বাংলাদেশে পাহাড়ি অঞ্চলের ঔষধি গুল্ম: দাঁতরাঙা
মঙ্গলবার, ২৬ মে ২০২৬, ১১:৪১ PM

বাংলাদেশে পাহাড়ি অঞ্চলের ঔষধি গুল্ম: দাঁতরাঙা

ইমরান হোসেন রানা, শাবিপ্রবি প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ০১/১০/২০২৫ ০৪:১৭:৫৫ PM

বাংলাদেশে পাহাড়ি অঞ্চলের ঔষধি গুল্ম: দাঁতরাঙা

ছবি:নিজস্ব


বাংলাদেশের পাহাড়ি বনাঞ্চলে চোখে পড়ে এক ধরনের গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ, যা স্থানীয়রা দাঁতরাঙা নামে চেনে। 

গাছটি সাধারণত ১–৩ মিটার উচ্চতা পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। পত্রবৃন্ত ০.৪–১.৮ সেমি লম্বা। পুষ্পমঞ্জরীতে ৩–৭টি ফুল থাকে, যা ঠাসা বা শিথিল স্তবক আকারে পাতার কাক্ষিকভাবে অবস্থান করে। মঞ্জরীপত্র কখনও স্থায়ী, বৃহৎ ও সুদৃশ্য, ২ সেমি পর্যন্ত লম্বা, বহি:পৃষ্ঠ বিশেষত মধ্যশিরা বরাবর চেপ্টা এবং সাদাটে বা লালচে শঙ্ক দ্বারা ঘন আবৃত। হাইপ্যান্থিয়াম ৫–৯ মিমি লম্বা, চেপ্টা, রূপালী থেকে হলুদাভ পিঙ্গল বর্ণের শঙ্ক দ্বারা ঘন আবৃত। পাপড়ি ২–৩.৫ সেমি লম্বা, ফিকে লাল বা বেগুনি। পুংকেশর ১০টি, দ্বিরূপী, পরাগধানী সরু ডিম্বাকার, বহি:পরাগধানী ৭–৯ মিমি লম্বা এবং বিবর্ণ বেগুনি, অন্তঃপরাগধানী ৫–৬ মিমি লম্বা, হলুদ। গর্ভাশয় ৫ প্রকোষ্ঠীয়, অগ্রভাগ কুরুর্চ আবৃত। ক্রোমোজম সংখ্যা ২৮, অর্থাৎ ১৪ জোড়া।

ফল খুব ছোট, পাকলে ফল নিজে থেকেই ফেটে যায় এবং দোরঙ্গা বের হয়। পাখি ও প্রজাপতি এই ফল ও ফুলের মধু খায়। ফলের রসের মধ্যে থাকা চিনি প্রজাপতি ও স্থানীয়দের জন্য খাদ্য হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ। ফল খাওয়ার পর দাঁতের রঙ লাল হওয়ায় নামটি দাঁতরাঙা রাখা হয়েছে।

ঔষধি গুণের দিক থেকে দাঁতরাঙা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এটি কৌষ্ঠ্যকাঠিন্য, আলসার, পেটব্যথা, আমাশয়, বাতজ্বর, দাঁতের ব্যথা, চর্মরোগ এবং ডায়রিয়ার চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। পাতার নির্যাস ক্যান্সার প্রতিরোধে, হৃদরোগ রোধে এবং উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক। এছাড়া জোঁকের কামড় বা বমি প্রতিরোধেও ব্যবহার হয়। প্রাচীনকাল থেকে এন্টিভমিটিং ও রক্তবদ্ধকারী হিসেবে এটি ব্যবহৃত হয়েছে।

প্রাকৃতিকভাবে দাঁতরাঙা উষ্ণমন্ডলীয় ও উপ-উষ্ণমন্ডলীয় বনাঞ্চল এবং পাহাড়ি অঞ্চলে জন্মায়। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বনাঞ্চলে এটি সাধারণ, বিশেষ করে মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার বনজঙ্গলগুলোতে। Melastomataceae পরিবারের মধ্যে দাঁতরাঙা সবচেয়ে পরিচিত। বাংলাদেশে পরিবারের মধ্যে ২/১টি প্রজাতি পাওয়া যায় এবং বিশ্বব্যাপী প্রায় ১০০-১৫০টি  প্রজাতি রয়েছে।বাংলাদেশের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (শাবিপ্রবি) নিউজিল্যান্ড টিলা ও গাজী কালুর টিলায় প্রচুর পরিমাণ দাঁতরাঙা দেখা যায়। 

 চা শ্রমিক রামচন্দ্র বলেন, “আমরা এই ফুলগুলোকে ফুটকি বলি। বর্ষার সময় এগুলো বেশি ফোটে এবং সাধারণত চা বাগানে পাওয়া যায়। ফুল ফোটার পর কিছুদিনের মধ্যে ফল ধরতে শুরু করে, যা আকারে জামের মতো হলেও ছোট। মাঝে মাঝে আমরা সেই ফল খাই। পাকলে খেতে মিষ্টি লাগে, তবে মুখে বেগুনি দাগ পড়ে।” 

হর্টিকালচার অধ্যয়নরত একজন শিক্ষার্থী আরও জানান, “দাঁতরাঙা মূলত বন্য পরিবেশে জন্মায়। স্থানীয়ভাবে এটিকে দাঁতরাঙা, লুটকি বা বনতেজপাতা বলা হয়। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে জন্মালেও পঞ্চগড়, গাজীপুর ও সিলেটের মতো এলাকায় বিশেষভাবে দেখা যায়। টেকনাফ ও বান্দরবান অঞ্চলে কয়েকটি ভিন্ন জাতের উপস্থিতিও লক্ষ্য করা যায়। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বেশিরভাগ দেশে দাঁতরাঙা পাওয়া যায় এবং এটি ঔষধি বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন।”

বৈজ্ঞানিক শ্রেণীবিন্যাস অনুযায়ী দাঁতরাঙা Plantae রাজ্যের Angiosperms বিভাগভুক্ত, Edicots অবিন্যাসিত, Myrtales বর্গের Melastomataceae পরিবারে অন্তর্ভুক্ত। গণ: Melastoma, প্রজাতি: Melastoma malabathricum. সমনাম: Melastoma affine, Melastoma polyanthum, Melastoma royenii, Melastoma ellipticum, Melastoma scabrum. ইংরেজি নাম Indian Rhododendron, চাকমা ভাষায় ‘মুওপিত্তিংগুলো’।

দাঁতরাঙা শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বৃদ্ধি করছে না, বরং মানুষের স্বাস্থ্যের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ ঔষধি গাছ। এর ঔষধি ব্যবহার, পরিবেশগত গুরুত্ব এবং প্রাণীর খাদ্য হিসেবে ভূমিকা এটিকে বিশেষ করে তোলে।

জৈন্তাবার্তা / সুলতানা