ভোলাগঞ্জ পুলিশ ফাঁড়ির আলোচিত সেই ইনচার্জ প্রত্যাহার
বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬, ০৬:১৯ AM

ভোলাগঞ্জ পুলিশ ফাঁড়ির আলোচিত সেই ইনচার্জ প্রত্যাহার

ফারুক আহমেদ, কোম্পানীগঞ্জ প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ২৪/০২/২০২৬ ১০:২৪:২২ PM

ভোলাগঞ্জ পুলিশ ফাঁড়ির আলোচিত সেই ইনচার্জ প্রত্যাহার

নিজস্ব


কর্তব্যে অবহেলা, চাঁদাবাজি, মামলার ভয় দেখিয়ে হয়রানি সহ নানা অপকর্মের দায়ে অভিযুক্ত কোম্পানীগঞ্জের ভোলাগঞ্জ পুলিশ ফাঁড়ির আলোচিত সেই ইনচার্জ এসআই কামরুল আলমকে প্রত্যাহার (ক্লোজড) করা হয়েছে। মঙ্গলবার (২৪ ফেব্রুয়ারী)  এপ্রিল) দুপুরে বিষয়টি নিশ্চিত করে কোম্পানীগঞ্জ থানার ওসি সফিকুল ইসলাম খান জানান, বর্তমানে তাকে সিলেট পুলিশ লাইনসে সংযুক্ত করা হয়েছে।জানা গেছে, এসআই কামরুল আলম ভোলাগঞ্জ পুলিশ ফাঁড়িতে ইনচার্জ হিসেবে যোগদানের পর থেকে চাঁদাবাজি সহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন। 

তাকে চাঁদা দিলেই চলে পাথরবাহি গাড়ি। চাঁদা না দিলে গাড়ি ধরে ফাঁড়িতে আটকে রাখেন। পরে মোটা অংকের চাঁদা নিয়ে ছাড়েন। মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়েও চাঁদা নেন। 

তার কথামতো চাঁদা না দিলে সন্ত্রাসী কায়দায় বাড়িঘরে হামলা, ভাংচুর ও মারধর করেন বলেও অভিযোগ ওঠেছে। 

এসআই কামরুলের এসব অপকর্মের বিরুদ্ধে দুই-একজন প্রকাশ্যে অভিযোগ করলেও হয়রানির ভয়ে মুখ খুলতে চান না কেউ। তার বিরুদ্ধে কেন ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না, সে প্রশ্নও তুলেন অনেকে।

এদিকে, এসআই কামরুল আলমের ওয়াকিটকি, প্রাইভেট কার এবং চায়নিজ কুড়াল সহ সোমবার দিবাগত গভীর রাতে কোম্পানীগঞ্জের দুই যুবককে আটক করে বিমানবন্দর থানা পুলিশ। বিষয়টির সত্যতা নিশ্চিত হওয়ার পর কোম্পানীগঞ্জ থানা থেকে তাকে প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়।

বিমানবন্দর থানা পুলিশের হাতে আটক দুইজন হলেন— কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার গণঅধিকার পরিষদের আহ্বায়ক লিটন মিয়া ও ভোলাগঞ্জ পুলিশ ফাঁড়ির বালু পাথরের লাইনম্যান (বালু, পাথর, চোরাইমাল বহনকারী গাড়ি থেকে টাকা উত্তোলনকারী) জুনায়েদ আহমদ।

এই দুজন আটক হওয়ার খবরে কোম্পানীগঞ্জজুড়ে আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। কারণ আটক লিটন মিয়া ভোলাগঞ্জ পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই কামরুল আলমের ঘনিষ্ঠ বন্ধু আর জুনায়েদ আহমদ ভোলাগঞ্জ পুলিশ ফাঁড়ির বালু পাথর ও চোরাই মালামালের লাইনম্যান হিসেবে পরিচিত।

কোম্পানীগঞ্জের স্থানীয় বেশ কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আটক লিটন মিয়া ট্রাক চালাতেন। কিন্তু চব্বিশের ৫ আগস্ট পর তিনি সমন্বয়ক হয়ে যান। এরপর ভিপি নূরের গণঅধিকার পরিষদের কোম্পানীগঞ্জের আহ্বায়ক হন। এরপর থেকেই ট্রাকচালক লিটন মিয়া পুলিশের সঙ্গে সখ্যতা করে চোরাকারবারে লিপ্ত হন। চোরাকারবার করতে তিনি নিজেকে সাংবাদিক পরিচয়ও দেন। 

লিটন যে ভোলাগঞ্জ পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই কামরুল আলমের ঘনিষ্ঠ বন্ধু তা সবমহলে স্বীকৃত। যে প্রাইভেটকার ও ওয়াকিটকি নিয়ে লিটন আটক হয়েছেন সেটা নিয়ে লিটন এলাকায় প্রায়ই ঘুরাঘুরি করতেন। চোরাচালানের পণ্যভর্তি ট্রাক এলাকা থেকে বেড়িয়ে যেতে সাহায্য করার জন্য তিনি নিয়মিত প্রাইভেটকার ও ওয়াকিটকি নিয়ে ট্রাকের পেছনে পেছনে যেতেন। 

এ ছাড়াও  কয়েকদিন আগে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার তিন গ্রামের সংঘর্ষের মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামি লিটন। এই ঘটনায় তিনি সেনাবাহিনীর হতে আটক হয়ে হাজতবাসও করেছেন।

আটক জুনায়েদ আহমদ সম্পর্কে এলাকাবাসী বলেন, জুনায়েদ আহমদ ভোলাগঞ্জ পুলিশ ফাঁড়ির বালু-পাথর ও চোরাই মালামালের লাইনম্যান হিসেবে স্বীকৃত। তার কাজ হচ্ছে কোম্পানীগঞ্জে যেসব এলাকায় বালু-পাথর উত্তোলন হয়, সেখানে এসব বহনকারী যানবাহন থেকে পুলিশ ফাঁড়ির জন্য টাকা উত্তোলন করা। এর পাশাপাশি সীমান্ত দিয়ে আসা চোরাই মালামাল ভর্তি যানবাহন থেকেও পুলিশ ফাঁড়ির জন্য টাকা উত্তোলন করেন জুনায়েদ আহমদ।

কোম্পানীগঞ্জের ইসলামপুর পশ্চিম ইউনিয়নের জালিয়ারপাড় গ্রামের ভুক্তভোগী আবুল মিয়া জানান, গত ১২ ফেব্রুয়ারীর নির্বাচনের কয়েকদিন আগে তার একটি ট্রাক্টর গাড়ি ফাঁড়িতে নিয়ে আটকে রাখেন এসআই কামরুল। পরে ৮০ হাজার টাকা নিয়ে গাড়ি ছাড়েন। 

বাহাদুরপুর গ্রামের রতন মিয়া জানান, সম্প্রতি তার একটি টাক্টর গাড়ি নোয়াগাঁও মাদ্রাসা সংলগ্ন রাজুর বাড়ির রাস্তা থেকে ধরে নিয়ে যান এসআই কামরুল। পরে তিনি ৫০ হাজার টাকা নিয়ে গাড়ি ছাড়িয়ে আনেন। 

শাহ আরেফিন এলাকার ইব্রাহিম জানান, নির্বাচনের দুইদিন আগে পাড়ুয়া উজানপাড়া এলাকায় তার পাথরবাহি গাড়ি আটকায় কামরুল। উপস্থিত সময়েই তাকে ৪০ হাজার টাকা দিয়ে গাড়ি ছাড়ান তিনি। 

স্থানীয় কয়েকজন জানান, চাঁদা না দেওয়ায় নির্বাচনের দুইদিন আগে পাড়ুয়া তিনতলা বিল্ডিংয়ের পেছনে ইদ্রিস আলী নামের এক ব্যক্তিকে মারধর করেন কামরুল। এসময় উত্তেজিত জনতা তাকে ধাওয়া করেন। তৎক্ষনাৎ ওসি সেখানে হাজির হয়ে কামরুলের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলে পরিস্থিতি সামাল দেন। পরে ৪০ হাজার টাকা দিয়ে এটা মিমাংসা করে নেন কামরুল। 

এছাড়া, নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক সূত্র জানায়, শাহ আরেফিন টিলায় পাথর উত্তোলন ও পরিবহন হয় এসআই কামরুল ইসলামের মর্জিতে। তার সিগন্যাল পেলেই শাহ আরেফিন থেকে পাথরের গাড়ির লাইন চলে, নইলে বন্ধ থাকে। যেদিন লাইন চলে, সেদিন গাড়ি প্রতি চাঁদা দিতে হয় ১ হাজার টাকা করে। এর বাইরে সাপ্তাহিক ভিত্তিতে নির্দিষ্ট কিছু গাড়ি থেকে চাঁদা নেওয়া হয়। চাঁদা আদায়ের সুবিধার্থে এসব গাড়িতে 'লাল ক্রস' চিহ্ন দিয়ে রাখা হয়েছে। 

জানা গেছে, এসআই কামরুলের হয়ে পুরান জালিয়ারপাড় গ্রামের আব্দুল বাছিরের পুত্র এসকে সোহেল সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সাথে লিয়াজোঁ করে চাঁদার টাকা সংগ্রহ করতেন। তাকে সহযোগিতা করতেন কনস্টেবল তোষার ও দ্বিমান।

জৈন্তাবার্তা/সুলতানা