গাছে উঠে প্রা/ণ বাঁচা/ল ৮ বছরের জোয়াল, তিন দিন পর মায়ের কোলে
শনিবার, ২৯ অগাস্ট ২০২৬, ০৬:৫৭ PM

গাছে উঠে প্রা/ণ বাঁচা/ল ৮ বছরের জোয়াল, তিন দিন পর মায়ের কোলে

জৈন্তা বার্তা ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৯/০৮/২০২৬ ০৫:৫৭:১৪ PM

গাছে উঠে প্রা/ণ বাঁচা/ল ৮ বছরের জোয়াল, তিন দিন পর মায়ের কোলে

ছবি:সংগৃহীত


নেপালের পাহাড়ি নদীতে যখন ভয়াবহ ঢল নেমে একের পর এক জনপদ তছনছ হয়ে যাচ্ছিল, তখন প্রাণ বাঁচাতে জঙ্গলে ছুটে গিয়েছিল আট বছরের শিশু জোয়াল ঘালে। স্কুল থেকে বেরিয়ে পাহাড়ি জঙ্গলে গিয়ে একটি গাছে উঠে বসেছিল সে। সেই বুদ্ধিতেই ভয়াবহ বন্যার হাত থেকে প্রাণে বেঁচে যায় জোয়াল।

গত বুধবার নেপাল-তিব্বত সীমান্তে হিমবাহধসের পর ভোটেকোশি ও ত্রিশূলী নদী দিয়ে প্রবল বেগে কাদাপানি, পাথর ও ধ্বংসাবশেষ নেমে আসে। এতে ব্যাপক প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি হয়। এখন পর্যন্ত ৬২৩ জনের মরদেহ উদ্ধারের কথা জানা গেছে। নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৯২৪ জনে। তাঁদের মধ্যে অন্তত ৫৪০ জন বিদেশি।

পরদিন বৃহস্পতিবার দুর্যোগকবলিত নেপালের উত্তরাঞ্চলীয় রাসুয়া জেলা থেকে জোয়ালকে জীবিত উদ্ধার করা হয়। তার একটি পা ভেঙে গেছে। মুখেও রয়েছে আঘাতের চিহ্ন। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য হেলিকপ্টারে তাকে রাজধানী কাঠমান্ডুর একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়। বর্তমানে সেখানেই চিকিৎসাধীন রয়েছে শিশুটি।

এদিকে দুই ছেলের নিখোঁজ হওয়ার খবরে মাট্টি মায়া তামাংয়ের (২৮) জীবনে নেমে এসেছিল গভীর অন্ধকার। আকস্মিক ঢলের সময় তাঁর দুই ছেলে স্কুলে ছিল। সন্তানদের বেঁচে থাকার আশা প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলেন তিনি। এক আশ্রয়কেন্দ্র থেকে অন্য আশ্রয়কেন্দ্রে ছুটেছেন, খোঁজ নিয়েছেন উদ্ধার ও ত্রাণকেন্দ্রগুলোতেও। কিন্তু কোথাও পাননি সন্তানদের সন্ধান।

অবশেষে তিন দিন পর জীবিত জোয়ালের সন্ধান পান তিনি।

মাট্টি মায়া তামাং বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, সন্তানদের খুঁজতে তিনি একের পর এক চারটি জায়গায় গিয়েছেন। কোথাও তাঁদের নামের তালিকা পাননি। একপর্যায়ে তিনি ধরে নিয়েছিলেন, তাঁর দুই সন্তানই হয়তো মারা গেছে।

বৃহস্পতিবার দুই সন্তানের খোঁজে যখন মরিয়া হয়ে ছুটছিলেন মাট্টি মায়া, তখন একপর্যায়ে তিনি রয়টার্সের সাংবাদিক শাহানা বজ্রাচার্যের ফোন নম্বর পান। ছেলেদের বিষয়ে কোনো তথ্য পাওয়া যায় কি না, সেই আশায় তিনি সাংবাদিককে ফোন করেন।

এর কয়েক ঘণ্টা আগে নুয়াকোটের একটি হাসপাতালে জোয়ালের সঙ্গে দেখা হয়েছিল শাহানার। একটি শিশুকে জীবিত উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে-এমন খবর পেয়ে তিনি ও রয়টার্সের একটি দল সেখানে যান। তখন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও জানত না শিশুটির পরিবার কোথায় কিংবা পরিবারের কেউ আদৌ বেঁচে আছেন কি না।

এরই মধ্যে উন্নত চিকিৎসার জন্য জোয়ালকে হেলিকপ্টারে কাঠমান্ডু নেওয়ার প্রস্তুতি চলছিল। পরিবারের সন্ধান পাওয়ার আশায় শাহানা শিশুটির একটি ভিডিও ধারণ করেন। পরে হাসপাতালে নিজের ফোন নম্বর রেখে আসেন তিনি।

কয়েক ঘণ্টা পরই সেই ফোনে কল আসে। অপর প্রান্তে ছিলেন জোয়ালের মা মাট্টি মায়া তামাং।

শাহানা যখন জানান, জোয়াল জীবিত আছে এবং তাকে চিকিৎসার জন্য কাঠমান্ডুতে নেওয়া হয়েছে, তখনও কথাটি বিশ্বাস করতে পারছিলেন না মাট্টি মায়া। তিনি ভেবেছিলেন, আর কখনো হয়তো ছেলেকে খুঁজে পাবেন না।

নুয়াকোটের ১৫ শয্যার একটি হাসপাতালে জোয়ালের সঙ্গে দেখা হওয়ার সময় তার ডান পা ভাঙা ছিল। মুখে ছিল আঁচড় ও আঘাতের চিহ্ন। তখনো তার বাঁ হাতে শক্ত করে ধরা ছিল ১০ রুপির দুটি নোট।

উদ্ধারকারী পুলিশ সদস্যরা হাসপাতালে যেতে রাজি করানোর সময় শিশুটিকে ওই টাকা দিয়েছিলেন বলে কর্মকর্তারা জানান।

শাহানার সঙ্গে কথোপকথনে জোয়াল জানায়, ঢল নামার সময় সে স্কুলে পড়ছিল। হঠাৎ চারপাশ অন্ধকার হয়ে যায়। এরপর এক বন্ধুর সঙ্গে স্কুল থেকে দৌড়ে পাহাড়ি জঙ্গলের দিকে চলে যায় সে। পানি থেকে বাঁচতে একটি গাছে উঠে বসে।

শাহানা তাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘ভয় পেয়েছিলে?’ জোয়াল মাথা নেড়ে জানায়, ‘না’।

দুর্যোগের দিন সকালে অন্য দিনের মতো দুই ছেলে গাড়িতে করে স্কুলে গিয়েছিল। বাড়িতে ছিলেন তাঁদের মা। হঠাৎ ভূমিকম্পের মতো বিকট শব্দ শুনতে পান তিনি। বাইরে তাকিয়ে দেখেন, প্রবল স্রোতে সবকিছু ভেসে যাচ্ছে।

ছেলেদের স্কুলের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করলেও পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ ছিল যে এগোনো সম্ভব হয়নি। স্বাভাবিক সময়ে বাড়ি থেকে স্কুলে যেতে ১৫ থেকে ২০ মিনিট লাগলেও বন্যার পর পুরো এলাকার চেহারা বদলে যায়।

মাট্টি মায়ার ভাষায়, কোথায় স্কুল ছিল, কোথায় বাজার ছিল-কিছুই বোঝার উপায় ছিল না। চারদিকে শুধু পানি, পাথর আর কাদা।

শেষ পর্যন্ত সেই স্কুল ভবনটিও বন্যার স্রোতে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।

জাতিসংঘ শিশু তহবিল (ইউনিসেফ) জানিয়েছে, কাঠমান্ডুর উত্তরে রাসুয়া, নুয়াকোট ও ধাদিং জেলায় পাহাড়ি ঢলে অন্তত ১৭ হাজার শিশু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া শিশুদের শনাক্ত ও নিবন্ধনের কাজ করছে সংস্থাটি।

নেপাল সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে এসব শিশুকে তাদের পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে।

দুর্যোগের পর যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকায় জোয়ালের পরিবারের সদস্যদের কাঠমান্ডুতে পৌঁছানোও সহজ ছিল না। সাংবাদিক শাহানা তাঁদের জন্য একটি গাড়ির ব্যবস্থা করেন। প্রায় দুই ঘণ্টার পথ পাড়ি দিয়ে কাঠমান্ডুর হাসপাতালে পৌঁছান তাঁরা।

হাসপাতালে ছেলের শয্যার পাশে গিয়ে নীরবে দাঁড়ান মাট্টি মায়া। দীর্ঘ তিন দিনের উৎকণ্ঠার পর জীবিত ছেলেকে ফিরে পেয়ে যেন নতুন করে জীবন ফিরে পান তিনি।

জোয়ালের বাবা জাপানে নির্মাণশ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। ছেলের দুর্ঘটনার খবর পেয়ে তিনিও দেশে ফেরার পথে রয়েছেন।

ভয়াবহ এই দুর্যোগে রাসুয়ার বহু পরিবারের জীবন ওলটপালট হয়ে গেলেও জোয়ালকে জীবিত ফিরে পাওয়া মাট্টি মায়ার জন্য বড় স্বস্তি। 

জৈন্তা বার্তা/ ওয়াদুদ