ছবি নিজস্ব
আর মাত্র দুইদিন বাকি। এরপরই অনুষ্ঠিত হবে মুসলিম সম্প্রদায়ের অন্যতম বড় ধর্মীয় উৎসব ঈদুল আজহা। আগামী বৃহস্পতিবার একযোগে সারাদেশে পালন করা হবে এই উৎসব। ঈদের বাজার ঘিরে ব্যবসায়ীরা কর্মব্যস্ততায় থাকার কথা থাকলেও এ বছর হাওরাঞ্চলে রয়েছে ভিন্নতা। হাওরাঞ্চলের বাজারগুলোতে ঈদের কেনাকাটার ব্যাপারে ক্রেতাদের কোনো আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না। বছরের এই সময়টায় বোরো ধান ঘরে তুলে খুশি থাকার কথা থাকলেও সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার কৃষকদের ভাগ্যে তা জোটেনি। একদিকে ফসলহানি, অন্যদিকে অর্থ সংকটে নীরব কান্নায় এবারের ঈদ পালন করবেন হাওরবাসী।
শাল্লা উপজেলার ৪টি ইউনিয়নের প্রত্যন্ত গ্রামগুলো ঘুরে দেখা যায়, ফসলহারা কৃষক পরিবারগুলোতে এবার ঈদের কোনো আনন্দ নেই। কষ্ট আর অর্থ সংকটে ভুগছে অনেক পরিবার। সন্তানদের লেখাপড়ার জোগান দেয়া তো দূরের কথা, অনেক পরিবার দু'বেলা দু'মুঠো ভাতের জন্য গ্রাম ছেড়ে ছুটছেন শহরে কাজের সন্ধানে। মূলত এবার বোরো ফসল বিনষ্টের কারণে ঈদের আনন্দ ম্লান হয়ে গেছে।
উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল আর টানা বর্ষণে শাল্লা উপজেলার প্রায় ৬০ শতাংশ জমির বোরো ফসল তলিয়ে গেছে। এ যেন ‘মড়ার উপর খাড়ার ঘাঁয়ে’ পরিণত হয়েছে। এর আগে চৈত্র মাসের দুর্দিনে রমজানের ঈদ কোনোরকমে কাটিয়ে গেলেও হাওরবাসী বুক ভরা স্বপ্ন আর আশা নিয়ে অপেক্ষায় ছিলেন বৈশাখের সোনালি ফসল ঘরে তোলে কোরবানির ঈদে অনেকেই ছেলে-মেয়ে, পরিবার-পরিজনকে নতুন জামা-কাপড় কিনে দেবেন। কিন্তু সেই স্বপ্ন ডুবে গেল পানির নিচে।
ঘুঙ্গিয়ারগাঁও বাজারের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বøু ড্রিমের ম্যানেজার দিপংকর দাস বলেন, বাজারে ক্রেতাদের কোনো উপস্থিতি নেই। অন্যান্য সময়ে ঈদের বাজারে বসে থাকার মতো কোনো সুযোগ পেতাম না। আর এখন বসে থেকেও সময় যাচ্ছে না। আর তিনদিন পরেই ঈদ। এই ঈদে কোনো সাড়া-শব্দ নেই। কাপড় বিক্রিতে একেবারে ধস নেমেছে। হাওরে ফসল তলিয়ে যাওয়ায় এর প্রভাব পড়েছে ঈদের বাজারে।
শাল্লা উপজেলার শাল্লা ইউনিয়নের সাত্তারপুর গ্রামের কৃষক এরশাদ আলী বলেন, খাইয়াই বাঁচি না, ঈদ করমু কেমনে। জমি-জমা যা আছিল সবই পানির নিচে চলে গেছে। ঈদ করার মতো কোনো টাকা-পয়সা নাই। ছেলে-মেয়ে নিয়া কেমনে চলতাম এই চিন্তাই করছি।
আনন্দপুর গ্রামের কৃষক হাশেম আলী বলেন, স্বপ্ন আছিল ধান বেইচ্যা পোলাপানরে ঈদের কাপড় দিমু, ঘরে পিঠা-পায়েস অইবো। অখন ঈদের আনন্দ তো দূরের কথা, সামনের দিনগুলোতে পরিবার নিয়া কী খাইয়া বাঁচমু, সেই চিন্তায় চোখে ঘুম নাই। পাওনাদাররা এখনই বাড়ির আশপাশে আইসা ভিড় করতাছে।
শুধু হাশেম নয়, উৎসবের আগমুহূর্তে প্রাকৃতিক বিপর্যয় হাওরপাড়ের জনপদকে বিষণ্ণ করে তুলেছে। যেখানে থাকার কথা ছিল আনন্দ-উৎসব, সেখানে এখন কেবলই হাহাকার আর দীর্ঘশ্বাস।
কৃষি অফিসের তথ্যমতে, এ বছর শাল্লা উপজেলায় ২১ হাজার ৭০০ হেক্টর জমিতে ধান আবাদ করা হয়। এর থেকে ধানের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছিল প্রায় ১ লক্ষ ৪৩ হাজার ৩৬৮ মেট্রিক টন ও চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল প্রায় ৯৫ হাজার ৫৭৯ মেট্রিক টন, যার বাজারমূল্য প্রায় ৫১৬.১২ কোটি টাকা। তবে গত ২৬ এপ্রিলের আগে জলাবদ্ধতায় প্রায় ৪ হাজার ৩৪০ হেক্টর জমি, শিলাবৃষ্টি ও অতিবৃষ্টিতে আক্রান্ত প্রায় ৭৭১ হেক্টর জমি এবং শিলাবৃষ্টি ও অতিবৃষ্টিতে চ‚ড়ান্ত ক্ষতিগ্রস্ত জমি প্রায় ১৬৭ হেক্টর। এরপর নতুন করে টানা বর্ষণে হাওরে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে উপজেলার হাওরগুলোতে আরও ১ হাজার ৪১৫ হেক্টর বোরো ফসল আক্রান্ত হয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে কৃষি অফিসের এই তথ্য মানতে নারাজ ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা।
শাল্লা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পিয়াস চন্দ্র দাস বলেন, উপজেলা প্রশাসন ও ইউনিয়ন পরিষদে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রায় প্রস্তুত হয়ে গেছে। তালিকা অনুযায়ী সকল সহায়তা দেওয়া হবে। কয়েকদিনের মধ্যেই সহায়তা কার্যক্রম শুরু করা হবে। এ বিষয়ে সার্বিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে।
জৈন্তাবার্তা/আরআর




