ছবি:সংগৃহীত
আব্দুল ওয়াদুদ:
তিন দশকের প্রবাসজীবন শেষে দেশে ফিরে নিজের গ্রামকে পরিচ্ছন্ন ও বাসযোগ্য করে তোলার ব্রত নিয়েছেন সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলার মোল্লাপুর ইউনিয়নের জলঢুপ পাতন গ্রামের বাসিন্দা মো. নাসির উদ্দিন। সরকারি কোনো দায়িত্ব বা আর্থিক প্রণোদনার অপেক্ষায় না থেকে তিনি এক যুগেরও বেশি সময় ধরে সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাশ্রমে গ্রামের পরিবেশ রক্ষায় কাজ করে যাচ্ছেন।
সকালের সূর্য ওঠার আগেই হাতে দা কিংবা কোদাল নিয়ে বেরিয়ে পড়েন মো. নাসির উদ্দিন। উদ্দেশ্য একটাই-নিজ গ্রামের রাস্তাঘাট, নালা-নর্দমা ও ছড়ার পাড় পরিষ্কার রাখা। কোনো সরকারি দায়িত্ব নয়, নেই কোনো পারিশ্রমিক কিংবা ব্যক্তিগত লাভের প্রত্যাশা। কেবল নাগরিক দায়িত্ববোধ থেকেই এক যুগেরও বেশি সময় ধরে তিনি একাই চালিয়ে যাচ্ছেন এই ব্যতিক্রমী সেবাকর্ম।
বাংলাদেশে পরিচ্ছন্ন পরিবেশ গড়ে তোলার দায়িত্ব কেবল সরকার বা স্থানীয় প্রশাসনের নয়; এটি প্রতিটি নাগরিকের নৈতিক দায়িত্বও। কিন্তু বাস্তবে আমরা প্রায়ই দায়িত্ব এড়িয়ে চলি, অন্যের দিকে তাকিয়ে থাকি। এমন বাস্তবতায় মো. নাসির উদ্দিন প্রমাণ করেছেন, একজন মানুষের আন্তরিক উদ্যোগও একটি গ্রামের পরিবেশ, মানুষের মানসিকতা এবং সামাজিক সংস্কৃতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে।
প্রায় ৩০ বছর সংযুক্ত আরব আমিরাতে কর্মজীবন শেষে ২০১৪ সালে দেশে ফিরে তিনি ব্যক্তিগত স্বাচ্ছন্দ্যের জীবন বেছে নেননি। বরং নিজের অর্থ ও শ্রম ব্যয় করে গ্রামের রাস্তাঘাট, ড্রেন, নালা-নর্দমা, ছড়া এবং জনসাধারণের চলাচলের পথ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেছেন। নিয়মিতভাবে গবাদিপশুর বর্জ্য, প্লাস্টিক ও অন্যান্য আবর্জনা অপসারণের পাশাপাশি আগাছাও পরিষ্কার করেন তিনি। তার এই কাজ কোনো প্রদর্শনীর জন্য নয়; এটি সমাজ ও পরিবেশের প্রতি গভীর দায়বদ্ধতার বহিঃপ্রকাশ।
তার এই নীরব উদ্যোগ সম্প্রতি জাতীয় পর্যায়ে আলোচনায় আসে। একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টুর দৃষ্টিগোচর হলে তিনি বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেন। মন্ত্রীর নির্দেশে পরিবেশ অধিদপ্তরের সিলেট বিভাগীয় কার্যালয়ের একটি প্রতিনিধিদল গত ১৮ জুলাই বিয়ানীবাজার উপজেলার মোল্লাপুর ইউনিয়নের জলঢুপ পাতন গ্রামে গিয়ে নাসির উদ্দিনের কার্যক্রম সরেজমিনে পরিদর্শন করে। পরিবেশ রক্ষা ও দূষণ নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘদিনের অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে সম্মাননা-স্বরূপ সৌজন্য উপহার দেওয়া হয়।
এ ধরনের স্বীকৃতি নিঃসন্দেহে আনন্দের। তবে শুধু সম্মাননা দিয়েই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। সমাজে যারা নীরবে জনকল্যাণে কাজ করছেন, তাদের অভিজ্ঞতা ও উদ্যোগকে ছড়িয়ে দিতে রাষ্ট্র, স্থানীয় প্রশাসন এবং সামাজিক সংগঠনগুলোর আরও কার্যকর ভূমিকা রাখা প্রয়োজন। কারণ পরিবেশ রক্ষার সবচেয়ে শক্তিশালী উপায় আইন নয়, মানুষের সচেতনতা; আর সেই সচেতনতা গড়ে ওঠে নাসির উদ্দিনের মতো মানুষের কাজ দেখে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, নাসির উদ্দিনের এই উদ্যোগ শুধু গ্রামকে পরিচ্ছন্ন রাখেনি, পরিবেশ সংরক্ষণে সাধারণ মানুষের মধ্যেও সচেতনতা তৈরি করেছে। বিশেষ করে তরুণদের কাছে তিনি একজন অনুকরণীয় ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেছেন। এটি প্রমাণ করে, একজন মানুষের ইতিবাচক উদ্যোগ অন্য অনেক মানুষকে বদলে দিতে পারে।
মতবিনিময় সভায় গ্রামের বাসিন্দারা যথার্থই বলেছেন, ব্যক্তিগত উদ্যোগে দীর্ঘদিন ধরে এমন নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করে যাওয়া সত্যিই বিরল। তার এই কর্মকাণ্ড ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে পরিবেশ রক্ষায় আরও দায়িত্বশীল হতে উদ্বুদ্ধ করবে। পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রতিনিধিরাও উল্লেখ করেছেন, নাসির উদ্দিনের মতো সচেতন নাগরিকদের উদ্যোগ পরিবেশ সংরক্ষণ ও দূষণ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে এবং এ ধরনের স্বেচ্ছাসেবামূলক কর্মকাণ্ড সমাজের অন্যদেরও অনুপ্রাণিত করবে।
আজ জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশ দূষণ এবং প্লাস্টিক বর্জ্যের ভয়াবহতার সময়ে নাসির উদ্দিনের মতো মানুষের কাজ আমাদের নতুন করে ভাবতে শেখায়। উন্নয়ন কেবল বড় বড় অবকাঠামো নির্মাণে সীমাবদ্ধ নয়; উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয়, যখন মানুষ নিজের সমাজ ও পরিবেশের প্রতি দায়িত্বশীল হয়ে ওঠে।
আমরা প্রায়ই সমাজ বদলের জন্য বড় কোনো উদ্যোগ বা নেতৃত্বের অপেক্ষা করি। অথচ বাস্তবতা হলো, একজন দায়িত্বশীল মানুষও একটি গ্রাম বদলে দিতে পারেন, একটি প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করতে পারেন এবং সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তনের সূচনা ঘটাতে পারেন। নাসির উদ্দিন সেই সম্ভাবনারই উজ্জ্বল প্রতীক। তাই তার এই নীরব সেবাকর্ম শুধু প্রশংসার দাবিদার নয়, বরং অনুসরণীয়ও। যদি দেশের প্রতিটি গ্রাম ও মহল্লায় একজন করে নাসির উদ্দিন তৈরি হয়, তবে পরিচ্ছন্ন, সচেতন ও পরিবেশবান্ধব বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নিতে খুব বেশি সময় লাগবে না।
জৈন্তা বার্তা/ ওয়াদুদ




