সংগৃহিত
রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী, মেয়ে ও ১২ বছর বয়সী ছেলেকে শ্বাসরোধে হত্যার ঘটনায় পুলিশের তদন্তে নতুন তথ্য সামনে এসেছে। পুলিশের দাবি, প্রথমে বাসার তৃতীয় তলার খোলা ছাদে গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী ও মেয়েকে হত্যা করা হয়। পরে লাশগুলো ছাদের গেটের ভেতরে সিঁড়ির কাছে সরিয়ে রাখা হয়, যাতে পাশের বাড়ির ছাদ থেকে দেখা না যায়। এরপর ঘুম থেকে উঠে অভিযুক্ত সিদ্ধার্থ দাসকে দেখে ফেলায় গণপতি চক্রবর্তীর ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তীকেও হত্যা করা হয়।
বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) সকাল ১০টায় রংপুর পুলিশ কমিশনার কার্যালয়ের মিলনায়তনে সংবাদ সম্মেলনে রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ এসব তথ্য জানান।
পুলিশ কমিশনার বলেন, গণপতি চক্রবর্তীর বাসার ছাদে ইয়াবা সেবনের জন্য যাতায়াত করতেন গ্রেপ্তার হওয়া দুই তরুণ সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাস। ছাদের চারপাশে দেয়াল থাকায় বাইরে থেকে সহজে দেখা যেত না। এ কারণে তাঁরা পানির ট্যাংকের আড়ালে বসে ইয়াবা সেবন করতেন।
সিদ্ধার্থের আদালতে দেওয়া জবানবন্দির বরাত দিয়ে পুলিশ কমিশনার জানান, ঘটনার রাতে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ আটটি ইয়াবা সেবন করেন। ভোরে গণপতি চক্রবর্তী ছাদে হাঁটতে গিয়ে তাঁদের দেখতে পান। তিনি ধমক দিয়ে জানতে চান, তাঁরা এত সকালে সেখানে কী করছেন। তখন দুই তরুণের মাথা ঠিকমতো কাজ করছিল না এবং আত্মসম্মানের ভয়ে তাঁরা গণপতি চক্রবর্তীর গলায় গামছা পেঁচিয়ে টান দিয়ে তাঁকে হত্যা করেন বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, শব্দ শুনে গণপতি চক্রবর্তীর স্ত্রী ও মেয়ে ছাদে চলে আসেন। তাঁরা চিৎকার করলে মুগ্ধ গণপতির গলায় থাকা গামছা দিয়ে তাঁর স্ত্রীর গলা চেপে ধরেন। অন্যদিকে সিদ্ধার্থ মেয়ের গলা ও মুখ চেপে ধরেন। পরে দুজন মিলে গামছা দিয়ে তাঁর গলায় পেঁচিয়ে ধরেন। তাতেও মৃত্যু না হওয়ায় কবুতরের খাবার রাখার বাক্সের পাশ থেকে রশি এনে তাঁর গলায় পেঁচিয়ে দুই দিক থেকে টান দেওয়া হয় বলে পুলিশের দাবি।
এরপর ছাদে থাকা একটি পুরোনো প্লাস দিয়ে বিদ্যুতের তার কেটে দেন দুই তরুণ। পুলিশ বলছে, বাড়িতে সিসিটিভি ক্যামেরা থাকায় সেটি যেন বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে অকার্যকর হয়ে যায়, সে উদ্দেশ্যেই তাঁরা তার কেটে দেন।
পুলিশ কমিশনার জানান, পরে সিদ্ধার্থ আবার ছাদে গিয়ে মুগ্ধকে সঙ্গে নিয়ে গণপতি চক্রবর্তীর স্ত্রী ও মেয়ের লাশ ছাদের গেটের ভেতরে সিঁড়ির দিকে সরিয়ে রাখেন। পাশের বাড়ির ছাদ মাত্র দুই ফুট দূরে হওয়ায় সেখান থেকে যাতে লাশ দেখা না যায়, সে জন্য এভাবে রাখা হয়।
এরপর দুই তরুণ গণপতি চক্রবর্তীর কক্ষে প্রবেশ করলে তাঁর ১২ বছর বয়সী ছেলে আয়ুশ ঘুম থেকে উঠে সিদ্ধার্থকে দেখতে পায়। সে সিদ্ধার্থকে ‘সিদ্ধার্থ দাদা, তুমি এখানে কেন?’ বলে প্রশ্ন করে। শিশুটির চিৎকারে আশপাশের লোকজন বিষয়টি জেনে যেতে পারে-এমন আশঙ্কায় কাপড় দিয়ে গলা পেঁচিয়ে আয়ুশকেও হত্যা করা হয় বলে পুলিশের দাবি।
আগের বক্তব্যের সঙ্গে ভিন্নতা
হত্যাকাণ্ডের স্থান ও সময় নিয়ে পুলিশের আগের বক্তব্যের সঙ্গে এবারের বক্তব্যে কিছুটা ভিন্নতা দেখা গেছে। এর আগে পুলিশ জানিয়েছিল, গণপতি চক্রবর্তীকে ভোরে বাসার ছাদে, তাঁর স্ত্রী ও মেয়েকে তিনতলার সিঁড়িতে এবং আয়ুশকে ঘুমন্ত অবস্থায় হত্যা করা হয়।
এ বিষয়ে পুলিশ কমিশনার বলেন, আগের সংবাদ সম্মেলনে গ্রেপ্তার দুই তরুণের কাছ থেকে পাওয়া প্রাথমিক বক্তব্যের ভিত্তিতে তথ্য দেওয়া হয়েছিল। পরে আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিতে সিদ্ধার্থ জানিয়েছে, আয়ুশ ঘুম থেকে উঠে তাকে দেখে ফেলেছিল।
হত্যার কারণ নিয়েও নতুন তথ্য
হত্যাকাণ্ডের কারণ নিয়েও তদন্তে নতুন বিষয় সামনে এসেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। আগে বলা হয়েছিল, ছাদে ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে ক্ষুব্ধ হয়ে দুই তরুণ এ হত্যাকাণ্ড ঘটায়। তবে এবার পুলিশ জানিয়েছে, ইয়াবা সেবনে বাধার পাশাপাশি জমিজমা নিয়ে সিদ্ধার্থের অসন্তোষও হত্যার পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।
সিদ্ধার্থের আদালতে দেওয়া জবানবন্দির বরাত দিয়ে পুলিশ কমিশনার বলেন, গণপতি চক্রবর্তীরা সিদ্ধার্থের পূর্বপুরুষের জমি কিনেছিলেন। জমিটি তুলনামূলক বেশি দামে কেনা হলেও সিদ্ধার্থের পরিবারের শরিকেরা তাঁদের প্রাপ্য অর্থ পাননি-এমন একটি বিষয় তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। এ নিয়ে সিদ্ধার্থের মনে ক্ষোভ ছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এ ছাড়া গণপতি চক্রবর্তীর পরিবার ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে সামাজিক দূরত্বের বিষয়টিও তদন্ত করা হচ্ছে। পুলিশ বলছে, মাছুয়াপাড়ার অধিকাংশ বাসিন্দা দাস বংশের এবং গণপতি চক্রবর্তীর পরিবার ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়ের। তাঁদের মধ্যে রাস্তাঘাটে দেখা-সাক্ষাৎ হলেও ঘনিষ্ঠ মেলামেশা বা পারিবারিক যাতায়াত ছিল না। এ বিষয়টি দুই তরুণের মনে কোনো ক্ষোভ তৈরি করেছিল কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় রয়েছে।
চারজনের মরদেহ উদ্ধার
গত শনিবার রাতে রংপুর নগরের কামাল কাছনা এলাকার মাছুয়াপাড়ার একটি বাসা থেকে গণপতি চক্রবর্তী (৬৫), তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০), মেয়ে আগামী চক্রবর্তী (২৫) ও ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তীর (১২) মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, চারজনকেই শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে।
এ ঘটনায় সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ ও ঘটনার সঙ্গে আরও কেউ জড়িত কি না, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য দেওয়ার পর পুলিশ কমিশনার সাংবাদিকদের কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর দেন। তবে মাত্র দুটি প্রশ্নের উত্তর দিয়ে তিনি দ্রুত সংবাদ সম্মেলনস্থল ত্যাগ করেন। এতে পুলিশের বক্তব্যের পরিবর্তন, হত্যাকাণ্ডের স্থান, সময় ও কারণ নিয়ে বিস্তারিত প্রশ্নের সুযোগ না থাকায় উপস্থিত সাংবাদিকদের মধ্যে প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।
জৈন্তা বর্তা / ওয়াদুদ




