বিয়ানীবাজারে ফুলেল শ্রদ্ধায় নানকার কৃষক বি*দ্রোহের শহীদদের স্মরণ
মঙ্গলবার, ১৮ অগাস্ট ২০২৬, ০৯:১৮ PM

নানকার বিদ্রোহের ইতিহাস পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্তির দাবি

বিয়ানীবাজারে ফুলেল শ্রদ্ধায় নানকার কৃষক বি*দ্রোহের শহীদদের স্মরণ

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৮/০৮/২০২৬ ০৭:১৫:২৯ PM

বিয়ানীবাজারে ফুলেল শ্রদ্ধায় নানকার কৃষক বি*দ্রোহের শহীদদের স্মরণ

ছবি:সংগৃহীত


বিয়ানীবাজারে যথাযোগ্য মর্যাদা ও নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে পালিত হয়েছে ঐতিহাসিক ৭৭তম নানকার দিবস। ব্রিটিশ আমলের ঘৃণ্য নানকার প্রথা ও জমিদারি শোষণের বিরুদ্ধে সিলেট অঞ্চলের কৃষকদের গড়ে তোলা গৌরবময় আন্দোলনের স্মৃতিবিজড়িত এ দিনটি উপলক্ষে মঙ্গলবার  (১৮ আগস্ট) সুনাই নদীর তীরে নানকার স্মৃতিসৌধে শহীদদের প্রতি ফুলেল শ্রদ্ধা নিবেদন ও আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়।
বিয়ানীবাজার সাংস্কৃতিক কমান্ড, উলুউরি নানকার বিদ্রোহ স্মৃতি পাঠাগার ও নানকার যুব সংঘ, সানেশ্বরের আয়োজনে সোমবার সকাল ১০টায় সানেশ্বর ও উলুউরি গ্রামের মধ্যবর্তী সুনাই নদীর তীরে অবস্থিত নানকার স্মৃতিসৌধে শহীদদের আত্মার শান্তি কামনায় এক মিনিট নীরবতা পালনের মধ্য দিয়ে কর্মসূচির সূচনা হয়।
পরে স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শ্রদ্ধা জানান আয়োজক সংগঠনগুলোর নেতৃবৃন্দসহ নানকার বিদ্রোহ স্মৃতি পাঠাগার, উলুউরি সমাজকল্যাণ সংগঠন, নানকার স্মৃতি পাঠাগার, বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি, গণঅধিকার পরিষদ, বিয়ানীবাজার সাংস্কৃতিক কমান্ড এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ ও সর্বস্তরের মানুষ।
এর আগে নানকার স্মৃতি রক্ষা কমিটির সমন্বয়কারী, সাংবাদিক ও নাট্যকর্মী আব্দুল ওয়াদুদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত  আলোচনা সভায়  বক্তারা বলেন, নানকার কৃষক বিদ্রোহ শুধু একটি স্থানীয় আন্দোলন নয়; এটি ছিল শোষণ, বৈষম্য ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে কৃষকের অধিকার প্রতিষ্ঠার এক ঐতিহাসিক সংগ্রাম। এই আন্দোলনে ছয়জন কৃষক জীবন দিয়ে অধিকারহীন মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার পথ তৈরি করেছেন। তাঁদের আত্মত্যাগ নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা এবং ইতিহাসের এই গৌরবময় অধ্যায় সংরক্ষণ করা আমাদের দায়িত্ব।
বক্তারা নানকার কৃষক বিদ্রোহের ইতিহাস জাতীয় পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানিয়ে বলেন, ইতিহাসের গৌরবময় অধ্যায়গুলো আড়ালে থাকলে নতুন প্রজন্ম নিজেদের সংগ্রামের শিকড় সম্পর্কে জানতে পারবে না। নানকার বিদ্রোহের ইতিহাস পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করা হলে শিক্ষার্থীরা কৃষকের অধিকার, শোষণের বিরুদ্ধে সংগ্রাম এবং আত্মত্যাগের প্রকৃত ইতিহাস জানার সুযোগ পাবে।
বক্তারা বলেন, সুনাই নদীর তীরে ছয় কৃষকের রক্তে যে অধিকারের ইতিহাস লেখা হয়েছিল, তা শুধু বিয়ানীবাজারের নয়-এটি সিলেটের কৃষক সমাজের সংগ্রাম, আত্মমর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠার ইতিহাস। তাই নানকার আন্দোলনের ইতিহাস সংরক্ষণ, গবেষণা এবং নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
আলোচনা সভায় বক্তব্য দেন বিয়ানীবাজার উপজেলা কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক আনিসুর রহমান, উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর সাধারণ সম্পাদক ও শিক্ষক বিজিত আচার্য, রাজনীতিবিদ বিবেকানন্দ দাস, বিয়ানীবাজার পৌরসভার সাবেক কমিশনার আকছার উদ্দিন, কর্ণমণি দাস, শশাঙ্ক দাস, শাওন দাস, তুষার ভট্টাচার্য, নানকার বিদ্রোহের শহীদ প্রসন্ন কুমার দাসের নাতি দীপক দাস এবং বিয়ানীবাজার সাংস্কৃতিক কমান্ডের নাট্যকর্মী হাসান খান প্রমুখ।
উল্লেখ্য, ১৯৪৯ সালের ১৮ আগস্ট বিয়ানীবাজারের সানেশ্বর ও উলুউরি গ্রামের মধ্যবর্তী সুনাই নদীর তীরে জমিদারি ও নানকার প্রথার বিরুদ্ধে আন্দোলনরত কৃষকদের সঙ্গে পাকিস্তানি ইপিআর ও জমিদারদের বাহিনীর রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়। এতে ঘটনাস্থলেই নিহত হন ব্রজনাথ দাস (৫০), কুটুমনি দাস (৪৭), প্রসন্ন কুমার দাস (৫০), পবিত্র কুমার দাস (৪৫), অমূল্য কুমার দাস (১৭) ও রজনী দাস।
এই হত্যাকাণ্ড নানকার আন্দোলনকে দমিয়ে দিতে পারেনি; বরং কৃষকদের প্রতিবাদ আরও বিস্তৃত ও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। বৃহত্তর সিলেটের বিভিন্ন এলাকায় জমিদারি শোষণ ও নানকার প্রথার বিরুদ্ধে আন্দোলন তীব্র হয়। প্রবল কৃষক আন্দোলনের মুখে শেষ পর্যন্ত ১৯৫০ সালে জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত এবং নানকার প্রথা বাতিল করতে বাধ্য হয় তৎকালীন সরকার।


জৈন্তা বার্তা/ ওয়াদুদ