ছবি নিজস্ব
সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত গোলাপগঞ্জ চৌমুহনী পয়েন্ট বর্তমানে ভয়াবহ যানজটের কারণে জনদুর্ভোগের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এ গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে পর্যাপ্ত ট্রাফিক সদস্যের অভাব এবং কার্যকর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার ঘাটতির কারণে প্রতিদিনই সৃষ্টি হচ্ছে তীব্র যানজট। ফলে যাত্রী, পথচারী, ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী ও পরিবহন শ্রমিকদের দুর্ভোগ দিন দিন বেড়েই চলেছে।
গোলাপগঞ্জ চৌমুহনী পয়েন্ট সিলেট-জকিগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়কের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল। এই সড়ক দিয়ে প্রতিদিন কানাইঘাট, জকিগঞ্জ, বিয়ানীবাজার, বড়লেখা, ফেঞ্চুগঞ্জসহ বিভিন্ন উপজেলার হাজার হাজার যানবাহন চলাচল করে। এছাড়া স্থানীয় বাজার, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি-বেসরকারি অফিস এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করেও এ এলাকায় মানুষের ব্যাপক যাতায়াত রয়েছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই যানবাহনের চাপ তুলনামূলক বেশি থাকে। কিন্তু সেই তুলনায় ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা না থাকায় যানজট এখন নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে যানবাহনের দীর্ঘ সারি সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে অফিস-আদালত ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার সময়, ছুটির সময় এবং সাপ্তাহিক হাটবাজার কিংবা ব্যস্ত বাণিজ্যিক সময়ে পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করে। অনেক সময় কয়েকশ মিটার পর্যন্ত যানবাহনের সারি দেখা যায়। এতে যাত্রীদের মূল্যবান সময় নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি ব্যবসায়িক কার্যক্রমেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও পরিবহন সংশ্লিষ্টদের মতে, যানজট নিয়ন্ত্রণে গোলাপগঞ্জ চৌমুহনীতে প্রতিদিন অন্তত চার থেকে পাঁচজন ট্রাফিক পুলিশ সদস্যের দায়িত্ব পালন করা প্রয়োজন। অথচ বর্তমানে অধিকাংশ সময় মাত্র একজন বা দুইজন সদস্যকে দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায়। ফলে বিপুলসংখ্যক যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করা তাদের পক্ষে প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। কয়েক মাস আগেও এই পয়েন্টে নিয়মিত চার থেকে পাঁচজন ট্রাফিক সদস্য দায়িত্ব পালন করতেন। তখন যানবাহন চলাচলে তুলনামূলক শৃঙ্খলা ছিল এবং যানজটও নিয়ন্ত্রণে থাকত। কিন্তু বর্তমানে জনবল সংকটের কারণে পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পিআইএমএস এর তথ্য অনুযায়ী গোলাপগঞ্জে কর্মরত কয়েকজন ট্রাফিক পুলিশ সদস্যকে নিয়মিতভাবে সিলেট জেলার বিভিন্ন উপজেলা ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় ডিউটির জন্য পাঠানো হচ্ছে। ফলে গোলাপগঞ্জ চৌমুহনীর মতো গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে পর্যাপ্ত জনবল নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। দায়িত্বরত সদস্যদেরও সীমিত জনবল নিয়ে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
স্থানীয় পরিবহন চালকরা জানান, যানজটের কারণে নির্ধারিত সময়ে গন্তব্যে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক সময় মাত্র কয়েক মিনিটের পথ অতিক্রম করতে আধা ঘণ্টা বা তারও বেশি সময় লেগে যায়। এতে যেমন জ্বালানি খরচ বাড়ছে, তেমনি যাত্রীদের ক্ষোভও বাড়ছে। বিশেষ করে অ্যাম্বুলেন্স বা জরুরি সেবার যানবাহন যানজটে আটকে পড়লে রোগীদের দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়।
নিরাপদ সড়ক চাই, গোলাপগঞ্জ উপজেলা শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক মো. শাহ আলম বলেন, গোলাপগঞ্জ চৌমুহনী শুধু উপজেলার নয়, পুরো অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ কেন্দ্র। অথচ এখানে দীর্ঘমেয়াদি কোনো ট্রাফিক পরিকল্পনা কিংবা আধুনিক ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ চোখে পড়ে না। অবৈধ পার্কিং, যত্রতত্র সিএনজি ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা দাঁড় করানো, ফুটপাত দখল এবং অপরিকল্পিত যান চলাচলও যানজট বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।
এ বিষয়ে সিলেট জেলা ট্রাফিক বিভাগের টিআই (অ্যাডমিন) শাহাব উদ্দিনের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, গোলাপগঞ্জে যাদের ডিউটি রয়েছে, তাদের গোলাপগঞ্জেই দায়িত্ব পালনের কথা। বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া অন্য কোথাও ডিউটি করার কথা নয়। বিষয়টি আমি গুরুত্বসহকারে দেখব।
অন্যদিকে গোলাপগঞ্জের ট্রাফিক সদস্যদের অন্যত্র ডিউটিতে পাঠানোর বিষয়ে সিলেট জেলা ট্রাফিক বিভাগের মুন্সি মাহবুবুল আলমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “আমি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করি। এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য টিআই (অ্যাডমিন) স্যারের কাছ থেকে জানা যাবে।”
তবে ট্রাফিক বিভাগের দুই কর্মকর্তার বক্তব্যে স্পষ্ট অসঙ্গতি লক্ষ্য করা গেছে। একদিকে টিআই (অ্যাডমিন) বলছেন গোলাপগঞ্জের সদস্যদের অন্যত্র ডিউটি করার কথা নয়, অন্যদিকে মুন্সি মাহবুবুল আলম ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনার বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। ফলে প্রকৃত পরিস্থিতি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
সচেতন মহলের দাবি, গোলাপগঞ্জ চৌমুহনীতে পূর্বের মতো পর্যাপ্ত সংখ্যক ট্রাফিক পুলিশ সদস্য মোতায়েনের পাশাপাশি সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে আধুনিক ও কার্যকর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা চালু করা জরুরি। একই সঙ্গে অবৈধ পার্কিং নিয়ন্ত্রণ, নির্দিষ্ট স্টপেজ ব্যবস্থা, ফুটপাত দখলমুক্ত রাখা এবং নিয়মিত তদারকির মাধ্যমে যানজট অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব বলে মনে করছেন তারা।
স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রত্যাশা, জনস্বার্থের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। অন্যথায় দিন দিন যানবাহনের সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে গোলাপগঞ্জ চৌমুহনীর যানজট পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। তাই এলাকার মানুষ দ্রুত ও স্থায়ী সমাধানের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
জৈন্তাবার্তা/আরআর




