সালমান শাহর মৃ*ত্যু: তিন দশক পর ফের তো*লপাড়, কি মিলবে উত্তর?
সোমবার, ১০ অগাস্ট ২০২৬, ০৩:২৮ AM

৩০ বছর পর গ্রেপ্তার ডন, এবার কি বের হবে আসল সত্য?

সালমান শাহর মৃ*ত্যু: তিন দশক পর ফের তো*লপাড়, কি মিলবে উত্তর?

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১০/০৮/২০২৬ ০১:৫০:৩৩ AM

সালমান শাহর মৃ*ত্যু: তিন দশক পর ফের তো*লপাড়, কি মিলবে উত্তর?

ছবি:সংগৃহীত


১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর। মাত্র ২৫ বছর বয়সে জনপ্রিয় চিত্রনায়ক সালমান শাহর আকস্মিক মৃত্যু স্তব্ধ করে দিয়েছিল পুরো দেশের চলচ্চিত্র অঙ্গনকে। রাজধানীর ইস্কাটনের বাসা থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধারের পর ঘটনাটি প্রথমে অপমৃত্যু হিসেবে নথিভুক্ত হলেও শুরু থেকেই এটি নিয়ে নানা প্রশ্ন ও সন্দেহ ছিল পরিবারের।

প্রায় তিন দশক পর সেই পুরোনো রহস্য আবারও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনায় করা হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছেন চলচ্চিত্রের খল অভিনেতা আশরাফুল হক ওরফে ডন। দীর্ঘদিন বিদেশে অবস্থান করা ডনকে সৌদি আরব যাওয়ার সময় ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে আটক করা হয়। পরে তাঁকে মামলার তদন্তকারী সংস্থা পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগে (সিআইডি) হস্তান্তর করা হয়।

ডনকে আদালতে হাজির করে কারাগারে পাঠানোর আবেদন করে সিআইডি। তদন্ত কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, মামলায় সালমান শাহকে পূর্বপরিকল্পিতভাবে হত্যার অভিযোগ রয়েছে এবং ডন দীর্ঘদিন ধরে পলাতক ছিলেন। তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করে ঘটনার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়ার চেষ্টা চলছে।

যে মৃত্যু আজও প্রশ্নবিদ্ধ

সিলেটের জকিগঞ্জে ১৯৭১ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর জন্ম নেওয়া সালমান শাহর পারিবারিক নাম চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার ইমন। অল্প সময়ের অভিনয়জীবনেই তিনি ঢাকাই চলচ্চিত্রে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। ২৫ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু বাংলা চলচ্চিত্রে তৈরি করে এক অপূরণীয় শূন্যতা।

মৃত্যুর পর তাঁর বাবা কমর উদ্দিন আহমদ চৌধুরী একটি অপমৃত্যুর মামলা করেছিলেন। তবে পরিবারের দাবি ছিল, সালমান শাহ আত্মহত্যা করেননি; তাঁকে হত্যা করা হয়েছে। তাঁর মা নীলা চৌধুরী দীর্ঘদিন ধরে এ দাবিতে আইনি লড়াই চালিয়ে আসছেন।

পরবর্তী সময়ে একাধিক তদন্তে সালমান শাহর মৃত্যুকে আত্মহত্যা হিসেবে উল্লেখ করা হলেও পরিবারের আপত্তি অব্যাহত থাকে। শেষ পর্যন্ত আদালতের নির্দেশে ২০২৫ সালের ২০ অক্টোবর মৃত্যুর ঘটনায় হত্যা মামলা করার নির্দেশ দেওয়া হয়। পরদিন রমনা থানায় মামলাটি দায়ের করা হয়।

মামলায় সালমান শাহর স্ত্রী সামিরা হকসহ ১১ জনকে আসামি করা হয়েছে। অন্য আসামিদের মধ্যে রয়েছেন সামিরার মা লতিফা হক লুসি, ব্যবসায়ী আজিজ মোহাম্মদ ভাই, ডেভিড, জাভেদ, ফারুক, রুবী, আব্দুস ছাত্তার, সাজু এবং রেজভি আহমেদ ওরফে ফরহাদ।

‘১২ লাখ টাকার চুক্তিতে হত্যার’ অভিযোগ

মামলার শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী দাবি করেন, সালমান শাহর ছোট ভাইকে অপহরণের চেষ্টা সংক্রান্ত ১৯৯৭ সালের একটি মামলায় রেজভি আহমেদ ওরফে ফরহাদের দেওয়া বক্তব্যে চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছিল।

রাষ্ট্রপক্ষের দাবি, ওই বক্তব্যে সালমান শাহর স্ত্রী সামিরা হকের সঙ্গে ডনের সম্পর্কের কথা উল্লেখ করা হয়। একই সঙ্গে ডন, ফারুক ও রেজভির বিরুদ্ধে ১২ লাখ টাকার বিনিময়ে সালমান শাহকে হত্যার অভিযোগের কথাও বলা হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রথমে সালমান শাহকে অচেতন করা হয় এবং পরে ঘটনাটিকে আত্মহত্যা হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হয়।

তবে এসব অভিযোগ এখনো আদালতে প্রমাণিত নয়। মামলাটির তদন্ত চলছে এবং তদন্ত শেষে প্রকৃত ঘটনা সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যাবে।

মৃত্যুর আগের রাতেও ছিল উত্তেজনা

সালমান শাহর মৃত্যুর আগের দিন, ৫ সেপ্টেম্বর তিনি ‘প্রেমপিয়াসী’ চলচ্চিত্রের ডাবিং করতে এফডিসিতে গিয়েছিলেন। সেখানে ছবিটির নায়িকা শাবনূরও উপস্থিত ছিলেন।

পারিবারিক ও বিভিন্ন সূত্রের বর্ণনা অনুযায়ী, এফডিসিতে সালমান ও শাবনূরকে একসঙ্গে দেখে তাঁর স্ত্রী সামিরা অসন্তুষ্ট হন। পরে সালমান, সামিরা ও পরিচালক বাদল খন্দকার একই গাড়িতে ফেরেন। ওই রাতে সালমানকে নিউ ইস্কাটনের বাসায় পৌঁছে দেওয়া হয়।

পরদিন সকালে তাঁর বাসা থেকেই মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

সেই সকালেও ছিল নানা প্রশ্ন

৬ সেপ্টেম্বর সকালে সালমানের বাবা ছেলের সঙ্গে দেখা করতে ইস্কাটনের বাসায় যান। পরে পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, তাঁকে বিভিন্ন কারণে ছেলের সঙ্গে দেখা করতে বাধা দেওয়া হয়েছিল।

বেলা বাড়ার পর সালমানের পরিবারের কাছে তাঁর অসুস্থতার খবর পৌঁছায়। তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা মৃত ঘোষণা করেন। পরে ময়নাতদন্তে মৃত্যুকে আত্মহত্যা হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

কিন্তু সালমানের মা নীলা চৌধুরী শুরু থেকেই এই সিদ্ধান্ত মেনে নেননি। তাঁর অভিযোগ ছিল, ছেলেকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করে আত্মহত্যার ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

একের পর এক তদন্ত, তবুও কাটেনি রহস্য

সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনায় ১৯৯৭ সালে সিআইডি তদন্ত শেষে আত্মহত্যার কথা উল্লেখ করে প্রতিবেদন দেয়। এরপর বিষয়টি বিচার বিভাগীয় তদন্তে যায়। ২০১৪ সালের তদন্ত প্রতিবেদনেও মৃত্যুকে অপমৃত্যু হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

২০১৬ সালে আদালত পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) তদন্তের নির্দেশ দেন। দীর্ঘ তদন্ত শেষে ২০২০ সালে পিবিআই প্রায় ৬০০ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন দাখিল করে। সেখানেও বলা হয়, সালমান শাহ আত্মহত্যা করেছেন।

পরিবার ওই প্রতিবেদনেও আপত্তি জানায় এবং নারাজি আবেদন করে। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর অবশেষে হত্যা মামলা করার পথ খুলে যায়।

এবার কি মিলবে সেই উত্তর?

ডন গ্রেপ্তারের পর সালমান শাহর মৃত্যু নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। পরিবারের প্রত্যাশা, এবার নিরপেক্ষ ও গভীর তদন্তের মাধ্যমে প্রায় তিন দশকের রহস্যের অবসান হবে।

সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরী ডন গ্রেপ্তারে সন্তোষ প্রকাশ করে বলেছেন, এই মামলায় আরও যারা জড়িত, তদন্তের মাধ্যমে তাদেরও শনাক্ত করা সম্ভব হবে। তিনি ছেলের মৃত্যুর ঘটনায় জড়িতদের বিচার দাবি করেছেন।

তবে সালমান শাহর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ-আত্মহত্যা নাকি হত্যাকাণ্ড-এখনো আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের বিষয়। নতুন হত্যা মামলার তদন্ত এবং আদালতের পরবর্তী কার্যক্রমই বলে দেবে, দীর্ঘদিনের এই রহস্যের শেষ পর্যন্ত কী উত্তর মেলে।

জৈন্তা বার্তা/ ওয়াদুদ



শীর্ষ সংবাদ: