ছবি:সংগৃহীত
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নড়াচড়া শুরু হলেও সিলেট অঞ্চলে সেই উত্তাপ চোখে পড়ছে না। শীতের হালকা আমেজে যেখানে গ্রামগঞ্জের চায়ের দোকানগুলোতে একসময় নির্বাচনী আলোচনা জমে উঠত, সেখানে এবার আলোচনার বিষয় সীমিত। মাইকিং, পোস্টার কিংবা বড় ধরনের শোডাউনÑসবকিছুই যেন অনুপস্থিত। নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে এলেও সিলেটের ছয়টি সংসদীয় আসনে প্রচারণার পরিবেশ এখনও অনেকটাই নীরব।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই নিরুত্তাপ পরিস্থিতির পেছনে রয়েছে গত এক দশকের নির্বাচনী অভিজ্ঞতা এবং সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তন। ২০১৪ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে বিএনপির অংশগ্রহণ না থাকায় ভোটের মাঠ ছিল একপেশে। অন্যদিকে, বর্তমান সময়ে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় দলটি নির্বাচনের বাইরে। ফলে ঐতিহ্যগত প্রতিদ্বন্দ্বিতার অভাবই প্রচারের গতি কমিয়ে দিয়েছে।
সিলেট অঞ্চলের ভোটাররা এখনও ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনকে সবচেয়ে জমজমাট হিসেবে স্মরণ করেন। ওয়ান-ইলেভেন পরবর্তী সেই নির্বাচনে দলীয় প্রতিযোগিতা, ভোটার উপস্থিতি এবং রাজনৈতিক উত্তেজনা ছিল চোখে পড়ার মতো। ২০১৮ সালের নির্বাচনেও তুলনামূলকভাবে কিছুটা আমেজ থাকলেও এর আগে বা পরের নির্বাচনে সেই ধারাবাহিকতা বজায় থাকেনি।
বিগত ১২টি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিলেট অঞ্চলের আসনগুলোতে আওয়ামী লীগ ৭ বার, বিএনপি ৩ বার এবং স্বতন্ত্র ও জাতীয় পার্টি একবার করে জয়ী হয়েছে। এই পরিসংখ্যান থেকেই বোঝা যায়, সিলেট ঐতিহ্যগতভাবে দ্বিদলীয় রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। তবে জুলাই অভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক সমীকরণে বড় পরিবর্তন এসেছে।
সিলেট বিভাগের ছয়টি সংসদীয় আসনÑসিলেট-১ থেকে সিলেট-৬Ñপ্রতিটিতেই রাজনৈতিক প্রস্তুতির ধরন ভিন্ন হলেও সামগ্রিকভাবে প্রচারণার তীব্রতা কম।
সিলেট-১ ও সিলেট-২: নগর ও আশপাশের এলাকা নিয়ে গঠিত এই আসনগুলোতে মাঝেমধ্যে মাইকিং শোনা গেলেও তা নিয়মিত নয়। প্রার্থীরা মূলত ঘরোয়া বৈঠক, সামাজিক যোগাযোগ এবং ব্যক্তিগত নেটওয়ার্কের মাধ্যমে যোগাযোগ রাখছেন। বড় ধরনের জনসভা বা শোভাযাত্রা চোখে পড়ছে না।
সিলেট-৩ ও সিলেট-৪: গ্রামীণ অধ্যুষিত এই আসনগুলোতে নির্বাচনী আলোচনা থাকলেও তা অনেকটাই সীমাবদ্ধ চায়ের দোকান ও ব্যক্তিগত আড্ডায়। ভোটাররা বলছেন, আগে যেভাবে প্রার্থীরা বাড়ি বাড়ি যেতেন বা বড় কর্মসূচি করতেন, এবার তার ব্যতিক্রম দেখা যাচ্ছে।
সিলেট-৫ ও সিলেট-৬: এই আসনগুলোতে ইসলামী দলগুলোর তৎপরতা তুলনামূলকভাবে বেশি। জামায়াতে ইসলামী, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, খেলাফত মজলিসসহ কয়েকটি দল প্রার্থী ঘোষণা করে মাঠ গোছাতে শুরু করেছে। তাদের পোস্টার, লিফলেট এবং ছোট আকারের সভা দেখা গেলেও সামগ্রিকভাবে তা এখনও সীমিত পর্যায়ে।
আওয়ামী লীগ ও তাদের মিত্ররা মাঠে না থাকায় রাজনৈতিক শূন্যতা কিছুটা পূরণ করার চেষ্টা করছে ইসলামী দলগুলো। তারা নিয়মিত কর্মীসভা, মতবিনিময় এবং সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ভোটারদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছে। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এককভাবে এই দলগুলোর পক্ষে নির্বাচনী মাঠে বড় উত্তাপ তৈরি করা কঠিন।
অন্যদিকে, বিএনপি দীর্ঘদিন পর তুলনামূলকভাবে খোলা মাঠ পাচ্ছে। দলটি প্রার্থী বাছাই, সাংগঠনিক পুনর্গঠন এবং কর্মী সক্রিয় করতে ব্যস্ত সময় পার করছে।
সাধারণ ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অনেকেই একটি অংশগ্রহণমূলক ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন প্রত্যাশা করছেন। গত বছরের ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর তারা আশাবাদী যে এবার নির্বাচন সুষ্ঠু হবে। তবে একই সঙ্গে তারা সতর্কও। একজন ভোটার বলেন, ‘ভোট দিতে চাই, কিন্তু সত্যিকারের প্রতিযোগিতা না থাকলে আগ্রহ আসে না।’
ভোটারদের আরেকটি বড় প্রত্যাশা হচ্ছে উন্নয়ন, কর্মসংস্থান এবং সুশাসন। দলীয় রাজনীতির বাইরে এসে তারা প্রার্থীর ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা ও অতীত কর্মকা-কে গুরুত্ব দিতে চান।
সব ঠিকঠাক থাকলে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। সময় যত ঘনিয়ে আসবে, ততই প্রচারের গতি বাড়বে বলে আশা করছেন স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা। রাজনৈতিক পরিবেশই নির্ধারণ করবে সিলেটের নির্বাচনী মাঠ কতটা জমবে। নীরব এই প্রচারের আড়ালেই লুকিয়ে আছে পরিবর্তিত রাজনীতির বাস্তব চিত্র, যা হয়তো নির্বাচনের শেষ দিকে গিয়ে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে।
জৈন্তা বার্তা/ ওয়াদুদ




