নিজস্ব
সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলায় চলতি রবিমৌসুমে মিশ্র সবজির মধ্যে অন্যতম ফসল শিমের বাম্পার ফলন হয়েছে। ডিসেম্বরের শেষাংশে হারভেষ্টিং শুরু হওয়া প্রতিটি শিম বাগানে কৃষক কৃষানীরা শিম তুলতে ব্যস্ততম সময় পার করছেন।
প্রতি মৌসুমে একই মাচায় সাথি ফসল হিসেবে বরবটি, লাউ, ঝিঙা ও শিমের চাষ করে থাকেন উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নের কৃষকেরা। সেপ্টেম্বরে একই মাচায় তিনচারটি সাথি ফসল রোপনের পর অক্টোবরের শেষের দিকে বরবটি বাজারজাত হয়ে গেলে নভেম্বরে বরবটির গুড়ি কেটে দেয়া হয়। শুরু হয় শিমের পরিচর্যা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী চলতি ২০২৫-২৬ রবি মৌসুমে উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নে ৩৫০ হেক্টর জমিতে শিমের আবাদ হয়েছে। যার মধ্যে নিজপাট ইউনিয়নে ১০০ হেক্টর, জৈন্তাপুর ইউনিয়নে ৫০ হেক্টর, চারিকাঠা ইউনিয়নে ৮০ হেক্টর, দরবস্ত ইউনিয়নে ৫০ হেক্টর, ফতেহপুর ইউনিয়নে ৪০ হেক্টর ও চিকনাগোল ইউনিয়নে ৩০ হেক্টর জমিতে শিমের আবাদ হয়েছে।
কৃষি অফিস আরো জানায়, পুরো উপজেলায় ১৩৮০ জন কৃষক চলতি মৌসুমে শিমের আবাদ করেছেন। এর মধ্যে প্রদর্শনী পাওয়া কৃষকদের সংখ্যা ৪০ জন। চলতি মৌসুমে সবচেয়ে বেশী উৎপাদিত শিমের প্রজাতী হলো লালউরি। এ ছাড়াও ভিন্ন প্রজাতির মধ্যে আশ্বিনা,গোয়ালগাদ্দা ও মটরবুট জাতের শিমও চাষ হয়েছে।
সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, উপজেলার নিজপাট ও চারিকাঠা ইউনিয়নের বিস্তির্ণ জমিতে চাষ হয়েছে শিম। যেদিকে চোখ যায় শুধু সবুজ আর সবুজ। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য এলাকা গুলো হচ্ছে নিজপাট ইউনিয়নের কামরাঙিখেল,পাখিবিল,দিগারাইল,হর্ণি,বাইরাখেল,রুপচেং। এ ছাড়াও চারিকাঠা ইউনিয়নের লালাখাল, দক্ষিণ কামরাঙিখেল,বালিদারা,বাউরভাগ দক্ষিণ, বনপাড়া ও রামপ্রসাদ এলাকায় বানিজ্যিক আকারে শিমের চাষ হয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জৈন্তাপুর থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী চলতি মৌসুমে মার্চ মাস পর্যন্ত শিমের বাজারজাত চলবে। সে অনুযায়ী চলতি বছর শিম উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে আনুমানিক ৫ হাজার ২ শত ৫০ মেট্রিকটন। পাইকারি বাজার উঠানামা হিসেবে মাঠ থেকে প্রতি কেজি শিম ৩০ টাকা কেজিদরে বিক্রি করলে মৌসুম শেষে বিক্রির পরিমাণ দাঁড়ায় ১৫ কোটি ৭৫ লক্ষ টাকা সমপরিমাণ।
এ বিষয়ে দৈনিক জৈন্তাবার্তা পত্রিকার প্রতিনিধির সাথে আলাপ হয় উত্তর কামরাঙিখেল গ্রামের শিম চাষি মোঃ বাহার উদ্দিনের। তিনি বলেন, বিগত আট বছর যাবত তিনি বরবটি ও শিমের চাষ করে আসছেন। চলতি মৌসুমে তিনি ৫ বিঘা জমিতে মিশ্র সবজি হিসেবে বরবটি ও শিমের চাষ করেন। এতে তার বিঘাপ্রতি ৫০ হাজার টাকা করে মোট আড়াই লক্ষ টাকা উৎপাদন ব্যায় হয়েছে। ইতিমধ্যে ৩ লক্ষ টাকার বরবটি তিনি বিক্রি করেছেন। পাশাপাশি মৌসুমের শেষে সাড়ে ৪ থেকে ৫ লক্ষ টাকার শিম বিক্রি করতে পারবেন বলে আশাবাদী।
একই গ্রামের মিশ্র সবজি চাষি শৈলেন্দ্র প্রধান দৈনিক জৈন্তাবার্তা প্রতিবেদকের সাথে আলাপকালে বলেন,তিনি চলতি মৌসুমে ৭ বিঘা জমিতে সাড়ে তিন লক্ষ টাকা ব্যয়ে বরবটি ও শিমের আবাদ করছেন। ফলন হয়েছে আশানুরূপ। ইতিমধ্যে ৪ লক্ষ টাকার বরবটি বিক্রি করেছেন। পাশাপাশি আরো ৭ লক্ষ টাকার শিম বিক্রির আশাবাদী বলে জানান।
এদিকে একই গ্রামের সিআইজি কৃষক সমিতির সাবেক সভাপতি আব্দুস শুক্কুর বলেন, উত্তর ও দক্ষিণ কামরাঙিখেল জৈন্তাপুর উপজেলায় সর্ববৃহৎ বরবটি ও শিম আবাদের স্হান। এই দুইটি ফসলের উপর ভিত্তি করে কয়েকশ কৃষক আজ সাবলম্বী। তবে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের নিকট একটি চাওয়া সেটি হলো সেচ সুবিধা নিশ্চিত করা। ইতিমধ্যে বিএসিডির মাধ্যমে অত্র এলাকার একটি গভীর সেচ পাম্প বসানোর জন্য আবেদন করা হয়েছে। সেটা যদি বাস্তবায়ন হয় তবে রবিমৌসুমে অতিতের সকল রেকর্ড ভেঙে উল্লেখযোগ্য সবজী চাষ করতে সক্ষম হবে অত্র এলাকার কৃষকেরা।
শিম উৎপাদন ও কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও তদারকি বিষয়ে আলাপ হয় উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ -সহকারী কৃষি কর্মকর্তা শাহাব উদ্দিনের সাথে। তিনি বলেন জৈন্তাপুর উপজেলায় আমন,ইরিবোরো চাষের পাশাপাশি রবিমৌসুমে বানিজ্যিক আকারে বরবটি, শিম,টমেটো,বেগুন ও সম্প্রতি সময়ে জারালেবু,তরমুজ ও কুল বরইয়ের চাষ হচ্ছে। এর মধ্যে রপ্তানিযোগ্য তিনটি ফসল হলো জারালেবু,নাগামরিচ ও শিমের বীচি। ইতিমধ্যে গেলো মৌসুমের তুলনায় শিমের বাম্পার ফলন হয়েছে। কয়েকদিনের মধ্যে শুরু হবে ঘরে ঘরে শিমের বীচি সংগ্রহের কাজ। এই বীচিগুলো রপ্তানির জন্য প্রস্তুত করা হবে। সে লক্ষ্যে প্রতি বছর বানিজ্যিক আকারে উৎপাদন বৃদ্ধিতে মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের পরামর্শ প্রদান ও মাঠ পরিদর্শন করে আসছে কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা।
এদিকে শিমের বাম্পার ফলন ও রপ্তানিযোগ্য শিমের বীচি উৎপাদন বিষয়ে আলাপ হয় উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা হুমায়ন দিলদারের সাথে। তিনি জানান, চলতি মৌসুমে ফ্লাড রিকনস্ট্রাকশন ইমারজেন্সি এসিস্ট্যান্ট প্রজেক্ট এর আওতায় ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জৈন্তাপুর এর বাস্তবায়নে উপজেলার বরবটি ও শিম চাষিদের মধ্যে "ডাল ফসল প্রদর্শনী" দেয়া হয়েছে। তাছাড়া বানিজ্যিক আকারে উৎপাদন বৃদ্ধিতে কৃষি কর্মকর্তারা নিয়মিত মাঠ পরিদর্শন ও কৃষকদের পরামর্শ প্রদান করে আসছে। সেচ সুবিধার বিষয়ে তিনি জানান, উপজেলার শুকনো মৌসুমে বিস্তৃর্ণ জমিতে সেচের জন্য অনেক কৃষকদের দূর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। সে লক্ষ্যে সেচ সুবিধা নিশ্চিত করতে কৃষি বিভাগ পর্যায়ক্রমে বিএডিসির তত্ত্বাবধানে সেচযন্ত্র স্হাপনে যেখানে প্রয়োজন সেখানে স্হাপনের ব্যবস্হা গ্রহন করছে।
জৈন্তাবার্তা/সুলতানা




