শাবিতে হাজার কোটি টাকার প্রকল্পে অনিয়ম
বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৫৭ AM

হেলে পড়েছে দেয়াল - একাধিক গভীর ফাটল

শাবিতে হাজার কোটি টাকার প্রকল্পে অনিয়ম

ইমরান হোসেন রানা, শাবিপ্রবি প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ০৭/১০/২০২৬ ১১:৫১:৫৭ PM

শাবিতে হাজার কোটি  টাকার প্রকল্পে অনিয়ম

ছবি:সংগৃহীত


সিলেট অঞ্চলের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (শাবি) প্রতিষ্ঠার পর থেকে ধাপে ধাপে অবকাঠামোগত উন্নয়ন করা হয়েছে। অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্প-১-এর আওতায় অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি সম্প্রতি অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্প-২-এর আওতায় বেশ কিছু প্রকল্প চলমান রয়েছে। এ প্রকল্পে বরাদ্দ প্রায় হাজার কোটি টাকা। তবে অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্প-২-এর আওতায় নির্মাণাধীন ভবনে বিভিন্ন অনিয়ম ও নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার নিয়ে অনিয়মের সত্যতা পাওয়া গেছে।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্প-১-এর আওতায় প্রায় ২৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সমাজবিজ্ঞান ভবনের জরাজীর্ণ অবস্থা। ভবনটি নির্মাণের দায়িত্ব পায় মেরিনা কনস্ট্রাকশন অ্যাসোসিয়েটস ও দ্য বিল্ডার্স ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যাসোসিয়েটস লিমিটেড। ২০২০ সালে শুরু হওয়া কাজ শেষ করে ২০২৪ সালের ৩০ জুন ভবনটি হস্তান্তর করা হয়। তবে উদ্বোধনের এক বছরের মধ্যেই ভবনটি জরাজীর্ণ হয়ে যায়। দৃষ্টিনন্দন এই ভবনে নিচতলা থেকে পাঁচতলা পর্যন্ত দেয়াল ও বিমে অন্তত ২০টির বেশি ফাটল রয়েছে। বিশেষ করে গত নভেম্বরের ভূমিকম্পের পর দক্ষিণ-পশ্চিম কোণের বিমে বড় ধরনের ফাটল দেখা দেয়।

এ ছাড়া ইউনিভার্সিটি সেন্টার (ইউসি) ভবনের অবস্থা নাজুক। উদ্বোধনের মাত্র ১৫ বছরের মধ্যেই ভবনটি দৃশ্যমানভাবে হেলে পড়েছে এবং ভবনের দেয়ালে একাধিক গভীর ফাটল ধরা পড়েছে। দুই তলা ভবনটি স্পষ্টভাবে পশ্চিম দিকে হেলে পড়েছে। কয়েকটি দেয়ালে লম্বা তির্যক ফাটল চলে গেছে। ভেতরে প্রবেশ করতেই দেয়ালের চেরা দাগ চোখে পড়ে। এসব চিহ্ন ভবনের কাঠামোগত দুর্বলতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্প-১-এর আওতায় নির্মাণকৃত সমাজবিজ্ঞান ভবনে ঝুঁকি নিয়ে প্রতিদিন প্রায় এক হাজার শিক্ষক-শিক্ষার্থী যাতায়াত করেন। অন্যদিকে ইউসি ভবনটিতে বিভিন্ন ধরনের সাংস্কৃতিক সংগঠনের কক্ষ, প্রক্টর অফিস, ছাত্র উপদেশ ও নির্দেশনা দফতরের অফিস ও ব্যাংকসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ সংগঠনের কক্ষ রয়েছে। এসব সংগঠনের বিভিন্ন ধরনের মিটিংসহ অফিস ও দফতরে নিয়মিত যাতায়াত করতে হয় শিক্ষার্থীদের।

স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে, নির্মাণের অল্প দিনেই কেন এই ভবনগুলো ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে পরিণত হলো? যদি এসব ভবনে অবস্থানরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কোনো অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটে, তাহলে এর দায় কে নেবে? এসব ভবন নির্মাণে অনিয়ম থেকে কী শিক্ষা নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন?

অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্প-২ এর আওতায় নির্মাণাধীন ভবন নিয়ে বিভিন্ন অনিয়ম দেখা গেছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান দেশ উন্নয়ন করপোরেশনের নির্মাণাধীন ৫৩ কোটি টাকার চুক্তিতে ১০ তলা প্রশাসনিক ভবন নির্মাণে দেখা যায় বিভিন্ন অনিয়ম। নির্মাণসামগ্রী রাখার স্থানে বেশ কয়েকটি মেয়াদোত্তীর্ণ সিমেন্টের বস্তা রয়েছে। এসব সিমেন্টের কোনো কোনোটির মেয়াদ গত বছরের এপ্রিল, সেপ্টেম্বর ও ডিসেম্বরেই শেষ হয়ে গেছে। আবার কিছু সিমেন্টের মেয়াদ চলতি বছরের জানুয়ারিতে শেষ হলেও সেগুলো ব্যবহার করা হচ্ছে। আরও দেখা যায়, ভবন নির্মাণে এসএএস (শফিউল আলম স্টিল) কোম্পানির রড ব্যবহার করা হচ্ছে। উইকিপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৪০টি রড উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ ১০টির মধ্যে এসএএসের নাম নেই।

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জামাল কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেডের আওতায় নির্মাণাধীন ৭৯ কোটি টাকার দুটি ভবনেও বেশ কিছু অনিয়ম পরিলক্ষিত হয়। কাদা মিশ্রিত বালু ও নিম্নমানের পাথর ব্যবহার হচ্ছে ৩৫ কোটি টাকার ক্লাব কমপ্লেক্সে। এমনকি ব্যবহৃত রড ঔঝজগ ও উইকিপিডিয়ায় পাওয়া তথ্যমতে দেশে শীর্ষ ১০-এ নেই।

অন্যদিকে ৪৪ কোটি টাকায় নির্মাণাধীন বিদেশি শিক্ষার্থীদের হোস্টেলেও একই চিত্র। এখানেও ব্যবহার হচ্ছে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী। এই ভবন নির্মাণে ব্যবহৃত হচ্ছে ঝঈজগ স্টিল, যা চডউ ঝড়ঈ ভড়ৎ ঈরারষ ডড়ৎশ ২০১৮ অনুযায়ী অনুমোদনহীন। এমনকি চডউ ঝড়ঈ ভড়ৎ ঈরারষ ডড়ৎশ ২০২২ অনুযায়ী ঝঈজগ সিমেন্ট তালিকাভুক্ত নেই।

সিভিল অ্যান্ড পুর প্রকৌশল বিভাগের এক শিক্ষার্থী বলেন, “নির্মাণকাজে ব্যবহৃত ঔঝজগ, ঐর-ঞবপয জবনধৎ এবং ঞরমবৎ ঈবসবহঃ-এর গুণগত মান ও অনুমোদনসংক্রান্ত বিষয়েও যথাযথ নথিপত্র ও ল্যাব টেস্ট রিপোর্ট যাচাই করা প্রয়োজন। বিশেষ করে চডউ-এর প্রকল্পে কোনো নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের রড ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ল্যাবরেটরি পরীক্ষার মাধ্যমে নির্ধারিত ংঃৎবহমঃয ংঢ়বপরভরপধঃরড়হ পূরণ করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের ক্ষেত্রে ঔঝজগ রড ব্যবহারের অনুমোদনের সমর্থনে প্রয়োজনীয় ল্যাব টেস্ট রিপোর্ট পাওয়া গেছে কি না, তা স্পষ্ট নয়। একইভাবে, ঐর-ঞবপয ঝঃববষ স্থানীয় বাজারে প্রচলিত হলেও চডউ-এর ঈবহঃৎধষ অ-এৎধফব প্রক্রিয়ায় সরাসরি তালিকাভুক্ত ব্র্যান্ডগুলোর মধ্যে এটি রয়েছে কি না, তা সংশ্লিষ্ট অনুমোদনপত্র ও সরকারি তালিকা যাচাই করে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। শাবিতে চলমান মেগা প্রজেক্টে অর্থাৎ সিলেটের মত ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে এই ধরনের ম্যাটেরিয়ালস কতটা উপযুক্ত, তা খতিয়ে দেখা দরকার।”

এসব অনিয়ম ও নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. খাইরুল ইসলাম, উপ-উপাচার্য অধ্যাপক রবিউল ইসলাম ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রকৌশলী জয়নাল ইসলাম চৌধুরীকে ইতোপূর্বে অবহিত করা হয়। মেয়াদোত্তীর্ণ সিমেন্টের ছবি দেখানো হলে প্রধান প্রকৌশলী জয়নাল ইসলাম চৌধুরী জানান, তিনি হোয়াটসঅ্যাপ চেক করতে পারবেন না। নির্মাণকাজের সাইটে বিভিন্ন ধরনের মাটি ও বালু থাকতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

নিম্নমানের রড ও সিমেন্ট ব্যবহারের বিষয়ে জানতে চাইলে জয়নাল ইসলাম চৌধুরী বলেন, “চডউ স্ট্যান্ডার্ড হলে ১০ নম্বর না ১২ নম্বর এগুলো নিয়ে আমাদের কোনো প্রশ্ন নেই।”

অনিয়ম ও দুর্নীতি ঠেকাতে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, এ বিষয়ে জানতে চাইলে উপাচার্য অধ্যাপক ড. খাইরুল ইসলাম বলেন, “আমরা একটি তদন্ত কমিটি করব চিন্তা করেছি। আমরা যাদের দায়িত্ব দিয়েছি তাদের সঙ্গে বসে মিটিং করব।”

তিনি আরও বলেন, “এই কাজ তো আমার দায়িত্বে শুরু হয়নি। যেহেতু বিষয়টা সামনে এসেছে, এরপরেও আমরা দেখব কী করা যায়। টেকনিক্যাল ডিপার্টমেন্টের যারা আছে তাদের সঙ্গে কথা বলছি।”

সিভিল অ্যান্ড পুর প্রকৌশল বিভাগের একটি প্রতিনিধি দলের বরাতে জানা যায়, তাদের প্রতিনিধিদের দ্বারা সাইটগুলো পরিদর্শন করে দেখা গেছে যে সাইটগুলোতে পর্যাপ্ত ও নিয়মিত মনিটরিং না থাকায় ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান প্রয়োজনীয় কারিগরি তদারকি ছাড়াই শুধুমাত্র শ্রমিকনির্ভরভাবে নিজেদের ইচ্ছামতো নির্মাণকাজ পরিচালনা করেছে। এমনকি প্রতিকূল আবহাওয়া ও বৃষ্টির মধ্যেও পাইলিংয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ চালিয়ে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে, যা নির্মাণকাজের গুণগত মান ও কার্যক্রমের যথাযথ তদারকি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে। এ ছাড়া সাইট পরিদর্শনের সময় দেখা গেছে, রডের স্পেসিং এবং স্টিরাপের স্পেসিংয়ের ক্ষেত্রে অনুমোদিত নকশা ও প্রকৌশলগত নির্দেশনা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি বলে মনে হয়েছে। প্রয়োজনীয় প্রকৌশলী ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিয়মিত তদারকির ঘাটতির কারণে এ ধরনের বিচ্যুতি ঘটেছে কি না, তা যথাযথভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন।

এর আগে অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্প-১-এর একটি ভবন ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এত অনিয়মের পর নির্মাণাধীন অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্প-২-এর ভবনগুলো কতদিন সগৌরবে দাঁড়িয়ে থাকে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।


জৈন্তা বার্তা/ ওয়াদুদ