জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বন ও পরিবেশে কেমন প্রভাব ফেলছে তা নতুনভাবে উন্মোচিত হয়েছে এক আন্তর্জাতিক গবেষণায়। এই গবেষণায় ৩৬টি দেশ ও ৫০০টি স্থানে ২০ হাজারের বেশি গাছের বর্ষবলয় বিশ্লেষণ করা হয়েছে, যা প্রায় একশ বছরের জলবায়ু ইতিহাস তুলে ধরেছে। গবেষকরা দেখিয়েছেন, খরা, বন্যা ও চরম আবহাওয়া গাছের বৃদ্ধি এবং টিকে থাকার ক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
এই গবেষণায় বাংলাদেশের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) ড. মিজানুর রহমান ছাড়াও নেতৃত্ব দিয়েছেন নেদারল্যান্ডসের পিটার জুইডেমা, ব্রাজিলের পিটার গ্রোয়েনেন্ডি, যুক্তরাষ্ট্রের ভেলেরি ট্রাউট এবং ফ্লোরিন বাবস্ট। বিশ্বের বিভিন্ন ক্রান্তীয় অরণ্যে ফিল্ড ওয়ার্ক করা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশে হবিগঞ্জের রেমা-কালেঙ্গা বন এবং শ্রীমঙ্গলের লাউয়াছড়া বন, ব্রাজিলে আমাজন রেইনফরেস্ট, দক্ষিণ আফ্রিকায় বনাঞ্চল এবং উত্তর-পূর্ব ব্রাজিলের শুষ্ক বনাঞ্চল গবেষণার অন্তর্ভুক্ত।
গবেষণায় দেখা গেছে, খরা বিভিন্ন অঞ্চলে ভিন্নভাবে প্রভাব ফেলেছে। প্রায় এক-চতুর্থাংশ স্থানে গাছের কাণ্ড বৃদ্ধির হার বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় ১০ শতাংশ বেশি হ্রাস পেয়েছে। প্রধানত উষ্ণ ও শুষ্ক অঞ্চলে যেমন উত্তর-পূর্ব ব্রাজিল এবং দক্ষিণ আফ্রিকায়। বাংলাদেশের উদাহরণে দেখা যায়, ১৯৯৯ সালের খরায় রেমা-কালেঙ্গা বনের চিক্রাশি গাছের বৃদ্ধি আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৫৫ শতাংশ কমে গিয়েছিল।
গাছের বর্ষবলয় বিশ্লেষণ করে বোঝা যায়, খরার সময় গাছের কাণ্ডে উৎপন্ন কাঠ স্তর কমে যায়। এর ফলে বনভূমির কার্বন শোষণক্ষমতা হ্রাস পায়। অতিরিক্ত মৃত গাছের পচন থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গত হয়, যা বৈশ্বিক জলবায়ুকে প্রভাবিত করে। এছাড়া, গাছপালা কমে গেলে বাষ্পীভবন-উৎক্ষেপণ কমে যায়, মেঘ গঠন ও বৃষ্টিপাতের ধরণ প্রভাবিত হয় এবং স্থানীয় পানিচক্রের পরিবর্তন ঘটে।
গবেষকরা সতর্ক করেছেন যে, ভবিষ্যতে যদি খরার তীব্রতা ও ঘনত্ব বৃদ্ধি পায়, বর্তমান শারীরবৃত্তীয় অভিযোজন যেমন কাণ্ডের সংকীর্ণ নালী তৈরি করার ক্ষমতা পর্যাপ্ত নাও হতে পারে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে মৃত্যুহার বাড়বে, বন কাঠামো ও প্রজাতির সংমিশ্রণ বদলাবে।
খরার সময় স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়ে। পানির ঘাটতির কারণে কৃষি, পশুপালন ও জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বনাঞ্চলে জলাভাবের কারণে গাছের বৃদ্ধি ব্যাহত হয়, ফুল ও ফল উৎপাদন কমে যায়। নদী, হ্রদ ও জলাশয়ের পানি কমে যাওয়ায় জলজ প্রাণীর বাসস্থান নষ্ট হয়। তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে রোগ ও কীটপতঙ্গের আক্রমণ বেড়ে যায়।
ড. মিজানুর রহমান বলেন, আমাদের বন শুধু কাঠ বা অর্থনৈতিক সম্পদের উৎস নয়, এটি জলবায়ু নিয়ন্ত্রণ, পানি চক্র রক্ষা এবং মানবজীবনের নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। তাই বন সংরক্ষণকে জাতীয় নীতি প্রণয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে আনা জরুরি।
গবেষকরা নীতিনির্ধারকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, বনভিত্তিক প্রতিবেশব্যবস্থাকে রক্ষার জন্য দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ কৌশল প্রণয়ন করতে হবে। খরার প্রভাব মাপা, বন কাঠামো বিশ্লেষণ ও প্রজাতি বৈচিত্র্য রক্ষা সংক্রান্ত গবেষণা অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। শুধুমাত্র খরা–সহনশীল গাছ রোপণ যথেষ্ট নয়,দেশীয় প্রজাতি ও উলম্ব স্তরবিন্যাস বজায় রেখে ন্যাচারাল রিজেনারেশনকে গুরুত্ব দিতে হবে।
ড. মিজানুর রহমান তরুণ গবেষক ও শিক্ষার্থীদের পরামর্শ দিয়েছেন, সৃজনশীল হও। কারও সঙ্গে নয়, প্রতিযোগিতা করো প্রতিনিয়ত নিজেকে ছাড়িয়ে যেতে। কাজে ও চিন্তায় সৎ হও। তখনই তুমি পৃথিবীতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারবে।
জৈন্তা বার্তা/আরআর




