ছবি : সংগৃহীত
পাহাড়ি ঢল ও অতি ভারী বৃষ্টির কারণে সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোণা ও বান্দরবান জেলায় নদ-নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। আগামী ৪৮ ঘণ্টায় দেশের উত্তরাঞ্চল ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের আরও অন্তত আটটি জেলায় নতুন করে স্বল্পমেয়াদী বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে বলে সতর্ক করেছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র।
সোমবার (১৩ জুলাই) বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (বাপাউবো) বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের এক বিশেষ বার্তায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
এতে বলা হয়, সুরমা নদীর ছাতক (সুনামগঞ্জ) পয়েন্টে বিপৎসীমার ১৫ সেন্টিমিটার ওপরে, কুশিয়ারা নদীর ফেঞ্চুগঞ্জ (সিলেট) পয়েন্টে ২৭ সেন্টিমিটার ও মারকুলি (সুনামগঞ্জ) পয়েন্টে ৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে।
এছাড়া, সোমেশ্বরী নদীর কলমাকান্দা (নেত্রকোণা) পয়েন্টে বিপৎসীমার ৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে।
বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপের প্রভাবে দেশের বিভিন্ন স্থানে এবং উজানে ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত রয়েছে। আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে দেশের উত্তরাঞ্চল, উত্তর-পূর্বাঞ্চল এবং দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের নদী তীরবর্তী নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি অথবা নতুন এলাকা প্লাবিত হওয়ার প্রবল ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
সরকারি প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে পার্বত্য জেলা বান্দরবানে সাঙ্গু নদীর পানি সবচেয়ে বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। সেখানে নদীর পানি বিপদসীমার ৭৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এছাড়া সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জে কুশিয়ারা নদীর পানি বিপদসীমার ২৬ সেন্টিমিটার এবং সুনামগঞ্জের মারকুলিতে একই নদীর পানি ১৪ সেন্টিমিটার ওপরে রয়েছে। সুনামগঞ্জের ছাতকে সুরমা নদীর পানি ২ সেন্টিমিটার এবং নেত্রকোণার কলমাকান্দায় সোমেশ্বরী নদীর পানি বিপদসীমার ৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে বইছে। বর্তমানে চারটি জেলা বন্যাক্রান্ত হলেও নতুন করে আরও আটটি জেলা বন্যার ঝুঁকিতে রয়েছে।
উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগর এবং তৎসংলগ্ন উত্তর ওড়িশা-পশ্চিমবঙ্গ উপকূলীয় এলাকায় একটি লঘুচাপ সৃষ্টি হয়েছে। এর প্রভাবে চট্টগ্রাম, সিলেট, ময়মনসিংহ ও রংপুর বিভাগসহ উজানে ভারতের ত্রিপুরা, আসাম, মেঘালয় ও পশ্চিমবঙ্গে গত তিন দিন ধরে অতি ভারী বৃষ্টিপাত পরিলক্ষিত হয়েছে। কেন্দ্রটি জানিয়েছে, গত তিন দিনে চট্টগ্রামে ৪১৭ মিলিমিটার, কক্সবাজারে ২৩২ মিলিমিটার এবং বান্দরবানের লামায় ৩৩৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
আবহাওয়া সংস্থাগুলোর তথ্যের ভিত্তিতে বাপাউবো পূর্বাভাস দিয়েছে যে, আগামী তিন দিনে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোণা ও শেরপুর এবং এর সংলগ্ন অঞ্চলে সর্বোচ্চ ২০০ থেকে ৩৫০ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টিপাত হতে পারে। উত্তরাঞ্চলের নীলফামারী, লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রাম জেলায় ১৫০ থেকে ২০০ মিলিমিটার এবং দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের বান্দরবান, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, ফেনী, লক্ষ্মীপুর ও নোয়াখালীতে ৫০ থেকে ১৫০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে।
এই বিপুল পরিমাণ বৃষ্টিপাতের কারণে আগামী ৪৮ ঘণ্টায় দেশের বিভিন্ন নদ-নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাবে। উত্তরাঞ্চলের তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমা অতিক্রম করতে পারে। উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সুরমা-কুশিয়ারা, সারিগোয়াইন, যাদুকাটা, সোমেশ্বরী এবং ভুগাই-কংস নদীর পানি বেড়ে সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোণা, শেরপুর ও ময়মনসিংহ জেলার নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদী বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। বিশেষ করে সিলেট ও সুনামগঞ্জে কুশিয়ারা নদী সংলগ্ন বন্যাক্রান্ত এলাকাগুলোতে পরিস্থিতির আরও কিছুটা অবনতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অন্যদিকে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে ফেনী জেলার মুহুরী ও সেলোনিয়া নদীর পানি বেড়ে যাওয়ায় নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুর জেলার কিছু নিম্নাঞ্চল সাময়িকভাবে প্লাবিত হতে পারে।
সার্বিক অবনতির আশঙ্কার মধ্যেও কিছু এলাকায় পরিস্থিতির উন্নতির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় হালদা, সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীর পানি হ্রাস পেয়েছে। আগামী ২৪ ঘণ্টায় বান্দরবান, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলায় সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীর পানি আরও কমতে পারে এবং সংশ্লিষ্ট নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে। মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলার মনু ও খোয়াই নদীর পানিও হ্রাস পাচ্ছে, যা আগামী ২৪ ঘণ্টায় ধীর গতিতে অব্যাহত থাকতে পারে।
তবে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের এই সরকারি নথিতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের ঘাটতি পরিলক্ষিত হয়েছে। নথিতে নদ-নদীর পানি ও বৃষ্টিপাতের কারিগরি পরিসংখ্যান বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলেও, সাধারণ মানুষ বা অর্থনীতির ওপর এর সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কে কোনো বিশ্লেষণ নেই। বিপৎসীমার ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হওয়ার কারণে ইতিমধ্যে কত মানুষ পানিবন্দী হয়েছেন, কৃষিখাতে কী ধরনের ক্ষতি হতে পারে বা যোগাযোগ ব্যবস্থা কতটা ব্যাহত হতে পারে—তার কোনো চিত্র এই প্রতিবেদনে অনুপস্থিত।
এছাড়া, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার স্থানীয় প্রশাসন বা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে পরিস্থিতি মোকাবিলায় কী ধরনের প্রস্তুতি নিতে হবে, সে বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনাও দেওয়া হয়নি। প্রতিবেদনটি মূলত পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনার প্রযুক্তিগত দলিলেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে।
সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় আগামী ৪৮ ঘণ্টা দেশের বন্যাকবলিত ও ঝুঁকিপূর্ণ জেলাগুলোর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উজানের পাহাড়ি ঢল এবং দেশের অভ্যন্তরে ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে পূর্বাভাস অনুযায়ী নদীগুলোর পানি বৃদ্ধি পেলে তা জনজীবনে বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। সম্ভাব্য ঝুঁকি এড়াতে ঝুঁকিপূর্ণ আটটি জেলার প্রশাসনকে এখন থেকেই আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখাসহ প্রয়োজনীয় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
জৈন্তাবার্তা/আরআর




