বিশ্ব বাঁশ দিবস আজ
শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:৫১ PM

পরিবেশ থেকে অর্থনীতি, সম্ভাবনার নতুন দুয়ার

বিশ্ব বাঁশ দিবস আজ

জৈন্তা বার্তা ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৮/০৯/২০২৬ ০৬:০০:০১ PM

বিশ্ব বাঁশ দিবস আজ

সংগৃহিত


বাংলায় ‘বাঁশ দেওয়া’ কথাটির অর্থ কাউকে বিপদে ফেলা, ক্ষতি করা, ঠকানো কিংবা কোনো কাজে বড় ধরনের বাধা সৃষ্টি করা। তবে বাঁশ শুধু এমন নেতিবাচক অর্থের সঙ্গে যুক্ত নয়। পরিবেশ, নির্মাণ, কুটিরশিল্প, খাদ্য, জ্বালানি ও অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে এই উদ্ভিদের।

প্রতিবছর ১৮ সেপ্টেম্বর বিশ্ব বাঁশ দিবস পালিত হয়। ২০১০ সাল থেকে দিবসটি পালন করে আসছে ওয়ার্ল্ড ব্যাম্বু অর্গানাইজেশন (ডব্লিউবিও)। বাঁশ সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি এবং এর বহুমুখী ব্যবহার ও সম্ভাবনা তুলে ধরাই দিবসটির অন্যতম উদ্দেশ্য।

যেভাবে শুরু

২০০৯ সালে থাইল্যান্ডের ব্যাংককে অনুষ্ঠিত অষ্টম ওয়ার্ল্ড ব্যাম্বু কংগ্রেস থেকে বিশ্ব বাঁশ দিবসের সূচনা হয়। ওই কংগ্রেস আয়োজনে দেশটির রয়্যাল ফরেস্ট ডিপার্টমেন্ট সহায়তা করেছিল।

বিশ্ব বাঁশ কংগ্রেস গবেষক, উদ্যোক্তা ও বিশেষজ্ঞদের একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সম্মেলন। ১৯৮৪ সালে পুয়ের্তো রিকোতে প্রথমবার এ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।

১৯৯২ সালে জাপানের মিনামাতায় অনুষ্ঠিত তৃতীয় কংগ্রেসে ইন্টারন্যাশনাল ব্যাম্বু অ্যাসোসিয়েশন প্রতিষ্ঠিত হয়। পরে ২০০৪ সালে ভারতের নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ কংগ্রেসে সংগঠনটি ওয়ার্ল্ড ব্যাম্বু অর্গানাইজেশনে (ডব্লিউবিও) রূপান্তরিত হয়। ২০০৫ সালে ডব্লিউবিও আইনগতভাবে সংগঠন হিসেবে যাত্রা শুরু করে।

বিশ্ব বাঁশ দিবস জাতিসংঘ ঘোষিত কোনো আন্তর্জাতিক দিবস নয়। ডব্লিউবিওর উদ্যোগে এটি বিভিন্ন দেশে পালিত হয়। এ উপলক্ষে বাঁশ রোপণ, কর্মশালা, প্রদর্শনী, গবেষণা ও স্থানীয় পর্যায়ে নানা কর্মসূচি আয়োজন করা হয়।

২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য

২০২৬ সালের বিশ্ব বাঁশ দিবসের বার্তা ‘ব্যাম্বু বিয়ন্ড বর্ডারস’ বা ‘সীমানা ছাড়িয়ে বাঁশ’। এবারের আয়োজনে শুধু বাঁশ রোপণ নয়, পরিবেশের স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও শিল্পায়নে বাঁশের সম্ভাবনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

গ্রাম থেকে শহর, কৃষিজমি থেকে কারখানা এবং আধুনিক স্থাপত্য—বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাঁশকে সম্পদ হিসেবে ব্যবহারের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।

জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশের অবক্ষয় ও টেকসই উন্নয়নের আলোচনাতেও বাঁশ নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। বাঁশের শিকড় মাটির নিচে ঘন জালের মতো কাঠামো তৈরি করে, যা মাটির ক্ষয় কমাতে এবং মাটির গুণমান ধরে রাখতে সহায়তা করতে পারে। একই সঙ্গে শিকড়ের এই কাঠামো পানি প্রবাহের সময় কিছু ক্ষতিকর উপাদান আটকে রাখতেও ভূমিকা রাখতে পারে। তবে বাঁশের প্রজাতি, পরিবেশ ও ব্যবস্থাপনার ধরন অনুযায়ী এর প্রভাব ভিন্ন হতে পারে।

জলবায়ু সুরক্ষায় কতটা কার্যকর বাঁশ

বাঁশ দ্রুত বেড়ে ওঠে এবং বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন গ্রহণ করে নিজের দেহে তা জমা রাখে। তবে বাঁশ কেটে পুড়িয়ে ফেললে সেই কার্বন আবার বায়ুমণ্ডলে ফিরে যেতে পারে।

২০২৫ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বাঁশের সম্ভাবনা থাকলেও শুধু কতগুলো বাঁশ লাগানো হয়েছে, সেটিই মূল বিষয় নয়। বাঁশ কীভাবে উৎপাদন, সংগ্রহ, প্রক্রিয়াজাত ও ব্যবহার করা হচ্ছে, তার ওপরও পরিবেশগত সুফল নির্ভর করে।

গবেষকেরা এ বিষয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজনীয়তার কথাও জানিয়েছেন।

বাড়ছে বাঁশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা

বাঁশের ব্যবহার এখন আর শুধু কুটিরশিল্পে সীমাবদ্ধ নেই। নির্মাণ, আসবাব, প্রকৌশলজাত পণ্য, বস্ত্র, কাগজ, খাদ্য ও জ্বালানির পাশাপাশি বিভিন্ন জৈবভিত্তিক প্রযুক্তিতেও বাঁশ ব্যবহারের সম্ভাবনা নিয়ে কাজ হচ্ছে।

নির্মাণকাজে বাঁশের ব্যবহার বাড়লেও এর স্থায়িত্ব ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুকানো, সংরক্ষণ, সংযোগব্যবস্থা, অগ্নিনিরাপত্তা এবং গুণগত মান নিয়ন্ত্রণ জরুরি। এজন্য প্রকৌশলগত উন্নয়ন ও নির্দিষ্ট মানদণ্ড অনুসরণ প্রয়োজন।

বাংলাদেশেও কাঠের বিকল্প হিসেবে বাঁশ ব্যবহারের বিষয়ে গবেষণা হয়েছে। বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএফআরআই) ২০০৫ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত বাঁশের কম্পোজিট দিয়ে আসবাব তৈরির প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করেছে। পরবর্তী সময়ে ২০১৫ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত এ প্রযুক্তির নকশা উন্নয়ন ও প্রসারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

উৎপাদকেরা কতটা লাভবান

বাঁশভিত্তিক অর্থনীতিতে কৃষক, কারুশিল্পী, প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী, উদ্যোক্তা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ভূমিকা রয়েছে। ফলে এ খাতের বিকাশে স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ ও ন্যায্য সুবিধা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।

ভিয়েতনামে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) একটি প্রকল্পে বাঁশচাষি নারীরা সমবায়ের মাধ্যমে উৎপাদন ব্যয় ভাগাভাগি, পণ্য বিক্রি ও প্রশিক্ষণের সুযোগ পেয়েছেন। সেখানে বাঁশ স্থানীয় মানুষের আয়ের উৎস হওয়ার পাশাপাশি ভূমি পুনরুদ্ধারেও ভূমিকা রাখছে।

অর্থাৎ বাঁশের ভবিষ্যৎ শুধু কত টন উৎপাদিত হবে, তার ওপর নির্ভর করবে না। কে উৎপাদন করবে, কে প্রক্রিয়াজাত করবে, কে পণ্য তৈরি করবে এবং পুরো প্রক্রিয়ায় কারা কতটা লাভবান হবে—এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশে বাঁশের ব্যবহার

বাংলাদেশে বাঁশের ব্যবহার বহু পুরোনো। ঘরবাড়ি, বেড়া, সাঁকো, কৃষিকাজের সরঞ্জাম, মাছ ধরার উপকরণ, ঝুড়ি, কুলা, ডালা ও বিভিন্ন ধরনের কারুশিল্পে বাঁশের ব্যবহার রয়েছে।

দেশে বাঁশের ঐতিহ্যকে আধুনিক প্রযুক্তি ও বাজারের সঙ্গে যুক্ত করা গেলে নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউট দীর্ঘদিন ধরে বাঁশের বিভিন্ন প্রজাতি, সংরক্ষণ, চাষ ও ব্যবহার নিয়ে গবেষণা করছে। চট্টগ্রামের ষোলশহরে বিএফআরআই ক্যাম্পাসে ৩৬ প্রজাতির বাঁশ সংরক্ষিত রয়েছে।

বাঁশের তৈরি কম্পোজিট বোর্ড ও আসবাব নিয়েও দেশে গবেষণা হয়েছে। এসব গবেষণায় কাঠের বিকল্প হিসেবে বাঁশ ব্যবহারের সম্ভাবনা দেখা গেছে।

তবে দেশে বাঁশের সরবরাহ কমে যাওয়ার বিষয়েও উদ্বেগ রয়েছে। ২০১৮ সালের একটি প্রতিবেদনে জমি পরিষ্কার, বাঁশের স্থানীয় মূল্য কমে যাওয়া এবং ব্যাপকভাবে ফুল ধরার মতো বিভিন্ন কারণের কথা উল্লেখ করা হয়। একই সময়ে নির্মাণসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাঁশের চাহিদা রয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।

ফলে বাঁশের ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি এর টেকসই উৎপাদন, প্রজাতি সংরক্ষণ ও সঠিক ব্যবস্থাপনার দিকেও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

তথ্যসূত্র: ওয়ার্ল্ড ব্যাম্বু অর্গানাইজেশন, ওয়ার্ল্ডব্যাম্বুডটনেট, বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউট, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এবং বাঁশবিষয়ক বিভিন্ন গবেষণা প্রতিবেদন।

জৈন্তা বর্তা / ওয়াদুদ