সিলেট ২ আসনে বিএনপির মনোনয়ন পাচ্ছেন কে খালেদা নাকি তারেকের উপদেষ্টা!
মঙ্গলবার, ২৬ মে ২০২৬, ০৭:৪৫ PM

সিলেট ২ আসনে বিএনপির মনোনয়ন পাচ্ছেন কে খালেদা নাকি তারেকের উপদেষ্টা!

মুহাজিরুল ইসলাম রাহাত, নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ০৬/১০/২০২৫ ০৯:১৪:২৬ PM

সিলেট ২ আসনে বিএনপির মনোনয়ন পাচ্ছেন কে খালেদা নাকি তারেকের উপদেষ্টা!

ছবি: নিজস্ব


আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিলেট থেকেই নির্বাচন করবেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সাথে জাতিসংঘের সমন্বয়কারীর আলাপচারিতায় বিষয়টি প্রকাশ পেয়েছে।

রবিবার গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে জাতিসংঘের ঢাকার আবাসিক সমন্বয়কারী গোয়েন লুইসের সঙ্গে বৈঠকের সময় তিনি এ তথ্য জানান।

বৈঠকের শুরুতে পরিচয় পর্বে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘এখন থেকে হুমায়ুন কবির দেশেই থাকবেন এবং আগামী জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেবেন।’

প্রত্যুত্তরে জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারী গোয়েন লুইস বলেন, ‘আমি বিষয়টি জানি, এবং কোন আসন থেকে কাকে টেকওভার করা হচ্ছে সেটিও অবগত আছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘সিলেট থেকেই পরবর্তী পররাষ্ট্রমন্ত্রী আসছেন বলে আমি শুনেছি।’

বৈঠকের এই অংশটি ধারণ করা এক ভিডিওচিত্রে দেখা গেছে, যেখানে দুই পক্ষের মধ্যে উষ্ণ কথোপকথনের সময় এসব মন্তব্য উঠে আসে। 

মির্জা ফখরুলের এই ঘোষণার পরই সিলেটের রাজনীতিতে সৃষ্টি হয়েছে তীব্র আলোড়ন। বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে শুরু হয়েছে নানা আলোচনা–সমালোচনা। হুমায়ুন কবির ঠিক কোন আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন, তা এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।

সিলেটের ৬টি আসনের প্রতিটিতেই বর্তমানে একাধিক বিএনপি প্রার্থী মনোনয়ন প্রত্যাশায় মাঠে সক্রিয় রয়েছেন। এর মধ্যে সিলেট-২ (বিশ্বনাথ-বালাগঞ্জ-ওসমানীনগর) আসনটি দীর্ঘদিন ধরে দলের অন্যতম আলোচিত কেন্দ্র। এই আসনে নিখোঁজ বিএনপি নেতা এম. ইলিয়াস আলীর স্ত্রী তাহসিনা রুশদী লুনা ছিলেন এককভাবে মনোনয়ন প্রত্যাশী হিসেবে সক্রিয়। ইলিয়াস আলীর নিখোঁজ হওয়ার পর থেকেই তিনি এলাকার মানুষের পাশে রয়েছেন, নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন স্থানীয় সংগঠনগুলোর সঙ্গে এবং তরুণদের নিয়ে আয়োজন করছেন রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মসূচি।

সম্প্রতি তারেক রহমানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও প্রবাসী কূটনীতিক হুমায়ুন কবির সিলেট সফরে এসে বলেন, তিনি ‘তারেক রহমানের নির্দেশে’ এলাকায় কাজ করছেন এবং নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

তার এ ঘোষণার পর থেকেই রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। স্থানীয় বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের একাংশ বিষয়টিকে ‘অপ্রীতিকর ও আচমকা সিদ্ধান্ত’ হিসেবে দেখছেন। অনেকে মনে করছেন, এতে করে ইলিয়াস পতœী লুনার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ত্যাগ ও জনপ্রিয়তাকে উপেক্ষা করা হচ্ছে।

মির্জা ফখরুলের ঘোষণার পর রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে, তাহসিনা রুশদী লুনা কি সিলেট-২ আসন থেকে বাদ পড়ছেন? নাকি তাকে বিএনপি অন্য কোনো আসন, যেমন সিলেট-১ বা সিলেট-৩, থেকে মনোনয়ন দিতে পারে?

বিএনপির একাধিক স্থানীয় নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, ‘লুনা আপা অনেক জনপ্রিয় ও গ্রহণযোগ্য। তিনি দলের ত্যাগী নেত্রী। তাকে সরিয়ে দেওয়া দলের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।’ অন্যদিকে দলের আরেক অংশের মতে, ‘হুমায়ুন কবির প্রবাসী কূটনীতিক হিসেবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিএনপির ভাবমূর্তি রক্ষায় ভূমিকা রেখেছেন। তার প্রার্থী হওয়ায় দলের পররাষ্ট্রনীতি ও কৌশলগত অবস্থান শক্তিশালী হবে।’

বিএনপির মহাসচিবের ঘোষণায় সিলেট বিএনপির ভেতরে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। 

ইলিয়াস আলী পরিবার ও সমর্থকগোষ্ঠী একদিকে, আর হুমায়ুন কবির সমর্থকরা অন্যদিকে অবস্থান নিচ্ছেন বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।

পর্যবেক্ষকদের মতে, বিএনপি যদি আগাম নির্বাচনী প্রস্তুতির অংশ হিসেবে প্রার্থী চূড়ান্ত করে ফেলে, তবে সিলেট অঞ্চলে দলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব আরও প্রকট হতে পারে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ‘সিলেট ২ আসন শুধু একটি নির্বাচনী এলাকা নয়, এটি ইলিয়াস আলীর প্রতীকী আসন। এখানে প্রার্থী পরিবর্তন মানেই দলের আবেগের জায়গায় আঘাত।’

তবে বিএনপির কেন্দ্রীয় দফতর থেকে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে হুমায়ুন কবির বা তাহসিনা রুশদী লুনার বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়নি।

এদিকে তারেক রহমানের পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির স্পষ্ট করেই জানিয়েছেন, তিনি নির্বাচন করলে সিলেট-২ আসন থেকেই করবেন। একটি বেসরকারি টেলিভিশন থেকে দেওয়া সাক্ষাতকারে এমনটি বলেছেন তিনি। রোববার রাতে ‘হুমায়ুন কবির মিডিয়া সেল’ নামের ফেসবুক পেজ থেকে আপ করা এক ভিডিওতেও এমনটি বলতে শোনা যায় হুমায়ুন কবিরকে। এতে তিনি বলেন, সিলেট আমার হৃদয়ে। বিশ্বনাথ-ওসমানীনগর আমার হৃদয়ে। দল চাইলে আমি ওই এলাকা থেকেই প্রার্থ হবো। সিলেট-২ আসনে দলের অন্য মনোনয়ন প্রত্যাশী সম্পর্কে তিনি বলেন, বিএনপি বড় দল। এখানে অনেকে মনোনয়ন চাইবে। যারা মনোনয়ন চাইছেন তারা সকল্ই যোগ্য। তবে দলের মনোনয়ন কেউ পাবে , কেউ পাবে না- এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু মনোনয়ন না পাওয়া মানেই রাজনীতি শেষ নয়।

বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও নিখোঁজ এম ইলিয়াস আলীর স্ত্রী তাহসীনা রুশদী লুনা বলেছেন, আমি দলের নির্দেশেই মাঠে কাজ করছি। নতুন করে কাজ করছি এমনও নয়। আমার স্বামী ইলিয়াস আলী গুম হওয়ার পর দলের চেয়ারপার্সন দেশনেত্রী বেগম খালেদতা জিয়া আমাকে এলাকার মানুষদের জন্য কাজ করতে বলেছেন। সে-ই থেকে আমি মাঠে আছি।

তিনি বলেন, সিলেট-২ আসনের কোনো প্রার্থী চূড়ান্ত করা হয়নি। দল থেকে আমাকে এখন পর্যন্ত এ ব্যাপারে কিছু জানানো হয়নি। কোন কোন মিডিয়ায় নানা কিছু লেখা হচ্ছে, তারা কি উদ্দেশে এসব লিখেছেন তা আমি জানি না। আমি মাঠে কাজ করে যাচ্ছি। শেষ পর্যন্ত আমি কাজ করবো।

সোমবার বিকালে ইলেকট্রনিক মিডিয়া জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন (ইমজা)- কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে এক মতবিনিময় অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।

মনোনয়ন না পেলে কী করবেন এমন এক পশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আগে দল সিদ্ধান্ত দিক। তারপর আপনারা বুঝবেন। দল সিদ্ধান্ত নিলে প্রতিক্রিয়া জানাবো। আগে আগে প্রতিকিয়া জানিয়ে কি লাভ।

তিনি বলেন, আমাদের নেতা তারেক রহমান বলে দিয়েছেন কোন ক্রাইটেরিয়ায় মনোনয়ন দেওয়া হবে। তার মধ্যে রয়েছে দীর্ঘদিনের ত্যাগী কর্মী ও যাদের জনসম্পৃক্ততা রয়েছে- তাদেরকে দল মূল্যায়িত করবে। ফলে যারা ত্যাগী ও জনপ্রিয় তাদের হতাশ হওয়ার কিছু নেই।

লুনা বলেন, গত ১৭ বছর আমরা জনগনের সাথে মিশতে পারিনি। ফ্যাসিস্ট সরকার আমাদের জনগরে সথে মিশতে দেয়নি। এখন আমরা সেই গ্যাপটা পুরণ করার চেষ্টা করছি। মানুষের কাছে যাচ্ছি। বিএনপির বার্তা মানুষের কাছে পৌছে দিচ্ছি।

ইলিয়াস আলীর পতœী লুনা বলেন, আওয়ামী লীগের ভোটাররা তো আছেই। নেতারা হয়তো এলাকায় নেই। কিন্তু সাধারণ ভোটাররা তো আছে। তবে তাদের তো প্রার্থী নেই। এখন তারা ভোট কেন্দ্রে যাবে কী না এই প্রশ্ন আছে। তারা যাতে ভোট কেন্দ্রে যায় এই চেষ্টা আমরা করছি। এবং একজন গ্রহণযোগ্য প্রার্থীকে যাতে ভোট দেয় এই চেষ্টা করছি।

জৈন্তাবার্তা / মনোয়ার