাই ইউনিয়নের অর্ধলক্ষ মানুষ সরাসরি সড়ক যোগাযোগের আওতায় আসেন। পাশাপাশি দেশের সর্ববৃহৎ ভোলাগঞ্জ কোয়ারি থেকে পাথর পরিবহন সহজতর হয়।
জানা গেছে, সেতুর নিকটবর্তী নদীর তীরে যাদের জমি রয়েছে তারা মোটা অংকের টাকায় বালু বিক্রি করেন। জমির মালিকানা দাবি করে স্থানীয়রা বালু বিক্রি করে বলেই বিভিন্ন এলাকার ক্রেতারা নৌকা নিয়ে সেখানে যান।
নদীর পূর্বপাড়ের কলাবাড়ি গ্রামের বাসিন্দা ও পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শক মো.এনায়েতুল ইসলাম বলেন, অবাধে বালু নেওয়ার ফলে জনগুরুত্বপূর্ণ সেতুটি হুমকির মুখে পড়েছে। ইতোমধ্যে সেতুর কয়েকটি পিলারের গোড়া থেকে মাটি সরে গেছে। বালু তোলা অব্যাহত থাকলে সেতুটি অচিরেই ধসে যাবে।
একই গ্রামের বাসিন্দা ও ধলাই সেতু রক্ষা কমিটির সাধারণ সম্পাদক মাস্টার মো. নিজাম উদ্দিন বলেন, দুই পাড়ের অর্ধলক্ষ মানুষের যাতায়াতের ভরসা ধলাই সেতু। এই সেতুটির খুব কাছ থেকে একটি চক্র দিনরাত বালু তুলে নিয়েছে। কিছু লোক প্রতিদিন লাখ লাখ টাকায় বালু বিক্রি করেছে। এতে জনগুরুত্বপূর্ণ সেতুটি হুমকির মুখে পড়ে। আমরা শুরু থেকেই প্রতিবাদ ও আন্দোলন করে আসছি। কিন্তু সুযোগ পেলেই সেতুর নিকটে এসে বালু তোলা হয়।
স্থানীয় বাসিন্দা ও কোম্পানীগঞ্জ প্রেসক্লাবের সভাপতি আব্দুল আলীম বলেন,কোম্পানীগঞ্জের পূর্ব ও উত্তর রনিখাই ইউনিয়নের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে ধলাই সেতুর গুরুত্ব অপরিসীম। সেতুটি দীর্ঘদিন ধরে মেরামত হয় না। ফলে সেতুর ওপরে বড় বড় গর্ত হয়েছে। সেতুটি রক্ষায় সংশ্লিষ্টদের এগিয়ে আসা দরকার।
নদীর পশ্চিম পাড়ের বাসিন্দা জসিমুল ইসলাম আংগুর বলেন, সেতুর গোড়ায় রমরমা বালু-বাণিজ্য হয়েছে। দুই পাড়ের কিছু লোভী মানুষ সুযোগ পেলেই সেতুর নিকটে নৌকা লাগায়। মানুষগুলো দাঁত থাকতে দাঁতের কদর বুঝছে না। যখন নৌকায় পারাপার হবে, তখন বুঝবে কী হারিয়েছে।
জৈন্তাবার্তা / মনোয়ার




