ছবি:সংগৃহীত
জাতীয় নির্বাচন শেষ হতে না হতেই সিলেট সিটি কর্পোরেশন (সিসিক) নির্বাচন নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে নগরজুড়ে। স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দ্রুত স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের ঘোষণা দেওয়ার পর থেকেই সম্ভাব্য প্রার্থীরা নড়েচড়ে বসেছেন এবং ক্ষমতাসীন দল বিএনপির ভেতরে মেয়র পদে কে মনোনয়ন পাবেন তা নিয়ে শুরু হয়েছে হিসাব-নিকাশ।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সিসিকের মেয়র আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরীসহ কাউন্সিলরদের অপসারণ করা হলে প্রশাসনিক শূন্যতা তৈরি হয় এবং বিভাগীয় কমিশনার অস্থায়ীভাবে প্রশাসকের দায়িত্ব নেন। দীর্ঘ কয়েক মাস আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনায় কার্যক্রম চললেও নাগরিক সেবায় কাক্সিক্ষত গতি ফিরে আসেনি বলে অভিযোগ ওঠে বিভিন্ন মহল থেকে। এ অবস্থায় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে রাজনৈতিক নেতৃত্ব থেকে প্রশাসক নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং জেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরীকে সিসিকের প্রশাসক করা হয়, যা নগর রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করে।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলগমগীর জানিয়েছেন, ঈদের পরপরই ধাপে ধাপে সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে এবং নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে আইনি প্রক্রিয়া মেনে প্রথমে ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটির ভোটগ্রহণ শেষে সিলেটসহ অন্যান্য সিটিতে নির্বাচন হতে পারে, ফলে সম্ভাব্য সময়সূচি ঘিরে সিলেটে রাজনৈতিক তৎপরতা বাড়ছে।
বিএনপির মনোনয়নে টানা দুই মেয়াদে মেয়র থাকা আরিফুল হক চৌধুরী গত জাতীয় নির্বাচনে এমপি নির্বাচিত হয়ে বর্তমানে মন্ত্রীর দায়িত্বে রয়েছেন, ফলে সিসিকের মেয়র পদে এবার নতুন মুখ খুঁজতে হচ্ছে দলটিকে; তবে তাঁর স্ত্রী শ্যামা হক চৌধুরীর নামও আলোচনায় রয়েছে।
একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মিফতাহ সিদ্দিকী, মহানগর বিএনপির সাবেক সভাপতি নাসিম হোসাইন, ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রেজাউল হাসান কয়েস লোদী, সাবেক সম্পাদক আব্দুল কাইয়ুম জালালী পংকী, যুগ্ম-সম্পাদক বদরুজ্জামান সেলিম এবং জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য সচিব শাকিল মুর্শেদ- এমন একাধিক নাম সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে ঘুরছে রাজনৈতিক অঙ্গনে। যদিও দলীয় মনোনয়ন প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়নি, তবু তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত চলছে লবিং-তদবির।
মহানগর বিএনপির সাবেক সভাপতি নাসিম হোসাইন বলেছেন, ‘সিলেট নগরবাসী দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির প্রত্যাশায় আছেন, প্রশাসকের মাধ্যমে সীমিত পরিসরে কাজ এগোলেও জনগণের প্রত্যাশা পূরণ সম্ভব নয়, তাই দ্রুত সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন হওয়া উচিত এবং দল যাকে মনোনয়ন দেবে তার পক্ষেই সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করবেন।’
বিএনপি নেতারা দাবি করছেন, দীর্ঘদিন প্রশাসকের মাধ্যমে পরিচালিত হওয়ায় সিটি কর্পোরেশনের সেবার গতি কমেছে এবং নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি না থাকায় জবাবদিহিতার ঘাটতি তৈরি হয়েছে, তাই দ্রুত নির্বাচন প্রয়োজন; অন্যদিকে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা বজায় রাখা এবং সব পক্ষের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
সিসিকের বর্তমান কাঠামো অনুযায়ী ৪২টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত এই সিটির আয়তন ৭৯.৫০ বর্গকিলোমিটার এবং মোট ভোটার ৫ লাখ ২৫ হাজার ৩৮৮ জন, যা যেকোনো প্রার্থীর জন্য বড় রাজনৈতিক লড়াইয়ের ইঙ্গিত দেয়; জলাবদ্ধতা, ড্রেনেজ ব্যবস্থা, সড়ক অবকাঠামো, পরিচ্ছন্নতা, বিশুদ্ধ পানি ও নগর পরিকল্পনাই হবে মূল নির্বাচনী ইস্যু।
২০০২ সালে সিটি কর্পোরেশন হিসেবে উন্নীত হওয়ার পর থেকে মেয়র পদে বড় ধরনের পরিবর্তন হয়নি; প্রয়াত বদর উদ্দিন আহমেদ কামরান ২০০৩ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত টানা দুই মেয়াদে দায়িত্ব পালন করে নগর উন্নয়নের ভিত্তি গড়ে দেন; এরপর আরিফুল হক চৌধুরী ২০১৩ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত টানা দুই মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেন; ২০২৩ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হন আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী, কিন্তু ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে তিনি অপসারিত হন এবং প্রশাসনিক ধারাবাহিকতায় ব্যাঘাত ঘটে।
এখন রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রত্যাবর্তন, দ্রুত নির্বাচনের ঘোষণা এবং সম্ভাব্য প্রার্থীদের সক্রিয়তায় সিলেটের নগর রাজনীতি নতুন মোড়ে দাঁড়িয়ে; প্রশাসক হিসেবে আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরীর কর্মকৌশল, দলীয় ঐক্য রক্ষা, গ্রহণযোগ্য প্রার্থী নির্বাচন এবং নাগরিক ইস্যুতে বাস্তবসম্মত প্রতিশ্রুতি-সবকিছু মিলিয়েই নির্ধারিত হবে আসন্ন সিসিক নির্বাচনের গতি-প্রকৃতি, আর শেষ পর্যন্ত ভোটের রায়ই ঠিক করে দেবে কে বসবেন নগরপিতার আসনে এবং কতটা পূরণ হবে নগরবাসীর প্রত্যাশা।
জৈন্তা বার্তা/ ওয়াদুদ




