ধ্বং/সের দ্বারপ্রান্তে শতবর্ষী ঐতিহ্য জলসুখার গিরিষ বাবুর বাড়ি
রবিবার, ৩০ অগাস্ট ২০২৬, ০২:২৭ AM

ধ্বং/সের দ্বারপ্রান্তে শতবর্ষী ঐতিহ্য জলসুখার গিরিষ বাবুর বাড়ি

আশিকুর রহমান, আজমিরীগঞ্জ প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ৩০/০৮/২০২৬ ০১:৩১:০০ AM

ধ্বং/সের দ্বারপ্রান্তে শতবর্ষী ঐতিহ্য জলসুখার গিরিষ বাবুর বাড়ি

ছবি: জৈন্তা বার্তা


সময়ের স্রোতে বদলে গেছে জনপদ, হারিয়ে গেছে জমিদারি আমলের অনেক স্মৃতি। কোথাও ভেঙে পড়েছে পুরোনো স্থাপনা, কোথাও মুছে গেছে ইতিহাসের চিহ্ন। এর মাঝেই হবিগঞ্জের আজমিরীগঞ্জ উপজেলার জলসুখা গ্রামে এখনও নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে শতবর্ষী 'গিরিষ বাবুর বাড়ি'। জীর্ণ-শীর্ণ এই ভবনটি আজ শুধু একটি পুরোনো স্থাপনা নয়, বরং একটি জনপদের অতীত ঐতিহ্য ও আভিজাত্যের আরক। এটি সংস্কার না হলে আগামী প্রজন্ম জানতেও পারবে না তাদের অঞ্চলের সমৃদ্ধ অতীতের কথা।

কুশিয়ারা নদীর উপশাখা কুশিয়ারা কুদালিয়া নদীর তীরে অবস্থিত জলসুখা গ্রাম। হাওর-নদী-নালাবেষ্টিত এই গ্রামের প্রাকৃতিক রূপময় সৌন্দর্য অপূর্ব। পূর্ব থেকেই নদী বেষ্টিত এই ছোট গ্রাম ঐতিহ্যবাহী। এই গ্রামের জমিদার বাড়ি ও জমিদারদের নিয়ে বাংলাদেশের স্বনামধন্য লেখক হুমায়ুন আহমেদ 'ঘেটুপুত্র কমলা' চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। গ্রামে ছিল ১৩ জন জমিদারের বসবাস। তাদের মধ্যে ১২ জন জমিদার ছিলেন সনাতন ধর্মাবলম্বী এবং বাকি একজন মুসলিম। ১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ দ্বিখন্ডিত হওয়ার পর অধিকাংশ জমিদারই চলে যান ভারতে। তাদের উত্তরসূরিদের অনেকে ভারতে এবং কেউ কেউ বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে বাস করছেন।

জলসুখা গ্রামের প্রবীণদের কাছ থেকে জানা যায়, সংরক্ষিত তালিকা অনুযায়ী জমিদাররা হলেন- চন্দ্র কুমার রায়, কৃষ্ণ কুমার রায়, সূর্যমনি রায়, বৈকুণ্ঠ নাথ রায়, শরৎ চন্দ্র রায়, ভারত চন্দ্র রায়, নন্দলাল রায়, গোবিন চন্দ্র রায়, সতীশ কুমার রায়, লক্ষ্ণীকান্ত রায়, ক্ষেত্রনাথ রায়, মাধব চন্দ্র রায়, রমা বল্লভ হালদার ও রমজান আলী চৌধুরী ওরফে বুছা মিয়া চৌধুরী। তারা একেকজন ছিলেন একেক তাল্লুক বা চৌহদ্দির খাজনা আদায়ের দায়িত্বে। আরও জানা যায়, অধিকাংশ জমিদারই ছিলেন শিক্ষানুরাগী। তাদের মধ্যে জমিদার চন্দ্র কুমার রায় ১৮৭৬ সালে ‘কৃষ্ণ গোবিন্দ উচ্চবিদ্যালয়’ নামে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যার সুনাম এখনও রয়েছে।

এর মধ্যে কালের আবর্তে জলসুখায় ঐতিহাসিক গিরিষ বাবুর বাড়ির অনেক কিছুই বিলীন হয়ে গেছে। কিছু নিদর্শন নীরবে দাঁড়িয়ে থেকে জানান দিচ্ছে অতীত সমৃদ্ধি আর আভিজাত্যের কথা। এক ইতিহাসঘেরা স্মৃতির সাক্ষী হয়ে জলসুখা গ্রামে আজও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে শতবর্ষী গিরিষ বাবুর বাড়ি। সুরম্য কারুকার্য, সুউচ্চ গম্বুজ আর লাল ইটের সেই জাঁকজমক আজ আর নেই। তবে জীর্ণ দেওয়ালের নোনা ধরা প্লাস্টার আর প্রাচীন কাঠামোর প্রতিটা ভাঁজে যেন আজও জমে আছে এক হারিয়ে যাওয়া সোনালি সময়ের গল্প।

স্থানীয় প্রবীণদের মুখে জানা যায়, তৎকালীন জমিদারি আমল ও ব্রিটিশ শাসনের সমসাময়িককালে জলসুখার তৎকালীন ধনাঢ্য ও প্রভাবশালী ব্যক্তি গিরিষ চন্দ্রের উদ্যোগে এই বিশাল ভবনটি নির্মিত হয়। ভবনটির নির্মাণশৈলীতে তৎকালীন ঔপনিবেশিক এবং স্থানীয় স্থাপত্যরীতির এক অপূর্ব মেলবন্ধন দেখা যায়। বিশাল উঠান, চুন-সুরকির মজবুত গাঁথুনি, উঁচু ছাদ এবং নান্দনিক তোরণ প্রমাণ করে সেই সময়ের রুচিশীলতা ও অভিজাত জীবনযাত্রার কথা। একসময় এই বাড়িতে বসত জমজমাট আসর। পূজা-পার্বণ, যাত্রাপালা আর বিচার-শালিসে দিন-রাত মুখরিত থাকত গিরিষ বাবুর আঙিনা। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসত এই প্রাসাদতুল্য বাড়িটি এক নজর দেখতে।

সময়ের নিমর্ম কষাঘাতে সেই প্রাণচাঞ্চল্য আজ ইতিহাস। যতেœর অভাব, জলবায়ুর প্রভাব এবং তদারকির অভাবে বাড়িটি এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। ভবনের অনেক জায়গায় ফাটল ধরেছে, ছাদ থেকে খসে পড়ছে প্লাস্টার। ঘরের ভেতরের মূল্যবান কাঠের কাজ এবং কারুকার্যময় দরজা-জানালা ইতিমধ্যেই নষ্ট হয়ে গেছে। তবুও এই ধ্বংসাবশেষ দেখতে মাঝে মাঝেই ছুটে আসেন স্থানীয় তরুণ ও ইতিহাসপ্রেমী মানুষ। দেওয়ালের গায়ে হাত রাখলেই যেন পাওয়া যায় অতীত জীবনের স্পন্দন।

জলসুখা গ্রামের সাধারণ মানুষ ও স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, গিরিষ বাবুর বাড়িটি কেবল একটি পুরোনো দালান নয়, এটি আজমিরীগঞ্জের স্থানীয় ইতিহাস ও ঐতিহ্যের এক অমূল্য অংশ। এলাকার এই ঐতিহাসিক নিদর্শনটি যদি দ্রুত সংস্কার বা সংরক্ষণ করা না হয়, তবে অচিরেই এটি মাটির সাথে মিশে যাবে। আগামী প্রজন্ম জানতেও পারবে না তাদের অঞ্চলের সমৃদ্ধ অতীতের কথা।

জলসুখার গিরিষ বাবুর বাড়িটি এখন ইতিহাসের এক বিষাদময় অধ্যায়হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সরকারি বা প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তরের নজরদারি এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার কার্যক্রমই হতে পারে হারিয়ে যাওয়া এই ঐতিহ্যকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করতে।


জৈন্তা বার্তা/ ওয়াদুদ



শীর্ষ সংবাদ:

বিয়ানীবাজারে সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আবুল কাশেম পল্লব গ্রে/প্তার
ধ্বং/সের দ্বারপ্রান্তে শতবর্ষী ঐতিহ্য জলসুখার গিরিষ বাবুর বাড়ি
২২৯ শিক্ষার্থীর জন্য ২ জন শিক্ষক, ব্যা/হত পাঠদান
পাঁচ লাখ টাকা দিয়েও বন্ধ হয়নি নি/র্যাত/ন, মুন্নীকে হ/ত্যার অভি/যোগ
আম্বরখানায় পার্কিং দ/খল করে দোকান, সিসিকের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
বাহুবলে প্র'তিপক্ষের হা'মলায় খামারি নি'হত
সিলেটে ২৯ লক্ষ টাকার চো'রাই পণ্য জ'ব্দ
উ/দ্বেগ-উ/ত্তেজনা পেরিয়ে সোনাই নদীতে চিরায়ত বাংলার ঐতিহ্যের আয়োজন
সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যের মাধ্যমে আমরা একটি উন্নত সমাজ গড়তে পারি: সিসিক প্রশাসক
সিলেটে বাস-সিএনজি ও মোটরসাইকেলের ত্রিমুখী সংঘর্ষ,