ছবি:সংগৃহীত
আজ শুভ মহালয়া। পিতৃপক্ষের অবসান ঘটিয়ে শুরু হচ্ছে দেবীপক্ষ। শারদীয় দুর্গোৎসবের আগমনী বার্তা নিয়ে আজ শনিবার (১০ অক্টোবর) উদ্যাপিত হচ্ছে মহালয়া। চণ্ডীপাঠ, পূজা ও নানা ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে দেবী দুর্গাকে মর্ত্যলোকে আবাহন করবেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। মহালয়াকে ঘিরে সিলেটেও রয়েছে নানা আয়োজন।
শরতের নীল আকাশ, শিউলির সুবাস আর কাশফুলের দোলায় প্রকৃতিতে জানান দিচ্ছে দুর্গাপূজার আগমনী বার্তা। বছর ঘুরে আবারও কৈলাস ছেড়ে স্বামী শিবের সঙ্গে মর্ত্যে আসছেন দেবী দুর্গা। সঙ্গে থাকবেন তাঁর চার সন্তান—গণেশ, কার্তিক, লক্ষ্মী ও সরস্বতী।
হিন্দুধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, মহালয়া দেবীপক্ষের সূচনালগ্ন। এদিন চণ্ডীপাঠের মাধ্যমে দেবী দুর্গাকে আবাহন করা হয়। একই সঙ্গে প্রয়াত আত্মীয়স্বজন ও পূর্বপুরুষদের আত্মার শান্তি কামনায় প্রার্থনা করেন অনেকে। মহালয়ার মধ্য দিয়ে শুরু হয় দুর্গোৎসবের প্রতীক্ষার ক্ষণগণনা।
পুরাণ অনুসারে, রাজা সুরথ প্রথম দেবী দুর্গার আরাধনা করেন। বসন্তকালে এই পূজার আয়োজন করা হয়েছিল বলে তা বাসন্তী পূজা নামে পরিচিত। অন্যদিকে, রাবণের হাত থেকে সীতাকে উদ্ধারের আগে ভগবান শ্রীরামচন্দ্র শরৎকালে দেবী দুর্গার পূজা করেছিলেন বলে এই পূজা অকালবোধন নামেও পরিচিত।
মহালয়ার ভোরে মন্দিরে মন্দিরে শঙ্খধ্বনি ও চণ্ডীপাঠের মধ্য দিয়ে দেবীর আগমনী আরাধনা করা হয়। ‘যা দেবী সর্বভূতেষু মাতৃরূপেণ সংস্থিতা’ মন্ত্রোচ্চারণে মুখর হয়ে ওঠে পূজামণ্ডপ। ষষ্ঠীপূজার মধ্য দিয়ে দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হলেও মহালয়া থেকেই ভক্তদের মনে বেজে ওঠে দেবীর আগমনী সুর।
সিলেটে তিন দিনব্যাপী মহালয়া উদ্যাপন
মহালয়া উপলক্ষে ‘মহালয়া উদ্যাপন পরিষদ শ্রীহট্ট’-এর উদ্যোগে সিলেট নগরের মিরাবাজারের শ্রীশ্রী বলরাম জিউর আখড়ায় তিন দিনব্যাপী অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করা হয়েছে। গত ৮ অক্টোবর শুরু হওয়া এ আয়োজনের মধ্য দিয়ে পরিষদটির ৩৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীও উদ্যাপন করা হচ্ছে।
আজ শনিবার সকাল সাড়ে আটটায় পরিষদের সহসম্পাদক বিশ্বজিৎ চক্রবর্তী সুমনের পরিচালনায় শ্রীশ্রী চণ্ডী মায়ের পূজা অনুষ্ঠিত হবে। একই সময়ে শ্রীমা সারদা সংঘ সিলেটের সম্পাদিকা বর্ণালী পুরকায়স্থের পরিচালনায় হবে সমবেত চণ্ডীপাঠ।
সকাল ১০টায় নৃত্য প্রতিযোগিতা উপকমিটির আহ্বায়ক মৃণাল কান্তি চৌধুরী মঞ্জুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে সিলেটে নিযুক্ত সহকারী ভারতীয় হাইকমিশনার অনিরুদ্ধ দাসের। দুপুর দুইটায় শ্রীমা সারদা সংঘ সিলেটের সাংস্কৃতিক সম্পাদক হেপী দেবের পরিচালনায় প্রশিক্ষণার্থী শিশু-কিশোরদের অংশগ্রহণে ধর্মীয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হবে।
সন্ধ্যা ছয়টায় পরিষদের সভাপতি জি. ডি. রুমুর সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক দীপক কুমার দাশের সঞ্চালনায় ধর্মসভা, পুরস্কার বিতরণী ও ‘অরুণ আলোর অঞ্জলি’ গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠিত হবে। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী এমপির।
অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথি ও মুখ্য আলোচক হিসেবে উপস্থিত থাকবেন সিলেট রামকৃষ্ণ মিশন আশ্রমের সম্পাদক শ্রীমৎ স্বামী চন্দ্রনাথানন্দজী মহারাজ। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে সমাজসেবী জ্যোতির্ময় সিংহ মজুমদার চন্দন, সিলেট আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট অশোক পুরকায়স্থ, বাংলাদেশ পূজা উদ্যাপন পরিষদ সিলেট জেলা শাখার সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা গোপিকা শ্যাম পুরকায়স্থ চয়ন, সহসভাপতি অধ্যাপক রজত কান্তি ভট্টাচার্য, সাধারণ সম্পাদক চন্দন দাশ এবং পরিষদের প্রধান সমন্বয়ক অবসরপ্রাপ্ত উপাধ্যক্ষ কৃষ্ণপদ সূত্রধরের।
রাত আটটায় দরিদ্র ও অসহায় মানুষের মধ্যে বস্ত্র বিতরণ করা হবে। এ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে সিলেট মহানগর বিএনপির সভাপতি মো. নাসিম হোসাইনের। বিশেষ অতিথি থাকবেন বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ সিলেট মহানগর শাখার সাধারণ সম্পাদক প্রদীপ কুমার দেব, সিলেট জেলা আইনজীবী সমিতির জ্যেষ্ঠ আইনজীবী প্রশান্ত কুমার পাল এবং শ্রীশ্রী বলরাম জিউর আখড়া পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক তপন চৌধুরী টুটুল।
পরিষদের সভাপতি জি. ডি. রুমু ও সাধারণ সম্পাদক দীপক কুমার দাশ সব পুণ্যার্থীকে অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে আয়োজন সফল করার আহ্বান জানিয়েছেন।
সিলেটে ৬৩৬ মণ্ডপে দুর্গাপূজা
বাংলাদেশ পূজা উদ্যাপন পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটি এবং সিলেট জেলা ও মহানগর শাখার বার্ষিক প্রতিনিধি সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, দুর্গাপূজা শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে ১৮টি নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া সিলেট জেলা ও মহানগর শাখার যৌথ উদ্যোগে ১১ সদস্যের একটি মনিটরিং সেল গঠন করা হয়েছে। পূজামণ্ডপের সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে এই সেলের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতে পূজা কমিটিগুলোর প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।
পূজা উদ্যাপন পরিষদের সিলেট জেলা ও মহানগর শাখা সূত্রে জানা গেছে, এ বছর সিলেট মহানগর এলাকায় সর্বজনীন ১৪৬টি এবং পারিবারিক ১৬টিসহ মোট ১৬২টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে। অন্যদিকে, সিলেট জেলায় সর্বজনীন ও পারিবারিক পূজার মোট সংখ্যা ৫০০টি বলে দেওয়া তথ্য থেকে জানা যায়। তবে এ সংখ্যা ও উপজেলাভিত্তিক হিসাবের মধ্যে অসংগতি রয়েছে।
উপজেলাভিত্তিক হিসাবে গোলাপগঞ্জে সর্বজনীন ৫৮টি ও পারিবারিক ৫টি, বালাগঞ্জে সর্বজনীন ৩০টি ও পারিবারিক ৩টি, কানাইঘাটে সর্বজনীন ৩৫টি, জৈন্তাপুরে ২০টি, ফেঞ্চুগঞ্জে সর্বজনীন ৪০টি ও পারিবারিক ১টি, বিশ্বনাথে সর্বজনীন ২৩টি ও পারিবারিক ৩টি, গোয়াইনঘাটে ৪০টি, জকিগঞ্জে সর্বজনীন ৯৩টি ও পারিবারিক ২টি, বিয়ানীবাজারে সর্বজনীন ৪২টি ও পারিবারিক ১২টি, কোম্পানীগঞ্জে ২৮টি এবং ওসমানীনগরে সর্বজনীন ৩৯টি পূজা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
সিলেট মহানগরের কোতোয়ালি মডেল থানা এলাকায় সর্বজনীন ৩১টি ও পারিবারিক ১১টি, জালালাবাদ থানায় সর্বজনীন ১৯টি ও পারিবারিক ২টি, এয়ারপোর্ট থানা এলাকায় সর্বজনীন ৩৯টি ও পারিবারিক ১টি, শাহপরান (র.) থানা এলাকায় সর্বজনীন ২৫টি ও পারিবারিক ১টি, দক্ষিণ সুরমায় সর্বজনীন ১৫টি এবং মোগলাবাজারে সর্বজনীন ১৭টি ও পারিবারিক ১টি পূজা অনুষ্ঠিত হবে।
১৬ অক্টোবর মহাষষ্ঠী
পূজার সূচি অনুযায়ী, আগামী ১৬ অক্টোবর শুক্রবার মহাষষ্ঠীর মধ্য দিয়ে দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে। ১৭ অক্টোবর শনিবার মহাসপ্তমী, ১৮ অক্টোবর রবিবার মহাঅষ্টমী, ১৯ অক্টোবর সোমবার মহানবমী এবং ২১ অক্টোবর বুধবার বিজয়া দশমী উদ্যাপিত হবে। তবে প্রকাশিত সূচিতে ১৮ ও ১৯ অক্টোবরের তিথির নাম যাচাই করা প্রয়োজন।
ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, এবার দেবী দুর্গার আগমন ঘটবে ঘোটকে এবং গমন হবে নৌকায়। এ ছাড়া আগামী ২৫ অক্টোবর রবিবার শ্রীশ্রী কোজাগরী লক্ষ্মীপূজা এবং ৮ নভেম্বর রবিবার শ্রীশ্রী শ্যামাপূজা অনুষ্ঠিত হবে।
সম্পাদনা-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ নোট: প্রকাশের আগে পূজার সংখ্যা ও তারিখগুলো যাচাই করা প্রয়োজন। মূল প্রতিবেদনে সিলেট জেলার পূজার সংখ্যা এক জায়গায় ৪৭৪টি, অন্য জায়গায় উপজেলাভিত্তিক হিসাব অনুযায়ী ভিন্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একইভাবে ১৭ ও ১৮ অক্টোবরের তিথির নাম এবং ১৯ অক্টোবর মহাঅষ্টমী উল্লেখের বিষয়টিও সংশ্লিষ্ট পূজা পরিষদের কাছ থেকে নিশ্চিত করে নেবেন।
জৈন্তা বার্তা/ ওয়াদুদ




