ছবি:সংগৃহীত
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সিলেট-৬ (গোলাপগঞ্জ-বিয়ানীবাজার) আসনে বইছে নির্বাচনী হাওয়া। প্রার্থীরা সকাল-সন্ধ্যা ছুটে বেড়াচ্ছেন, দিচ্ছেন নানান প্রতিশ্রুতি।
সিলেট-৬ আসনে এবার প্রতিন্দিতা করছেন চারজন প্রার্থী- বিএনপি থেকে অ্যাডভোকেট এমরান আহমদ চৌধুরী, জামায়াতে ইসলামী থেকে মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন, গণ অধিকার পরিষদ থেকে অ্যাডভোকেট জাহিদুর রহমান, এবং জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ-এর প্রার্থী হাফিজ ফখরুল ইসলাম।
দেশের মানুষের মতো প্রবাসীরাও একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের আশা করছেন। বিশেষত যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত প্রবাসীরা নির্বাচনকে ঘিরে সবচেয়ে বেশি সক্রিয়। নির্বাচনের সময় প্রবাস থেকে প্রিয় দল ও প্রার্থীর পক্ষে জনমত গঠনে তারা প্রচার-প্রচারণা চালান, ব্যয় করেন বিপুল অর্থ। অনেকে আবার দেশে এসে মাঠে কাজও করেন।
নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রবাসীরা প্রার্থীদের কাছে কি চান? কি তাদের প্রত্যাশা এ বিষয়ে জানতে দৈনিক জৈন্তাবার্তার পক্ষ থেকে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ইতালি, ফ্রান্স, কানাডায় বসবাসরত প্রবাসীর সাথে কথা হয়। তারা সবাই-ই প্রার্থীদের কাছে জানতে চান ‘নতুন প্রজন্মকে দেশমুখী করতে কী করবেন সিলেট-৬ আসনের প্রার্থীরা?’
গোলাপগঞ্জ-বিয়ানীবাজার উপজেলার প্রবাসীরা দীর্ঘদিন ধরে লন্ডন, আমেরিকা ও ইউরোপের প্রবাসী কমিউনিটিতে নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন। সামাজিক ও রাজনৈতিক নানা বিষয়ের নীতি-নির্ধারণে তাদের প্রভাব সুস্পষ্ট। তারা চান নিজের দেশ ও অঞ্চল ইংল্যান্ড-আমেরিকা-ইউরোপের মতো নাগরিক সুবিধায় সমৃদ্ধ হোক, যাতে প্রবাসে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্ম দেশে আসতে আগ্রহী হয় এবং দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখে।
কিন্তু বাস্তবতার সঙ্গে এই প্রত্যাশার সবসময় মিল থাকে না। এলাকার অবকাঠামো, বিশেষ করে যোগাযোগব্যবস্থার দুরাবস্থা, নিরাপত্তাহীনতা, বিদ্যুৎ সমস্যা এবং মানসম্মত বিনোদনের অভাব প্রবাসে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মকে দেশ থেকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে বলে অনেক প্রবাসীই হতাশা ব্যক্ত করেছেন।
বিয়ানীবাজার উপজেলার দাসউরা গ্রামের যুক্তরাজ্য প্রবাসী নুর উদ্দিন কষ্টের সঙ্গে দৈনিক জৈন্তাবার্তাকে বলেন-‘ছেলে-মেয়েরা দেশে আসতে চায় না, এখানকার রাস্তা ভাঙা, বিনোদন সুবিধা নেই-এ কারণে। আমি গ্রামে নতুন ঘর তৈরি করতে চাই, কিন্তু তারা বলে-দেশে ঘর তৈরি করে কী হবে? আমরা দেশে যাবো না।’
আরেক যুক্তরাজ্য প্রবাসী আব্দুল আলিম বললেন, মেয়েকে দেশে এনে বিয়ে দিতে চেয়েছিলাম, কিন্তু কেউ দেশে আসতে চায় না, কারণ গ্রামের রাস্তা-ঘাট ভালো না, উন্নত সুযোগ-সুবিধা নেই। গোলাপগঞ্জের মেহেরপুর গ্রামের হেলাল উদ্দিন যোগাযোগ সমস্যা ও নিরাপত্তার অভাবে ছেলে-মেয়েদের নিয়ে দেশে আসতে পারেন না। তিনি জানালেন- দেশে আসার নাম নিলেই ছেলে-মেয়েরা আঁতকে ওঠে। হেলাল উদ্দিনের ১৮ বছর বয়সী ছেলে ইমন বলল একবার দেশে গিয়েছিলাম, কিন্তু এয়ারপোর্ট থেকে বাড়ি পর্যন্ত যেতে যে কষ্ট, তা এখনও মনে আছে। নদীর ওপর সেতু নেই, পাকা রাস্তা নেই, বিনোদন পার্ক নেই। রাত হলে চোর-ডাকাতের ভয়।
গোলাপগঞ্জ উপজেলার বুধবারীবাজার ইউনিয়নের যুক্তরাজ্য প্রবাসী জাহেদ আহমদ বলেন- মন চায় ছেলে-মেয়েদের নিয়ে দেশে এসে থাকি, আত্মীয়-স্বজন-গ্রামবাসীর সঙ্গে কিছুদিন কাটাই, কিন্তু গ্রামে বা উপজেলা সদরে শিশুবান্ধব পরিবেশ নেই, নেই কোনো পার্ক। অসুস্থ হলে নেই উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা। তাই দেশে এসে সিলেট শহরে ভাড়া বাসায় থাকতে হয় বাধ্য হয়ে। দেশে এসে যদি নিজের গ্রামে নিজের বাড়িতে ছেলে-মেয়েদের নিয়ে থাকতে না পারি তাহলে কেন দেশে আসা?
জাহেদ আহমদের মেয়ে হুমায়রা (১৫) বলল- আমাদের গ্রামের আপনজনদের খুব ভালো লাগে কিন্তু আমাদের বিনোদনের ভালো কিছু নেই।
বিয়ানীবাজারের আরেক যুক্তরাজ্য প্রবাসী ময়নুল হক বলেন- লন্ডনে বা অন্য দেশে জন্ম নেওয়া শিশু তো সে যেখানে জন্মেছে-বড় হচ্ছে সেখানকার সুযোগ-সুবিধা ও সমাজ ব্যবস্থায় অভ্যস্ত। তাকে দেশে আনলে সে সেই পরিবেশ-সুবিধা না পেয়ে দেশে থাকতে চায় না।
যুক্তরাজ্য প্রবাসী যুবের আহমদ বললেন- আমরা চাই দেশ উন্নত হোক, যাতে আমাদের সন্তানরা দেশে এসে সেরকম পরিবেশ পায়, তারা যেন দেশমুখী হয়। কিন্তু আমাদের সরকার বা জনপ্রতিনিধিরা তার প্রতিফলন ঘটাতে পারেন না।
নাম প্রকাশ না করে গোলাপগঞ্জের এক ফ্রান্স প্রবাসী বললেন- কয়েক বছর আগে আমি কিছু জমি কিনেছি, কিন্তু জমির দখল নিতে পারছি না। যার কাছ থেকে কিনেছি তার ভাতিজা জবরদখল করে রেখেছে কয়েক বছর ধরে।
কথা হয় কানাডা প্রবাসী ময়নুল ইসলামের সাথে- দৈনিক জৈন্তাবার্তাকে তিনি বললেন, নতুন প্রজন্মের দেশে না আসার অনেক কারণ আছে। বিড়ম্বনার শুরু হয় বিমানবন্দর থেকে। এয়ারপোর্টের যাত্রীসেবা নিম্নমানের, আচরণ অস্বাভাবিক, লাগেজ টানাটানি-যা দেখে প্রবাসে বেড়ে ওঠা শিশু-কিশোররা ভয় পায়, বিরক্ত হয়। গাড়িতে যেতে পথে পথে বিশৃঙ্খলা, যানজট, ভাঙা রাস্তার কারণে কষ্টকর ভ্রমণ। এছাড়া বিয়ানীবাজারে বিদ্যুৎ সমস্যা প্রকট, পার্ক নেই, বিনোদনের কিছু নেই। এক কথায় প্রবাসে জন্ম নেওয়া ও বেড়ে ওঠা শিশু-কিশোরদের যে পরিবেশে চায় তা বিয়ানীবাজারে নেই।
ময়নুল ইসলামের ১৫ বছর বয়সী ছেলে আশফাক ইসলাম সিলেটি ভাষায় বলল- ‘রাস্তা যে ভাঙা, আর খালি কারেন্ট যায়, মশায় কামড়াইয়া লাল করিলায় শরীল। বিয়ানীবাজার টাউন পরিষ্কার না, পার্ক, থিয়েটার নাই।
ইতালি প্রবাসী আব্দুল কাইয়ূম বলেন- দেশের অফিস-আদালত, থানা, প্রশাসন-সব জায়গায় দালালে ভরা। আমার ভোটার আইডি করার জন্য কতদিন যে বিয়ানীবাজার উপজেলা নির্বাচন অফিসে গেলাম-শেষে দালালের সাহায্যেই করতে হলো। আমি চাই আমার মৃত্যু যেন দেশের মাটিতে হয়। কিন্তু ভয় হয়, সন্দেহ হয়, আমার ছেলে-মেয়েরা কি সবসময় আসবে আমার কবর জিয়ারত করতে?
নাম প্রকাশ না করে এক যুক্তরাজ্য প্রবাসী বললেন- আমি চাই আমার ছেলে-মেয়েরাও দেশে আসুক, গ্রামের সঙ্গে সম্পর্ক রাখুক। কিন্তু তারা আমাকে বলে-দেশের সব সম্পত্তি এতিমখানা বা মসজিদ-মাদ্রাসায় দান করে দিতে।
প্রবাসীরা এ কারণে সংকিত ও আতঙ্কিত। তাদের কথা-এভাবে চলতে থাকলে একসময় প্রবাসে নতুন প্রজন্মকে আর দেশে আনা যাবে না।
এজন্য তারা সরকারের কাছে প্রবাসীবান্ধব উদ্যোগের বাস্তবায়ন চান। এবারের নির্বাচনে তাই তারা প্রার্থীদের কাছে জানতে চান-‘প্রবাসে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মকে দেশমুখী করতে প্রার্থীরা কী উদ্যোগ নেবেন?’
তাই প্রবাসীদের দাবি- যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, ভাঙাচোরা সড়কের দ্রুত মেরামত, ব্রিজ-কালভার্ট পুনর্র্নিমাণ, আধুনিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণ, সিসিটিভি নেটওয়ার্ক, নিরাপত্তা সেল, বিনোদন ও পর্যটন সুবিধা, পরিবারবান্ধব পার্ক, নদী ও প্রকৃতিনির্ভর পর্যটন কেন্দ্র, সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া অবকাঠামো, দালালমুক্ত প্রশাসনিক সেবা, ভ‚মি রেকর্ড ডিজিটালাইজেশন, অনলাইন সেবা নিশ্চয়তা, প্রবাসী সহায়তা ডেস্ক, জমি-বাড়িুআইনি কাগজে দ্রুত সেবা, বিদেশফেরত পরিবারকে অগ্রাধিকার সেবা নতুন প্রজন্মের জন্য সাংস্কৃতিক-শিক্ষামূলক প্রোগ্রাম, আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা ও প্রযুক্তি কেন্দ্র, বিমানবন্দরের হয়রানি বন্ধ।
বিয়ানীবাজারের প্রবিন শিক্ষাবিদ ও সমাজ সংস্কারক মজির উদ্দিন আনসার বলেন, গ্রামে গ্রামে প্রবাসীদের তৈরী সুন্দর সুন্দর বাড়ীগুলো বছরের পর বছর খালি পড়ে থাকে। আগে শীতকালে প্রবাসীরা দেশে আসতেন স্বপরিবারে কিন্তু গত কয়েকবছরে আসংকাজনক ভাবে এই হার কমে গেছে। অনেক প্রবাসী দেশের জায়গা জমি বিক্রী করতে চইছেন তা দেশের জন্য অশনি সংকেত।
বিশ্লেষকদের মতে- এভাবে চলতে থাকলে নতুন প্রজন্ম দেশে আসবে না, সম্পত্তি বিক্রি করে দেবে, দেশের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করবে, ভবিষ্যতে রেমিট্যান্স কমে যাবে, স্থানীয় অর্থনীতি দুর্বল হবে। বর্তমানে বিয়ানীবাজার-গোলাপগঞ্জের অর্থনীতি বড় অংশ প্রবাসীদের ওপর নির্ভরশীল। নতুন প্রজন্ম দেশবিমুখ হলে এর প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, আসন্ন নির্বাচন প্রার্থীদের জন্য বড় একটি পরীক্ষা- কে প্রবাসীদের এই সংকট ও নতুন প্রজন্মের বিচ্ছিন্নতার বাস্তবতা বুঝে বাস্তবসম্মত রোডম্যাপ উপস্থাপন করতে পারেন-তার ওপরই নির্ভর করবে প্রবাসীদের আস্থা ও ভবিষ্যৎ সম্পৃক্ততা।
এবারের নির্বাচনে তাই প্রবাসীদের মূল প্রশ্ন-প্রার্থীরা কীভাবে নতুন প্রজন্মকে দেশমুখী করতে একটি বাসযোগ্য, নিরাপদ, আধুনিক ও সুযোগসমৃদ্ধ বিয়ানীবাজার-গোলাপগঞ্জ নির্মাণে দায়িত্বশীল ভূমিকা নেবেন।
জৈন্তা বার্তা/ ওয়াদুদ




