ছবি: জৈন্তা বার্তা
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবি) উন্নয়ন প্রকল্প ফেজ-২-এর আওতায় নির্মাণাধীন দুটি গুরুত্বপূর্ণ ভবনে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ও মেয়াদোত্তীর্ণ সিমেন্ট ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। ৩৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন ক্লাব কমপ্লেক্স ও ৪৪ কোটি টাকা বাজেটের বিদেশি শিক্ষার্থীদের হোস্টেল ভবনে মেয়াদোত্তীর্ণ সিমেন্ট ও তুলনামূলক কম মূল্যের রড ব্যবহার হচ্ছে। এ ছাড়া নির্মাণকাজে মাটি মিশ্রিত বালু, পাথরের সঙ্গে মাটি-বালু মিশে থাকার চিত্রও দেখা গেছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ভবনগুলোর নির্মাণকাজ শেষ হওয়া নিয়েও সংশয় দেখা দিয়েছে। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জামাল কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেড ও চিফ ইঞ্জিনিয়ার জয়নাল ইসলাম চৌধুরী।
এ বিষয়ে সরেজমিনে সংবাদ সংগ্রহে গেলে প্রথমেই কনস্ট্রাকশন এরিয়ায় প্রবেশে বাধা দেওয়া হয়। পরবর্তীতে চিফ ইঞ্জিনিয়ার জয়নাল ইসলাম চৌধুরীর হস্তক্ষেপে কনস্ট্রাকশন ঘুরে দেখার অনুমতি মেলে। জামাল কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেডের শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রজেক্ট ম্যানেজার (পিএম) মনসুর রহমান সাথে থেকে পুরো ভবনের নির্মাণকাজ দেখান।
এর আগে সাংবাদিকের উপস্থিতি টের পেয়ে নির্মাণকাজের বালি তড়িঘড়ি করে ঢেকে দেওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করা হয়। পরবর্তীতে পিএমকে সঙ্গে নিয়ে বালু দেখা হয়। দেখা যায়, বালিতে বড় একটি অংশ মাটি। প্রাথমিকভাবে সেগুলোকে মাটি হিসেবে স্বীকৃতি না দিলেও একপর্যায়ে পিএম মনসুর রহমান স্বীকার করেন, সেগুলো মাটি। তিনি জানান, এসব বালু জাফলং থেকে আসে এবং মাঝেমধ্যে অসাবধানতাবশত মাটি চলে আসে।
নির্মাণকাজে ব্যবহৃত পাথরেও একই অবস্থা দেখা যায়। দেখা যায়, পাথরের সঙ্গে মাটি-বালি মিশে একাকার। তবে এ বিষয়ে কোনো সদুত্তর মেলেনি। সিমেন্ট দেখতে গেলে দেখা যায়, সিমেন্ট রাখার স্থানে ফ্রেশ সিমেন্ট রয়েছে। উইকিপিডিয়ার তথ্যমতে, বাংলাদেশে স্থায়িত্ব ও টেকসই অনুযায়ী শীর্ষ ১০-এ না থাকা ফ্রেশ সিমেন্ট, এমনকি পিডব্লিউডি মানদ- অনুযায়ী পরীক্ষা ও অনুমোদন সাপেক্ষে ১১ নম্বরে তালিকাভুক্ত। এসব সিমেন্টের মেয়াদ চলতি মাসেই (আগস্ট-সেপ্টেম্বর) শেষ। তবে কিছু সিমেন্টের মেয়াদ থাকলেও অবহেলার কারণে কিছু বস্তার সিমেন্ট পাথরে পরিণত হয়েছে।
অন্যদিকে রড এবং বৈদ্যুতিক সংযোগের পাইপেও দেখা যায় নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী। নির্মাণে এসসিআরএম স্টিল ও খাজা পিভিসি পাইপ ব্যবহার হচ্ছে। উইকিপিডিয়ার তথ্যসূত্র অনুযায়ী, এসসিআরএম স্টিল বাংলাদেশে স্থায়িত্ব ও টেকসইয়ের দিক থেকে শীর্ষ ১০-এ নেই। এমনকি পিডব্লিউডি মানদ- অনুযায়ী পরীক্ষা ও অনুমোদন সাপেক্ষে এসসিআরএম স্টিল ১৮ নম্বরে তালিকাভুক্ত।
পরবর্তীতে জামাল কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেডের আওতাধীন ৪৪ কোটি টাকা বাজেটের নির্মাণাধীন বিদেশি শিক্ষার্থীদের হোস্টেলে গেলে একই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি ঘটে। নির্মাণাধীন ওই হোস্টেলেও ব্যবহৃত হচ্ছে মাটি মিশ্রিত বালু। এখানে ব্যবহৃত হচ্ছে জেএসআরএম স্টিল, সিমেন্ট। উইকিপিডিয়ার তথ্যমতে, বাংলাদেশের সিমেন্টের ভেতর স্থায়িত্ব ও টেকসই অনুযায়ী শীর্ষ ১০-এ নেই। এমনকি পিডব্লিউডি মানদ- অনুযায়ী পরীক্ষা ও অনুমোদন সাপেক্ষে এসআরএম স্টিল তালিকাভুক্ত নয়। সবচেয়ে আতঙ্কের বিষয় হলো, এই নির্মাণাধীন ভবনে মেয়াদোত্তীর্ণ সিমেন্ট ব্যবহার হচ্ছে। ব্যবহৃত ফ্রেশ সিমেন্টের মেয়াদ শেষ হয়েছে গত জুলাই মাসে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. এইচএমএ মাহজুজের মতে, “মেয়াদোত্তীর্ণ সিমেন্ট ব্যবহার করলে পর্যাপ্ত শক্তি পাওয়া যায় না। অনেক সময় মেয়াদোত্তীর্ণ সিমেন্ট পাথরের মতো শক্ত হয়ে যায়। ফলে এটি ভালোভাবে মিশ্রিত হয় না এবং কংক্রিটের কাঙ্ক্ষিত গুণগত মান ও শক্তি নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না। সিমেন্ট দুই মাসের বেশি সময় সংরক্ষিত থাকলে তা ব্যবহার না করাই ভালো। মেয়াদোত্তীর্ণ সিমেন্ট ব্যবহার করলে ভবনের কাঙ্ক্ষিত শক্তি ও গুণগত মান নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না।”
রডের বিষয়ে তিনি বলেন, “পরীক্ষায় যদি পিডব্লিউডির নির্ধারিত ৬০ কেএসআই (কিলোপাউন্ড পার স্কয়ার ইঞ্চি) মান নিশ্চিত হয়, তাহলে ব্যবহারে আপত্তির যৌক্তিক কারণ নেই। তবে আমরা সব সময় ভালো ব্র্যান্ড ও মানসম্মত রড ব্যবহারের পরামর্শ দিয়ে থাকি।”
পাথর ব্যবহারের বিষয়ে তিনি বলেন, “সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পাথরের গ্রেডেশন অনুযায়ী ছোট থেকে বড় বিভিন্ন আকারের পাথর নির্দিষ্ট অনুপাতে থাকতে হয়। একই আকারের পাথর ব্যবহার করা উচিত নয়। এ ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ১৯ মিলিমিটার এবং সর্বনিম্ন ১০ মিলিমিটার আকারের পাথর থাকা প্রয়োজন।”
নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ও মেয়াদোত্তীর্ণ সিমেন্ট বিষয়ে জানতে প্রজেক্ট ম্যানেজার মনসুর রহমানকে প্রশ্ন করা হলে বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে তিনি কল কেটে দেন। পরবর্তীতে মনসুর রহমান চিফ ইঞ্জিনিয়ার জয়নাল ইসলাম চৌধুরীকে সঙ্গে নিয়ে সাক্ষাৎকার দেন।
এ সময় জয়নাল ইসলাম চৌধুরীকে মেয়াদোত্তীর্ণ সিমেন্টের ছবি হোয়াটসঅ্যাপে দেওয়া হলে তিনি বলেন, “আমি হোয়াটসঅ্যাপ চেক করতে পারবো না।”
সাইটে সব ধরনের মাটি (বালু) থাকবে, সব ধরনের কাজ হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। নিম্নমানের রড ও সিমেন্টের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, “পিডব্লিউডি স্ট্যান্ডার্ড হলে ১০ নম্বর না ১২ নম্বর এগুলো নিয়ে আমাদের আর কোনো প্রশ্ন নেই।”
যেখানে যেখানে অভিযোগ, সেগুলো সব ল্যাব টেস্টে পাঠানোর কথা বলেন তিনি। ল্যাবে পাঠালে যদি অন্যরকম রিপোর্ট আসে, তখন কী হবে এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, “আজ পর্যন্ত অন্যরকম রিপোর্ট আসেনি।”
শীর্ষ ১০-এ না থাকা সিমেন্ট ব্যবহারের কারণ জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, “যে প্রতিষ্ঠান আগে নিবন্ধন হয়েছে সেগুলো আগে আসছে, যেগুলো নতুন প্রতিষ্ঠান সেগুলো লিস্টের নিচের দিকে। শীর্ষ ১০-এ না থাকা মানে সেটা শীর্ষে থাকা রড/সিমেন্ট থেকে নিম্নমানের না।”
তিনি আরও বলেন, “এগুলো কোনো প্রশ্ন করার বিষয় না, পিডব্লিউডি স্ট্যান্ডার্ড হলেই হয়েছে।” একপর্যায়ে রাগান্বিত হয়ে তিনি বলেন, “যা উত্তর দেয়ার দিয়েছি, উত্তরের সাথে আবার প্রশ্ন করবে না।”
নির্মাণাধীন ভবনটির কাজ শেষ হওয়ার সময় নিয়েও রয়েছে সংশয়। প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের বক্তব্য অনুযায়ী, ২০২৭ সালের জুনে ভবনের কাজ শেষ হলেও আনুষঙ্গিক সবকিছু শেষ করতে ২০২৮ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
এ বিষয়ে কথা বলতে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. খাইরুল ইসলামের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি কল কেটে দেন।
জৈন্তা বার্তা/ ওয়াদুদ




