ছবি:নিজস্ব
সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার অতি পরিচিত ও জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র হচ্ছে ডিবির হাওড় লাল শাপলা বিল। এই বিলে আগত পর্যটকদের কথা চিন্তা করে জৈন্তা ফটোগ্রাফি সোসাইটি বেশ কয়েক বছর আগে বাস্তবায়ন করে সামাজিক বনায়ন।
সরজমিনে জৈন্তাপুর উপজেলার ডিবিরহাওড় লাল শাপলা বিল ঘুরে দেখা যায় ব্যতিক্রম চিত্র । সীমান্তঘেঁষা পর্যটনস্পট খ্যাত জৈন্তাপুর লাল শাপলা বিল।
২০১৭ সালে বিলটি প্রথমে স্থানীয় জাতীয় ও বেসরকারি টেলিভিশনে ডিবিরহাওর এলাকার ৪টি বিল নিয়ে স্বচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তার পর হতে লাল শাপলা বিলের পরিচিতি দেশের গন্ডি পেরিয়ে বিদেশি পর্যটকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। কিন্তু লাল শাপলা বিলে আগত পর্যটকরা বেশি সময় শাপলার সৌন্দর্য্য উপভোগ করতে পারতেন না। কারন বিলের মধ্যে ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহনের জন্য ছিলো না কোন গাছ-গাছালী। তাই পর্যটকরা দ্রুত বিলটির সৌন্দর্য্য উপভোগ করে চলে যেতেন।
পর্যটকদের তীক্ত অভিজ্ঞতার কথা বিলের সবুজয়ানে উদ্যোগী হউন স্হানীয় সংবাদকর্মী মো. রেজওয়ান করিম সাব্বির ও ইমরান আহমদ সরকারি মহিলা ডিগ্রী কলেজের সহকারি অধ্যাপক মো. খাইরুল ইসলাম। প্রাথমিক ভাবে তারা বিলে পর্যটকদের ছায়া সৃষ্টির কথা চিন্তা করেন। পরে বিষয়টি নিয়ে আরও দুই বৃক্ষপ্রেমী তৎকালীন সোনালী ব্যাংক জৈন্তাপুর শাখার ব্যবস্থাপক সদরুল আলম ও পরিবেশ কর্মী নিজপাট তোয়াসীহাটি নিবাসী ফনিলাল দের সাথে ফলপ্রসূ আলোচনা করেন।
আলোচনায় বৃক্ষ সংগ্রহের মাধ্যমে ডিবির হাওর লাল শাপলা বিলের রাস্তায় ছায়া সৃষ্টি ও সবুজায়নের উদ্যোগ নেন তারা।
শুরুতে জৈন্তাপুর মডেল থানার তৎকালীন অফিসার ইনচার্জ (ওসি) শ্যামল বনিকের দারস্ত হন বৃক্ষ সংগ্রহের জন্য। ওসি বিষয়টি মনযোগ সহকারে শুনেন এবং ১০১ টি নানাবিদ বৃক্ষের চারা সহ রোপন খরচাদি প্রদান করে আনুষ্ঠানিক বৃক্ষ রোপন কার্যক্রম এর উদ্বোধন করেন।
এভাবে ক্রমান্বয়ে লাল শাপলা বিলের জনসাধারণের জন্য চলাচলের রাস্তার দুপাশে বৃক্ষের চারা রোপন কার্যক্রম শুরু হয়। পরবর্তীতে জৈন্তাপুর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার সালাহ উদ্দিন মানিকের সহায়তায় তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নুসরাত আজমেরী হক বৃক্ষ রোপনের জন্য ৫০ হাজার টাকা বরাদ্ধ দেন এবং সেই সাথে উপজেলা পরিষদের সমন্বয় সভায় আলোচনার মাধ্যমে পুরো বিল এলাকার ৫টি স্থান চিহ্নিত করে তরুছায়া প্রকল্প নামে সামাজিক বনায়ন করতে সাংবাদিক মো. রেজওয়ান করিম সাব্বির ও সহকারি অধ্যাপক মো. খায়রুল ইসলাম এর সাথে আলোচনা করে সুনিদিষ্ট শর্তে জৈন্তা ফটোগ্রাফী সোসাইটিকে বৃক্ষ রেপানের জন্য অনুমোদন দেন।
পরবর্তীতে অনুমোদন প্রাপ্তির পর হতে জৈন্তা ফটোগ্রাফী সোসাইটি স্থানীয় গ্রামবাসীর মধ্যে আগ্রহী যুবক, ব্যবসায়ী, মসজিদের ইমাম, শিক্ষক, আগ্রহী বৃক্ষপ্রেমী নারী , স্হানীয় সাংবাদিক, উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা, বন কর্মকর্তা সহ বিভিন্ন শ্রেনী পেশার প্রায় শতাধিক ব্যক্তির উদ্যোগে লাল শাপলা বিল ও বিলের আশ পাশের পরিত্যাক্ত সরকারি খাঁস ভূমিতে নিজেদের অর্থায়নে বিভিন্ন গাছের চারা রোপন করা হয়।
চারার জাত গুলোর মধ্যে বেলজিয়াম, সাদা শিমুল, রেইন্ট্রী, কৃষ্ণচুড়া, অর্জুন, চাকারশি, সোনালো, জারুল, হিজল, কদম, বৃক্ষের প্রায় ১৭ হাজারের অধিক চারা রোপন করা হয়। পরবর্তীতে প্রকৃতিক প্রতিকুল পরিবেশ ও বন্যায় প্রায় ৫ হাজারের অধিক চারা বিনষ্ট হয়। তবুও তরুছায়া প্রকল্পের উদ্যোগতারা তাদের এই বৃক্ষ রোপন কার্যক্রম চলমান রাখেন।
চলতি বৎসরে (২০২৫) জৈন্তাপুর উপজেলা কৃষি অফিসের সহায়তায় ৫০টি তাল গাছের চারা রোপন করা হয়েছে। এছাড়া বর্তমানে জৈন্তাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জর্জ মিত্র চাকমা ও তৎকালীন সিলেটের জেলা প্রশাসক শের মোহাম্মদ মাহবুব মুরাদ এর সার্বিক সহযোগিতায় ৮ হাজার সুপারি বৃক্ষের চারা রোপন করা হয়। এর পাশাপাশি ৪ শত কৃষ্ণচুড়া ও ১ শত হিজল বৃক্ষের চারা রোপন করা হয়। যাহা রোপন পরিচর্যা আর্থিক ব্যায় জৈন্তা ফটোগ্রাফী সোসাইটি নির্বাহ করে আসছে।
তরু ছায়া প্রকল্পে শুধু পর্যটকদের ছায়া নয়, ভবিষ্যতে সেখান থেকে আয়ের পথও খুলবে বলে আশা করছেন উদ্যোক্তারা। সরকার ও বিভিন্নজনের সহায়তায় বিভিন্ন প্রজাতির গাছ লাগানো হয়েছে। এরই মধ্যে কোনো বৃক্ষ উঁকি দিয়েছে, কোনোটি আবার মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে।
শাপলা বিলের রাস্তায় ঢুকতেই চোখে পড়ে তালগাছ, বেলজিয়াম আর সাদা শিমুল, কৃষ্ণচূড়ার চারা। রাস্তার পাশে বিলের মাঝে লাগানো হয়েছে হিজল-জারুল। পূর্বদিকের টিলায় লাগানো হয়েছে সুপারি গাছ। দুই থেকে তিন ফুট পর্যন্ত লম্বা হয়েছে গাছগুলো। উত্তরপাশে বিলের পারে টিলা ভূমিতে লাগানো হয়েছে বেলজিয়াম গাছ। ৩০ একর জায়গা চুক্তিবদ্ধ হলেও বর্তমানে প্রায় ১৮ একর এলাকায় এসব বনজ ও ফলদ গাছ লাগিয়েছেন ফটোগ্রাফির সদস্যরা।
এ প্রকল্পে সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক রেজওয়ান করিম সাব্বির প্রকল্পটি বাস্তবায়নে অগ্রভাগে কাজ করছেন। তিনি জানিয়েছেন, তাদের একশ সদস্য। সবার সহযোগিতায় ভবিষ্যতে বিলের পশ্চিম ও দক্ষিণপারের জমিতে বনায়ন করবেন। তিনি বলেন, ‘আমরা বিলের সৌন্দর্য নিয়ে সব সময় সংবাদ ও ছবি প্রকাশ করি। কিন্তু যারা বিল দেখতে আসেন, তারা ছায়ায় দাঁড়ানোর মতো জায়গা পান না। রোদে দাঁড়িয়ে বিল ও রাজার সমাধি দেখতে হয়। সেই চিন্তা থেকে সরকারের সহায়তায় আমরা প্রকল্প নিই। উপজেলা পরিষদ ও প্রশাসন আমাদের সহযোগিতা করছে।’
সংগঠনের সভাপতি খায়রুল ইসলাম জানিয়েছেন, ২০১৭ সালে মৌখিক অনুমতি নিয়ে বনায়ন শুরু করেন। ২০২১ সালে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে চুক্তি হয়। এরপর নতুন করে গাছ লাগানো হয়। ১৯ হাজার গাছ তারা লাগিয়েছেন। এর মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রায় পাঁচ হাজার। সেখানে আবার নতুন করে গাছ লাগানো হয়েছে। ২০৪৬ সালে তাদের চুক্তির মেয়াদ শেষ হবে। আয় থেকে ২৫ ভাগ উপজেলা পরিষদ, দুটি ইউনিয়ন পরিষদ পাঁচ ভাগ ও উপকারভোগীরা (সোসাইটি) ৭০ ভাগ পাবে। তিনি বলেন বর্তমান সময়ে বনায়ন কিছুটা দৃশ্যমান হয়েছে। এখন থেকে ডিবির হাওড় লাল শাপলা বিলে আগত পর্যটক ও দর্শনার্থীরা লাল শাপলা বিলের সৌন্দর্য উপভোগের পাশাপাশি সবুজের সমারোহ উপভোগ করতে পারবেন।
জৈন্তাবার্তা / সুলতানা




