তিন মাস পর খুলল সুন্দরবনের দ্বার, পর্যটনে ফিরছে প্রাণ
মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:৩৩ PM

তিন মাস পর খুলল সুন্দরবনের দ্বার, পর্যটনে ফিরছে প্রাণ

জৈন্তা বার্তা ডেস্ক

প্রকাশিত: ০১/০৯/২০২৬ ০৬:২৬:১০ PM

তিন মাস পর খুলল সুন্দরবনের দ্বার, পর্যটনে ফিরছে প্রাণ

সংগৃহিত


প্রজনন মৌসুম উপলক্ষে তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা শেষে সুন্দরবনে প্রবেশের সুযোগ মিলেছে জেলে ও পর্যটকদের। তবে নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ার প্রথম দিন মঙ্গলবার সুন্দরবনে যাওয়ার ক্ষেত্রে জেলেদের তেমন আগ্রহ দেখা যায়নি। টানা বৃষ্টি, নদীতে মরা জোয়ার, কম মাছ পাওয়া এবং দস্যুদের আতঙ্ক-সব মিলিয়ে বনে যেতে দ্বিধায় রয়েছেন অনেক জেলে। অন্যদিকে, পর্যটকদের আনাগোনায় প্রাণ ফিরতে শুরু করেছে সুন্দরবনের পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে।

বুড়িগোয়ালিনী ফরেস্ট স্টেশনের কর্মকর্তা ইরফান উদ্দীন জানান, তাঁর স্টেশনের আওতায় ৯৫৪টি নৌযানের বোট লাইসেন্স সার্টিফিকেট (বিএলসি) রয়েছে। মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ১১টা পর্যন্ত জহর আলী ছাড়া আর কোনো জেলে অনুমতিপত্র নিতে আসেননি। সকাল থেকেই বৃষ্টি হচ্ছে। এর মধ্যে নদীতে মরা জোয়ার থাকায় মাছও কম পাওয়া যাচ্ছে। তবে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জেলেদের সংখ্যা বাড়তে পারে।

সুন্দরবন সাতক্ষীরা রেঞ্জের কৈখালী ফরেস্ট স্টেশনের কর্মকর্তা শ্যামা প্রসাদ রায় বলেন, কৈখালী ও পাশের কদমতলা ফরেস্ট স্টেশন মিলিয়ে বেলা সাড়ে ১১টা পর্যন্ত ৩৭ জন জেলে সুন্দরবনে অবস্থানের অনুমতি নিয়েছেন। অথচ এ দুটি স্টেশনের আওতায় মোট ১ হাজার ২৬টি নৌযানের বিএলসি রয়েছে।

বুড়িগোয়ালিনী ফরেস্ট স্টেশনসংলগ্ন নদীতে নৌকার পাটাতন মেরামত করছিলেন জেলে খায়রুল সানা। সুন্দরবনে মাছ ও কাঁকড়া ধরেই তাঁর সংসার চলে। তিন মাস বনে প্রবেশ করতে না পারায় কষ্টে দিন কাটাতে হয়েছে তাঁকে। খায়রুল বলেন, ‘এখন মাছ ধরতে না পারলে সংসার চলবে না। দুপুরের জোয়ারে বনে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি। একটু পরে পাস নেব।’

জেলেদের অভিযোগ, নিষেধাজ্ঞার সময়ও কেউ কেউ বন বিভাগের নজর এড়িয়ে সুন্দরবনে ঢুকে বিষ প্রয়োগ করে মাছ ধরেছেন। এতে মাছ ও কাঁকড়ার সংখ্যা কমে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন তাঁরা। পাশাপাশি দস্যুদের চাঁদাবাজির ভয়ও জেলেদের বনে প্রবেশের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করছে।

জেলে আব্দুর বারী বলেন, একটি নৌকায় সাধারণত দুই থেকে তিনজন জেলে থাকেন। তাঁরা ছয় দিন পর্যন্ত বনে অবস্থান করে মাছ ও কাঁকড়া ধরে ফিরে আসেন। বছরের প্রায় নয় মাস এভাবেই সুন্দরবন থেকে মাছ ও কাঁকড়া আহরণ করে তাঁদের জীবিকা চলে। তিনি বলেন, ‘এবার বন্ধের সময় অনেকে বিষ মেরে সব শেষ করেছে। তাই এবার আয় কেমন হবে, বলা যাচ্ছে না।’

তবে জেলেদের তুলনায় সুন্দরবনে পর্যটকদের আগ্রহ বেশি দেখা গেছে। তিন মাস পর সুন্দরবন খুলে দেওয়ায় পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে শুরু হয়েছে মানুষের আনাগোনা।

সুন্দরবন ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন (টিওএএস) সূত্রে জানা গেছে, সংগঠনটির অধীনে বর্তমানে ৭৫টি নৌযান রয়েছে। সংগঠনের সভাপতি মো. মঈনুল ইসলাম জোয়ার্দ্দার বলেন, মঙ্গলবার প্রথম দিন খুলনা থেকে সাতটি লঞ্চ ২২০ জন পর্যটক নিয়ে সুন্দরবনের উদ্দেশে যাত্রা করেছে।

শ্যামনগরের সুন্দরবনঘেঁষা মালঞ্চ নদীর পাড় থেকে দুই পর্যটককে নিয়ে বনের উদ্দেশে রওনা হন মুন্সিগঞ্জ এলাকার নৌকার মাঝি সাগর হোসেন। তিনি বলেন, ‘আমি নৌকা নিয়ে বনে মাছ ধরতে যাই না, পর্যটক নিয়ে ঘুরি। মালঞ্চ নদী ধরে বনের ভেতরে মায়ের খাল পর্যন্ত নিয়ে যাই। সেখানে প্রায় এক ঘণ্টা ঘোরাই। এক ঘণ্টার জন্য ১ হাজার ২০০ টাকা নিই। আজই প্রথম ট্রিপ নিয়ে যাচ্ছি।’

সাতক্ষীরা হয়ে সুন্দরবনে যাওয়া পর্যটকদের কাছে কলাগাছিয়া ও দুবেকী অন্যতম আকর্ষণীয় গন্তব্য। এ ছাড়া হারবাড়িয়া, শেখেরটেক ও দুবেকীতে যেতে বন বিভাগের বিশেষ অনুমতি প্রয়োজন। এক দিনের ভ্রমণে সুন্দরবনের কাছাকাছি যেতে চাইলে মোংলার করমজল ও হারবাড়িয়াও পর্যটকদের পছন্দের জায়গা।

সুন্দরবনের প্রায় ৭০ শতাংশ এলাকা অভয়ারণ্য হিসেবে সংরক্ষিত। এসব এলাকায় সাধারণভাবে মাছ ধরা বা প্রবেশের সুযোগ নেই। ফলে বনে প্রবেশের অনুমতি পেলেও অভয়ারণ্য এলাকায় ইচ্ছেমতো ঘোরাফেরা করা যাবে না। পর্যটকদের নির্ধারিত পর্যটনকেন্দ্র ও অনুমোদিত পথেই চলতে হবে। বন বিভাগ জানিয়েছে, সুন্দরবনের পশ্চিম ও পূর্ব বিভাগের চারটি রেঞ্জে এবার ১২ হাজার নৌযানকে বিএলসি দেওয়া হচ্ছে।

সুন্দরবন ভ্রমণের সময় পরিবেশের ক্ষতি হয়-এমন সামগ্রী ব্যবহার ও কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকার নির্দেশনা দিয়েছে বন বিভাগ। প্লাস্টিকের বোতল, খাবারের প্যাকেটসহ কোনো ধরনের বর্জ্য বনে না ফেলে নির্ধারিত ওয়েস্টবিনে ফেলার অনুরোধ করা হয়েছে।

সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় কর্মকর্তা এ জেড এম হাসানুর রহমান বলেন, পর্যটকদের যাতায়াতের জন্য প্রয়োজনীয় পন্টুনগুলো মেরামত করা হয়েছে এবং পর্যটনকেন্দ্রগুলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হয়েছে। পর্যটক ও মৎস্যজীবীদের নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সুন্দরবনের ক্যাম্প ও স্টেশনগুলোকে সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় পর্যটক, জেলে ও বননির্ভর মানুষের দায়িত্বশীল আচরণ জরুরি। পরিবেশ ও বন্য প্রাণীর ক্ষতি হয়-এমন কোনো কর্মকাণ্ড বরদাশত করা হবে না।

জৈন্তা বর্তা / ওয়াদুদ