সংগৃহীত
শিক্ষা ক্যাডার নিয়োগে ৪৯তম বিশেষ বিসিএসে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় পাস করে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছিলেন গোপালগঞ্জ জেলার ১১ জন প্রার্থী। তাদের মধ্যে ৯ জন ভেরিফিকেশনে বাদ পড়েছেন। মাত্র দুজন প্রার্থীর নাম এসেছে বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) প্রকাশিত গেজেটে। তারা দুজনই গোপালগঞ্জের হলেও জন্মের পর থেকেই জেলার বাইরে থাকতেন। এ কারণে তারা গেজেটভুক্ত হতে পেরেছেন বলে জানিয়েছেন বাদপড়া প্রার্থীরা।
সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েও বাদপড়া প্রার্থীদের দাবি- তারা এবং তাদের পরিবারের কেউ রাজনীতিতে সক্রিয় নয়। কারও নামে মামলাও নেই। অনেকে জুলাই আন্দোলনেও অংশ নিয়েছেন। শুধু গোপালগঞ্জ জেলার বাসিন্দা হওয়ায় তাদের বাদ দেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তারা। পাশাপাশি এ সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করার দাবিও তুলেছেন বঞ্চিত প্রার্থীরা।
বাদপড়া প্রার্থীরা হলেন- মো. নূরনবী শেখ, আহম্মদ উল্লাহ, সোহাগ মণ্ডল, বিপ্লব বাড়ৈ, শেখ আরাফাত কবির, বুশরা জাহান ঐশী, মো. সাজ্জাদ হোসেন, শফিকুল ইসলাম ও মো. রাকিবুল ইসলাম।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নূরনবী শেখ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী এবং একই বিভাগে মেধাক্রমে পঞ্চম। আহম্মদ উল্লাহ হিসাববিজ্ঞান বিভাগের ২০১৪-১৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ও একই বিভাগে মেধাক্রমে প্রথম। একই বিভাগের ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী সোহাগ মন্ডলের মেধাক্রম তৃতীয়।
বিপ্লব বাড়ৈ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের এবং ওই বিভাগে মেধাক্রমে পঞ্চম। শেখ আরাফাত কবির ইতিহাস বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের এবং একই বিভাগে মেধাক্রমে ১৫তম। বুশরা জাহান ঐশী ইংরেজি বিভাগের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের এবং তার বিভাগে মেধাক্রমে ১৪তম।
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের সাজ্জাদ হোসেনের মেধাক্রম ৩০তম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের ২০১১-১২ শিক্ষাবর্ষের শফিকুল ইসলামের মেধাক্রম ২৫তম এবং অর্থনীতি বিভাগের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের রাকিবুল ইসলামের মেধাক্রম ৩৭তম।xz
এদিকে, ৪৯তম বিসিএসে গোপালগঞ্জ থেকে নির্বাচিত দুজনের একজন তন্ময়। তিনি তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) ক্যাডারে মেধাক্রমে ২১তম। তার বাবা বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারে কর্মরত ছিলেন। তন্ময়ের জন্মের পর তার বাবার গোপালগঞ্জে কর্মস্থল ছিল না। তন্ময় স্কুল ও কলেজজীবন ঝিনাইদহে এবং পরে রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (রুয়েট) পড়ালেখা করেছেন। তিনি গেজেটভুক্ত হয়েছেন।
গেজেটে নাম আসা অপর প্রার্থী মো. অপু খান ম্যানেজমেন্ট ক্যাডারে মেধাক্রমে ষষ্ঠ। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। পারিবারিক সূত্র বলছে, তিনিও গোপালগঞ্জ জেলায় থাকতেন না। ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে ফরিদপুরে বসবাস এবং পড়ালেখা করেছেন।
বাদপড়া নূরনবী শেখ তার ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, ‘গোপালগঞ্জের মানুষ হয়েও আওয়ামী লীগের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে জুলাই আন্দোলনে সামনের সারিতে ছিলাম। আন্দোলন-পরবর্তী সময়ে ঢাকার নিরাপত্তা রক্ষায় রাতভর পাহারা দিয়েছি। এরপরও যদি শুধু গোপালগঞ্জের মানুষ হওয়ার কারণে সরকারি চাকরিতে আমাদের অধিকার না থাকে, তাহলে সেটি প্রশ্নের বিষয়।’
মেধাতালিকায় নিজ বিভাগে প্রথম হওয়া আহম্মদ উল্লাহ জানান, ২০১৪ সাল থেকে তিনি ঢাকায় বসবাস করছেন। এর আগে ফরিদপুরের সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট সম্পন্ন করেন।চূড়ান্ত তালিকায় তার নাম না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করে আহম্মদ উল্লাহ বলেন, ‘আমাদের জেলার ৯ জন বাদ পড়েছেন। দুজনকে নেওয়া হয়েছে। ওই দুজনের বাড়ি গোপালগঞ্জে হলেও তারা দীর্ঘদিন ধরে অন্য জেলায় স্থায়ীভাবে বসবাস করতেন। আমি মনে করি, বাড়ি গোপালগঞ্জে হওয়ার কারণে ভেরিফিকেশনে বাদ দেওয়া হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমার বাবা একজন অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা। আমাদের পরিবারের কেউই কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত নন। বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সময় আমি কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম না। আমাকে কী কারণে বাদ দেওয়া হয়েছে, সেটি সরকারি কর্তৃপক্ষই বলতে পারবে। তবে আমি মনে করি, গোপালগঞ্জে বাড়ি হওয়ার কারণে আমি বৈষম্যের শিকার হয়েছি।’
বাদপড়া আরেক প্রার্থী মো. রাকিবুল ইসলাম ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, ‘আমার বাবা একজন দিনমজুর ও কাঠমিস্ত্রি। তিনি কখনোই রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন না। বাবা দিন এনে দিন খেয়ে আমাদের পড়াশোনা করিয়েছেন। আমাকে কী কারণে বাদ দেওয়া হয়েছে, সেটা সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষই বলতে পারবে। আমি যে প্রতিদান পেয়েছি, তার জন্য আলহামদুলিল্লাহ।’২০২৫ সালের ১১ নভেম্বর ৪৯তম বিসিএসের চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করা হয়। তাতে ক্যাডার পদে নিয়োগের জন্য ৬৬৮ জনকে সুপারিশ করা হয়। বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) এ বিসিএসের গেজেট প্রকাশ করেছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। সেখানে ৬১১ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বাকি ৫৭ জন বাদ পড়েছেন।
বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নিয়োগ, পদোন্নতি ও প্রেষণ অনুবিভাগের একজন উপসচিব নাম প্রকাশ না করে জাগো নিউজকে বলেন, ‘সরকারি চাকরিতে ভেরিফিকেশন একটি ধাপ। এ ধাপে সব সময়ই কিছু প্রার্থী বাদ পড়েন। কে বা কারা বাদ পড়েছে, কী কারণে তাদের বাদ দেওয়া হয়েছে, তা বলা বা প্রকাশ করা হয় না। এটি গোপনীয়। সরকারের পলিসি, নির্দেশনা মেইনটেইন করেই এ ভেরিফিকেশন কাজটা হয়। আবার যারা বাদ পড়েছেন, তাদের মধ্যে কেউ কেউ হয়তো পরবর্তীতে আবার গেজেটের মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত হতেও পারেন।’
জৈন্তাবার্তা/ সুলতানা




