সুরমার গ্রাসে জকিগঞ্জের ৪ গ্রাম, বিলীনের মুখে শতবর্ষী বিদ্যালয়
মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই ২০২৬, ০২:২৩ PM

সুরমার গ্রাসে জকিগঞ্জের ৪ গ্রাম, বিলীনের মুখে শতবর্ষী বিদ্যালয়

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ০৭/০৭/২০২৬ ০১:০০:২২ PM

সুরমার গ্রাসে জকিগঞ্জের ৪ গ্রাম, বিলীনের মুখে শতবর্ষী বিদ্যালয়


টানা বর্ষণ আর উজান থেকে ধেয়ে আসা পাহাড়ি ঢলে সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলার মানিকপুর ইউনিয়নে সুরমা নদীর ভাঙন এবার ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নদীর তীব্র স্রোত গিলে খাচ্ছে নতুন নতুন জনপদ। প্রতিদিন নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে ফসলি জমি, গাছপালা আর মানুষের শেষ সম্বল বসতভিটা।

এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে ১৯০৫ সালে প্রতিষ্ঠিত শতবর্ষী 'সুরানন্দপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়' নিয়ে। দ্রæত কোনো কার্যকর উদ্যোগ না নিলে এক শতাব্দীরও বেশি পুরোনো এই বিদ্যাপীঠটি যেকোনো সময় নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

নদীপাড়ে নির্ঘুম রাত, অস্তিত্ব সংকটে ৪ গ্রাম: স্থানীয় সূত্র জানায়, সুরমার প্রবল স্রোতে নদীতীরের মাটি অনবরত ধসে পড়ছে। দুধরচক, শিবেরচক, হরাইচক ও সুরানন্দপুরসহ আশপাশের গ্রামগুলোতে নদীভাঙন এখন এক নিয়মিত আতঙ্কের নাম। নদী যেভাবে প্রতিনিয়ত লোকালয়ের দিকে ধেয়ে আসছে, তাতে ভিটেমাটি হারানোর শঙ্কায় অনেক পরিবার এখন রাত জেগে পাহারা দিচ্ছে।

ইতোমধ্যে বিস্তীর্ণ ফসলি জমি ও অসংখ্য গাছপালা নদীগর্ভে তলিয়ে গেছে। ভাঙনের মুখে পড়েছে ৫ থেকে ৭টি গ্রামের সড়ক যোগাযোগ, ধর্মীয় উপাসনালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, নতুন করে ঘরবাড়ি সরিয়ে নেওয়ার মতো নিরাপদ কোনো জায়গাও আর অবশিষ্ট নেই।

হুমকির মুখে শতাধিক শিশুর ভবিষ্যৎ ও ঐতিহ্য: এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে এই অঞ্চলে শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছে সুরানন্দপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। বর্তমানে দুধরচক, শিবেরচক, হরাইচক ও সুরানন্দপুর গ্রামের শতাধিক শিক্ষার্থী এখানে পড়াশোনা করছে। স্থানীয়দের মতে, এই বিদ্যালয়টি কেবল একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, এটি এই অঞ্চলের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। এটি নদীগর্ভে হারিয়ে গেলে শতাধিক শিক্ষার্থীর শিক্ষা জীবন যেমন অন্ধকারে নিমজ্জিত হবে, তেমনি হারিয়ে যাবে শত বছরের এক গৌরবময় ঐতিহ্য।

ভুক্তভোগীদের আকুতি: ‘ত্রাণ চাই না, স্থায়ী বাঁধ চাই’: নদীভাঙনের শিকার মানিকপুর ইউনিয়নের সাবেক সদস্য মাশুক আহমদ এবং স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল জলিল, মাহতাব উদ্দিন, কালাম উদ্দিন, আপ্তাব উদ্দিন, তাজেল আহমেদ ও অলিউর রহমান তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, গত কয়েক বছরে তারা অন্তত তিনবার সর্বনাশা ভাঙনের শিকার হয়েছেন। প্রতিবারই ঘরবাড়ি ও আবাদি জমি হারিয়েছেন। এবার তাদের শেষ আশ্রয় এবং এলাকার বিদ্যালয়টিও ঝুঁকির মুখে।

বিদ্যালয়ের সাবেক সভাপতি মো. সুহেল আহমেদ বলেন, “দ্রুত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে এই ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ রক্ষা করা কঠিন হবে।”

এলাকাবাসীর অভিযোগ, দীর্ঘদিনের এই দুর্যোগ সত্তে¡ও স্থায়ী প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণে কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। মাঝেমধ্যে সরকারি কর্মকর্তারা এসে এলাকা পরিদর্শন করলেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি।

একই সুর শোনা গেল এলাকার বাসিন্দা ও প্রাইম ব্যাংকের সিনিয়র এভিপি আব্দুল মুমিতের কণ্ঠেও। তিনি বলেন, “গুরুত্বপূর্ণ এই স্থাপনাগুলো রক্ষায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, উপজেলা প্রশাসন, পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জরুরি ও কার্যকর হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।” বিপন্ন এই জনপদের মানুষের এখন একটাই দাবি- তারা সাময়িক কোনো ত্রাণ চান না, তারা চান সুরমা নদীর ভাঙন রোধে একটি স্থায়ী প্রতিরক্ষা বাঁধ এবং কার্যকর নদীশাসন প্রকল্প।

ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস প্রশাসনের: জকিগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সুজিত কুমার চন্দ অবশ্য আশ্বস্ত করে জানিয়েছেন, নদীভাঙনের বিষয়টি উপজেলা প্রশাসনের নজরে রয়েছে। তিনি বলেন, “ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করে দ্রুত প্রয়োজনীয় তথ্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হবে। একই সঙ্গে ভাঙন রোধে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থার সঙ্গে প্রয়োজনীয় সমন্বয় করা হবে।”

জনসাধারণের জানমাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রক্ষায় উপজেলা প্রশাসন সচেষ্ট রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

জৈন্তাবার্তা/আরআর