ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে সিলেটের রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তাপ এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ভোট। সময় যত ঘনিয়ে আসছে, নির্বাচনী মাঠ ততই সরগরম হয়ে উঠছে। নাওয়া-খাওয়া ভুলে প্রার্থী ও তাঁদের সমর্থকেরা ছুটছেন ভোটারের দ্বারে দ্বারে। দিচ্ছেন প্রতিশ্রুতি, শোনাচ্ছেন স্বপ্নের কথা। এর পাশাপাশি পাল্টাপাল্টি বক্তব্য, রাজনৈতিক আক্রমণ আর কথার লড়াই মিলিয়ে পুরো পরিবেশই এখন নির্বাচনী রঙে রাঙানো।
সিলেট জেলার ছয়টি সংসদীয় আসনের প্রতিটিতেই এখন প্রধান আলোচ্য বিষয়- কার সঙ্গে কার লড়াই। কে এগিয়ে, কে পিছিয়ে। কার প্রচারণা শক্ত, কার অবস্থান দুর্বল। জনসমর্থন ও রাজনৈতিক সমীকরণ মিলিয়ে প্রতিটি আসনেই চলছে টানটান উত্তেজনা। এই প্রেক্ষাপটে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে সিলেট-২ আসন।
বিশ্বনাথ ও ওসমানীনগর উপজেলা নিয়ে গঠিত সিলেট-২ আসন দীর্ঘদিন ধরেই রাজনীতিতে আলাদা পরিচিতি বহন করে আসছে। এই আসন গুম হওয়া বিএনপি নেতা এম ইলিয়াস আলীর ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। এখানকার মানুষের কাছে এম ইলিয়াস আলী কেবল একজন রাজনৈতিক নেতা নন, তিনি এক আবেগের নাম। তাঁর নিখোঁজ হওয়ার এক যুগ পেরিয়ে গেলেও সেই আবেগ আজও অমলিন।
২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল নিখোঁজ হন এম ইলিয়াস আলী। এরপর থেকেই এই আসনের রাজনীতিতে তৈরি হয় এক বিশেষ শূন্যতা। সেই শূন্যতার মাঝেও ইলিয়াস পরিবারের প্রতি মানুষের আস্থা ও ভালোবাসা অটুট রয়েছে। তারই প্রমাণ মিলেছে বিভিন্ন নির্বাচনে। ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইলিয়াস পরিবারের সমর্থনে এই আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন গণফোরামের নেতা মোকাব্বির খান। স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতেও ইলিয়াস পরিবারের সমর্থন পেয়ে অনেক প্রার্থী সহজেই বিজয়ী হয়েছেন।
নির্বাচনী ইতিহাস বলছে, সিলেট ২ আসনে আওয়ামী লীগ চারবার, বিএনপি দুইবার, জাতীয় পার্টি দুইবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত করেছে। এছাড়া গণফোরাম ও গণতন্ত্রী পার্টির প্রার্থীও একবার করে জয় পেয়েছেন। অর্থাৎ এই আসনের রাজনীতি বরাবরই প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হলেও আবেগ এখানে বড় ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করেছে।
এবারের নির্বাচনে সেই আবেগ আরও স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। এই আসনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন পেয়েছেন এম ইলিয়াস আলীর সহধর্মিণী তাহসিনা রুশদীর লুনা। শুরু থেকেই ভোটের মাঠে তিনি এগিয়ে আছেন। প্রচারণা, গণসংযোগ ও জনসমর্থন- সব ক্ষেত্রেই তাঁর অবস্থান অন্যদের তুলনায় অনেক শক্ত।
ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, লুনার ধারেকাছেও নেই অন্য কোনো প্রার্থী। অনেক ভোটারের ভাষায়, লুনার সঙ্গে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের ব্যবধান হবে ‘আকাশ-পাতাল’। গ্রাম থেকে বাজার, চা-দোকান থেকে হাট- সব জায়গায় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এখন লুনা।
এই আসনে লুনার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী, খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব মুহাম্মদ মুনতাসির আলীকে। ভোটারদের মতে, তিনি কিছুটা ভোট টানতে সক্ষম। তবে সেই ভোট জয়ের জন্য যথেষ্ট নয়। সর্বোচ্চ যা হতে পারে, তা হলো ব্যবধান কিছুটা কমানো।
দেওয়াল ঘড়ি প্রতীক নিয়ে মুনতাসির আলী মাঠে সক্রিয় রয়েছেন। বিভিন্ন এলাকায় তাঁকে গণসংযোগ করতে দেখা যাচ্ছে। তবে তাঁর প্রচারণা জনজোয়ার সৃষ্টি করতে পারেনি। লুনার সঙ্গে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতার জায়গায় তিনি এখনো অনেক পিছিয়ে। ২০১৮ সালের নির্বাচনে খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মুহাম্মদ মুনতাসির আলী ৫ হাজার ১৭১ ভোট পেয়েছিলেন।
মুনতাসির আলী ছাড়া বাকি প্রার্থীদের প্রচারণা অনেকটাই সীমিত। নামকাওয়াস্তে পোস্টার, লিফলেট আর অল্প কিছু গণসংযোগের মধ্যেই তাঁদের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ। ভোটের মাঠে তাঁদের উপস্থিতি খুব একটা চোখে পড়ছে না।
বর্তমানে এই আসনে মোট পাঁচজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এর মধ্যে প্রচারণায় স্পষ্টভাবে এগিয়ে আছেন ধানের শীষের প্রার্থী তাহসিনা রুশদীর লুনা। খেলাফত মজলিসের প্রার্থী দেওয়াল ঘড়ি প্রতীক নিয়ে মাঠে থাকলেও অন্যরা অনেকটাই নিষ্প্রভ।
এছাড়া ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. আমির উদ্দিন হাতপাখা প্রতীক নিয়ে, জাতীয় পার্টির মাহবুবুর রহমান চৌধুরী লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে এবং গণফোরামের মো. মুজিবুল হক উদীয়মান সূর্য প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তবে তাঁদের প্রচারণা ভোটারদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারেনি।
পেছনে তাকালে সিলেট-২ আসনের নির্বাচনী ইতিহাস বর্তমান পরিস্থিতিকে আরও পরিষ্কার করে। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী মুক্তিযোদ্ধা শাহ আজিজুর রহমান বিজয়ী হয়েছিলেন পরের বার ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত জোটের প্রার্থী এম ইলিয়াস আলী বিজয়ী হন। ২০০৮ সালের নির্বাচনে নৌকার প্রার্থী শফিকুর রহমান চৌধুরী তাঁকে পরাজিত করে প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
২০১৪ সালের নির্বাচনে ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। আওয়ামী লীগ এ আসনে প্রার্থী দেয়নি। বিএনপি নির্বাচন বর্জন করে। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটের লাঙল প্রতীকের প্রার্থী এ এম ইয়াহইয়া চৌধুরী এহিয়া জয়ী হন।
২০১৮ সালের নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের হয়ে উদীয়মান সূর্য প্রতীক নিয়ে ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী মোকাব্বির খান ৬৯ হাজার ৪২৩ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্ব›দ্বী স্বতন্ত্র প্রার্থী মুহিবুর রহমান পান ৩০ হাজার ৪৪৯ ভোট। সে সময় লাঙল প্রতীকের প্রার্থী এ এম ইয়াহইয়া চৌধুরী এহিয়া ১৮ হাজার ৩২ ভোট পেয়ে চতুর্থ হন। খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মুহাম্মদ মুনতাসির আলী পান ৫ হাজার ১৭১ ভোট এবং ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী মো. আমির উদ্দিন পান ১ হাজার ৭৪০ ভোট।
২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি আবারও নির্বাচন বর্জন করে। সেবার এই আসনে সাতজন প্রার্থী প্রতিদ্ব›িদ্বতা করেন। এর মধ্যে পাঁচজন প্রার্থী জামানত হারান। নৌকার প্রার্থী শফিকুর রহমান চৌধুরী ৭৮ হাজার ৩৮৮ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্ব›দ্বী স্বতন্ত্র প্রার্থী মুহিবুর রহমান ট্রাক প্রতীক নিয়ে পান ১৬ হাজার ৬৬১ ভোট।
এবার সিলেট-২ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৬৮ হাজার ৯৩২ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৮৮ হাজার ৬৭৯ জন এবং নারী ভোটার ১ লাখ ৮০ হাজার ২৫৩ জন।
সব দিক বিবেচনায় ইতিহাস, আবেগ ও বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা মিলিয়ে একটি চিত্রই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। সিলেট-২ আসনে তাহসিনা রুশদীর লুনা এগিয়ে রয়েছেন স্পষ্ট ব্যবধানে। ভোটের মাঠে তিনিই এখন মূল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। অন্য প্রার্থীরা থাকলেও প্রতিযোগিতার বাস্তব চিত্রে তারা অনেকটাই পিছিয়ে।
জৈন্তা বার্তা/আরআর




