সংগৃহিত
সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর পৌর শহরের বটেরতল এলাকার শাহজালাল ডায়াগনস্টিক সেন্টারে এক নারীকে চিকিৎসা দেওয়ার ক্ষেত্রে অবহেলার অভিযোগ উঠেছে এক চিকিৎসকের বিরুদ্ধে। স্বজনদের অভিযোগ, এক্স-রে রিপোর্টে হাড় ভাঙার চিত্র স্পষ্ট থাকলেও তা শনাক্ত না করে রোগীকে শুধু ব্যথানাশক ওষুধ দিয়ে বাড়ি পাঠানো হয়। এক সপ্তাহ ধরে অসহ্য ব্যথায় ভোগার পর ওই নারীকে সিলেটে একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। সেখানে জরুরি অস্ত্রোপচারের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্য ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার চিলাউড়া-হলদিপুর ইউনিয়নের শালদিঘা গ্রামের বাসিন্দা হোসনা বেগম গত ১২ সেপ্টেম্বর নিজ বাড়ির উঠানে পড়ে গিয়ে গুরুতর আহত হন। পরে স্বজনরা তাঁকে জগন্নাথপুর পৌর শহরের বটেরতল এলাকায় শাহজালাল ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিয়ে যান।
সেখানে সিলেট উইমেন্স মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফিজিওলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. সৈয়দ নাদিম আহমদের পরামর্শে তাঁর এক্স-রে করা হয়। পরিবারের দাবি, এক্স-রে প্রতিবেদনের নির্দিষ্ট স্থানে হাড় ভাঙার চিত্র দেখা গেলেও চিকিৎসক তা শনাক্ত করেননি। বরং তিনি জানান, কোনো হাড় ভাঙেনি; কোমরের হাড়ে সামান্য ক্ষয় হয়েছে। পরে ১০ দিনের ব্যথানাশক ওষুধ দিয়ে রোগীকে বাড়ি পাঠানো হয় এবং ওষুধ সেবন করলে ব্যথা কমে যাবে বলে জানানো হয়।
তবে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ সেবনের পরও হোসনা বেগমের শারীরিক অবস্থার উন্নতি হয়নি। বরং ব্যথা ও শারীরিক অসুস্থতা ক্রমে বাড়তে থাকে। পরে সন্দেহ হলে গত শনিবার স্বজনরা তাঁকে সিলেট নগরের সোবহানীঘাট এলাকার পপুলার মেডিকেল সেন্টার অ্যান্ড হাসপাতালে নিয়ে যান।
সেখানে জালালাবাদ রাগীব-রাবেয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অর্থোপেডিক্স বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ডা. সাইরাস সাকিবের পরামর্শ নেওয়া হয়। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, পুরোনো এক্স-রে দেখে ওই চিকিৎসক রোগীর হাড় ভেঙে যাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তাঁর পরামর্শে রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে এবং দ্রুত অস্ত্রোপচারের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, প্রথম পর্যায়ে সঠিকভাবে হাড় ভাঙার বিষয়টি শনাক্ত করা গেলে চিকিৎসা আরও আগেই শুরু করা সম্ভব হতো। দেরিতে চিকিৎসা শুরু হওয়ায় রোগীর শারীরিক জটিলতা বেড়েছে বলেও তারা দাবি করেছে।
এদিকে শনিবার হোসনা বেগমের ছেলে ইকবাল হোসেন চিকিৎসকের বিরুদ্ধে অবহেলার অভিযোগ তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি পোস্ট দেন। পোস্টটি পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে অনেকে ঘটনার তদন্ত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
ইকবাল হোসেন বলেন, ‘আমার মা বাড়িতে পড়ে গিয়ে আহত হওয়ার পর আমরা দ্রুত তাঁকে শাহজালাল ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিয়ে যাই। সেখানে ডাক্তার হাড় ভাঙেনি বলে ওষুধ দিয়ে বাড়ি পাঠান। কিন্তু মায়ের শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে সিলেটে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাই। সেখানে এক্স-রে দেখে চিকিৎসক জানান, হাড় ভেঙে গেছে এবং জরুরি ভিত্তিতে অস্ত্রোপচার করতে হবে। শুরুতেই সঠিক তথ্য পাওয়া গেলে মায়ের অবস্থা এতটা জটিল হতো না।’
অভিযোগের বিষয়ে শাহজালাল ডায়াগনস্টিক সেন্টারে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও অভিযুক্ত চিকিৎসক ডা. সৈয়দ নাদিম আহমদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তবে শাহজালাল ডায়াগনস্টিক সেন্টারের পরিচালক ডা. মারজান আহমেদ ভুল চিকিৎসার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ‘ডাক্তার যদি ভুল করে থাকেন, তাহলে আমি নিজেই ছাড় দিতাম না। আমার মনে হয়, উভয় চিকিৎসকই তাঁদের নিজ নিজ অবস্থান থেকে সঠিক কথা বলেছেন। সম্ভবত রোগী যাতে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে না পড়েন, সেই বিবেচনায় চিকিৎসক প্রথমে ওষুধের মাধ্যমে চিকিৎসার চেষ্টা করেছেন। কারণ এ ধরনের অস্ত্রোপচারে প্রায় লাখ টাকা খরচ হতে পারে।’
জগন্নাথপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. কৃপেশ রঞ্জন রায় বলেন, ‘প্রাথমিক তথ্যে এটিকে সরাসরি পদ্ধতিগত ভুল মনে হচ্ছে না। তবে লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’
জগন্নাথপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ইসলাম উদ্দিন বলেন, ‘বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমাদের দৃষ্টিগোচর হওয়ার পর উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেছি। ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত সাপেক্ষে গুরুত্বের সঙ্গে আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
জৈন্তা বর্তা / ওয়াদুদ




