ছবি:সংগৃহীত
রাশিয়ায় বেসামরিক কাজের মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিকদের ইউক্রেন যুদ্ধে অংশ নিতে বাধ্য করা হচ্ছে-এমন ভয়াবহ তথ্য উঠে এসেছে আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি)-এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ থেকে দালালচক্রের মাধ্যমে রাশিয়ায় পাঠানো শ্রমিকদের পরিচ্ছন্নতাকর্মী বা সাধারণ শ্রমিক হিসেবে কাজ দেওয়ার কথা বলা হলেও সেখানে পৌঁছানোর পর তাঁদের জোরপূর্বক রুশ সেনাবাহিনীতে যুক্ত করা হচ্ছে।
ভুক্তভোগী মাকসুদুর রহমান এপিকে জানান, এক শ্রম দালালের প্রলোভনে তিনি নিজ শহর ছেড়ে রাশিয়ায় যান। তাঁকে জ্যানিটর হিসেবে চাকরির আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু মস্কো পৌঁছানোর কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তাঁকে ইউক্রেন যুদ্ধের সম্মুখসারিতে পাঠানো হয়।
এপি তিনজন বাংলাদেশির সঙ্গে কথা বলেছে, যারা রুশ সেনাবাহিনী থেকে পালিয়ে দেশে ফিরতে সক্ষম হয়েছেন। তাঁরা জানান, রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর রুশ ভাষায় লেখা কিছু কাগজে তাঁদের জোর করে সই করানো হয়। পরে জানা যায়, সেগুলো ছিল সামরিক চুক্তিপত্র। এরপর তাঁদের একটি সেনা প্রশিক্ষণ শিবিরে পাঠানো হয়, যেখানে ড্রোন যুদ্ধকৌশল, আহত সেনা উদ্ধার এবং ভারী অস্ত্র ব্যবহারের প্রাথমিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
মাকসুদুর রহমান বলেন, কাজ করতে অস্বীকৃতি জানালে এক রুশ কমান্ডার অনুবাদ অ্যাপের মাধ্যমে তাঁকে বলেন,‘তোমার এজেন্ট তোমাকে এখানে পাঠিয়েছে। আমরা তোমাকে কিনেছি।’
ভুক্তভোগীরা জানান, তাঁদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ সামনের সারির কাজে পাঠানো হতো। এর মধ্যে ছিল রুশ বাহিনীর আগে এগিয়ে যাওয়া, রসদ বহন, আহত সেনাদের সরিয়ে নেওয়া এবং নিহতদের মরদেহ উদ্ধার করা।
এছাড়া নিখোঁজ তিন বাংলাদেশির পরিবারের সদস্যরাও এপিকে জানিয়েছেন, নিখোঁজ হওয়ার আগে তাঁদের স্বজনেরা একই ধরনের নির্যাতন ও জোরপূর্বক যুদ্ধের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছিলেন।
মাকসুদুর রহমান আরও বলেন, কাজ করতে অস্বীকার করলে তাঁদের ১০ বছরের কারাদণ্ডের হুমকি দেওয়া হতো এবং শারীরিক নির্যাতন চালানো হতো। তিনি বলেন,
‘ওরা বলত, ‘কাজ করছ না কেন? কাঁদছ কেন?’ এই বলে লাথি মারত।’ সাত মাস পর পালিয়ে দেশে ফিরতে সক্ষম হন তিনি।
এপি যেসব নথিপত্র পর্যালোচনা করেছে, তার মধ্যে রয়েছে ভ্রমণসংক্রান্ত কাগজপত্র, রুশ সামরিক চুক্তিপত্র, চিকিৎসা ও পুলিশি প্রতিবেদন এবং যুদ্ধক্ষেত্রে পাওয়া আঘাতের ছবি। এসব নথি ইউক্রেন যুদ্ধে বাংলাদেশিদের অংশগ্রহণের প্রমাণ বহন করে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে ঠিক কতজন বাংলাদেশি এভাবে প্রতারণার শিকার হয়েছেন, তা এখনো স্পষ্ট নয়। ভুক্তভোগীরা এপিকে জানিয়েছেন, ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে রুশ বাহিনীর সঙ্গে তাঁরা শত শত বাংলাদেশিকে কাজ করতে দেখেছেন।
এ বিষয়ে রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়, রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ সরকার-কোনো পক্ষই এপির প্রশ্নের জবাব দেয়নি।
মানবাধিকারকর্মী ও কর্মকর্তারা বলছেন, একই কৌশলে রাশিয়া ভারত, নেপালসহ দক্ষিণ এশিয়া এবং আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের নাগরিকদেরও টার্গেট করছে। এতে অভিবাসী শ্রমিকদের জোরপূর্বক যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহার ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি নতুন করে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
জৈন্তা বার্তা/ ওয়াদুদ




