ধনী পরিবারের শিশুদের রক্তে সিসার মাত্রা বেশি
রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ০১:৩৭ অপরাহ্ন

গবেষণায় উদ্বেগজনক তথ্য

ধনী পরিবারের শিশুদের রক্তে সিসার মাত্রা বেশি

জৈন্তা বার্তা ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৫/১০/২০২৬ ১১:৫৬:২৫ পূর্বাহ্ন

ধনী পরিবারের শিশুদের রক্তে সিসার মাত্রা বেশি

সংগৃহিত


দেশে নিম্ন আয়ের পরিবারের তুলনায় ধনী পরিবারের শিশুদের রক্তে সিসার উচ্চমাত্রা বেশি পাওয়া গেছে। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের নিয়ে পরিচালিত জাতীয় জরিপের তথ্য বিশ্লেষণ করে এ চিত্র উঠে এসেছে। গবেষণা অনুযায়ী, দেশের ১২ থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের ৩৮ দশমিক ৫ শতাংশের রক্তে প্রতি ডেসিলিটারে ৫ মাইক্রোগ্রাম বা তার বেশি সিসা রয়েছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, সবচেয়ে দরিদ্র ২০ শতাংশ পরিবারের শিশুদের ৩০ দশমিক ২ শতাংশের রক্তে সিসার মাত্রা বেশি। অন্যদিকে, সবচেয়ে ধনী ২০ শতাংশ পরিবারের শিশুদের ক্ষেত্রে এ হার ৫১ দশমিক ৯ শতাংশ। দুই শ্রেণির মধ্যে ব্যবধান ২১ দশমিক ৭ শতাংশীয় পয়েন্ট।

শিশুদের জন্য সিসার সংস্পর্শ একটি গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি। সিসা মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের স্বাভাবিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। এর ফলে বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা কমে যাওয়া, মনোযোগের ঘাটতি, শেখার অসুবিধা ও আচরণগত সমস্যা দেখা দিতে পারে। এ ছাড়া সিসার প্রভাবে রক্তস্বল্পতা, কিডনির ক্ষতি ও উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকিও বাড়তে পারে। অনেক ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক কোনো লক্ষণ না থাকলেও শিশুর স্বাভাবিক বিকাশ ব্যাহত হতে পারে।

যেভাবে করা হয়েছে গবেষণা

গবেষণাটির শিরোনাম ‘সোশ্যাল প্যাটার্নিং অব এলিভেটেড ব্লাড লিড অ্যামাং চিলড্রেন এজড ১২-৫৯ মান্থস ইন বাংলাদেশ: অ্যা ন্যাশনাল ক্রস-সেকশনাল অ্যানালাইসিস অব মিকস ২০২৫’। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব হেলথ ইকোনমিকসের গবেষক সৈয়দ তৌসিক হোসেন ও মো. ইমাম হাসান এ গবেষণা পরিচালনা করেন। চলতি মাসের ১৪ অক্টোবর চিকিৎসা ও জনস্বাস্থ্যবিষয়ক গবেষণাপত্র প্রকাশের অনলাইন প্ল্যাটফর্ম মেডআর্কাইভে গবেষণাটি প্রকাশিত হয়।

গবেষকেরা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) পরিচালিত ২০২৫ সালের মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভের (মিকস) তথ্য বিশ্লেষণ করেছেন। জাতিসংঘের শিশু তহবিলের (ইউনিসেফ) কারিগরি সহায়তায় পরিচালিত এ জরিপে শিশু ও নারীদের স্বাস্থ্য, পুষ্টি, শিক্ষা, জীবনযাত্রা এবং পরিবেশগত ঝুঁকিসহ বিভিন্ন বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হয়।

জরিপে ১২ থেকে ৫৯ মাস বয়সী ১৮ হাজার ৯০৫ শিশুকে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল। তাদের মধ্যে ১০ হাজার ৬২২ শিশুর রক্তে সিসার পরীক্ষার ফল পাওয়া যায়। আর্থসামাজিক বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় নিয়ে করা মূল বিশ্লেষণে ৯ হাজার ৭১৭ শিশুর তথ্য ব্যবহার করা হয়।

গবেষণায় প্রতি ডেসিলিটার রক্তে ৫ মাইক্রোগ্রাম বা তার বেশি সিসা থাকাকে উচ্চমাত্রা হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। পরিবারের সম্পদ, মায়ের শিক্ষাগত যোগ্যতা, বসবাসের এলাকা, ঘরের অবস্থা ও অন্যান্য বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে শিশুদের রক্তে সিসার উচ্চমাত্রার সম্পর্ক বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষকেরা নতুন করে শিশুদের রক্ত পরীক্ষা করেননি; জাতীয় জরিপে সংগৃহীত তথ্য ব্যবহার করে এ বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

ধনী পরিবারের শিশুদের ঝুঁকি বেশি কেন

গবেষক সৈয়দ তৌসিক হোসেনের মতে, ধনী পরিবারের শিশুরা তুলনামূলক বেশি প্যাকেটজাত খাবার খেতে পারে। তাদের বাসায় আসবাব, দেয়ালের রং, সাজসজ্জার সামগ্রী ও বিভিন্ন ধরনের তৈজসপত্রও বেশি থাকতে পারে। এসব পণ্যের কোনো কোনোটিতে সিসা থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে এসব পণ্যের সংস্পর্শ শিশুদের শরীরে সিসা প্রবেশের সম্ভাব্য পথ হতে পারে।

শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মোহাম্মদ সহিদুল্লাও মনে করেন, ধনী পরিবারের শিশুদের সিসার সংস্পর্শে আসার সুযোগ তুলনামূলক বেশি হতে পারে। তাঁর মতে, এসব পরিবারের শিশুরা আমদানি করা খেলনা ও সাজসজ্জার সামগ্রী বেশি ব্যবহার করতে পারে। এ ছাড়া পোলট্রির মুরগির খাবারে সিসা থাকলে খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমেও মানুষের শরীরে তা প্রবেশের আশঙ্কা রয়েছে।

তবে গবেষণায় প্যাকেটজাত খাবার, খেলনা, আসবাব, দেয়ালের রং কিংবা মুরগির মাংসকে সিসার উৎস হিসেবে আলাদাভাবে পরীক্ষা করা হয়নি। তাই ধনী পরিবারের শিশুদের রক্তে সিসার উচ্চমাত্রার নির্দিষ্ট কারণ হিসেবে এসব উপাদানকে নিশ্চিতভাবে চিহ্নিত করা যায় না।

সিসা শিশুর বিকাশে কী ধরনের ক্ষতি করে

সিসা শরীরে প্রবেশের পর রক্তের মাধ্যমে মস্তিষ্ক, যকৃৎ, কিডনি ও হাড়সহ বিভিন্ন অঙ্গে পৌঁছাতে পারে। শিশুদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি বেশি, কারণ এ সময়ে তাদের মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের বিকাশ চলতে থাকে।

শিশুবিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আবিদ হোসেন মোল্লা বলেন, সিসার সংস্পর্শে শিশুর বিকাশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কি না, তা শুধু বাহ্যিক চেহারা বা তাৎক্ষণিক উপসর্গ দেখে বোঝা যায় না। উচ্চমাত্রার সিসার সংস্পর্শে গুরুতর উপসর্গ দেখা দিতে পারে। তবে অপেক্ষাকৃত কম মাত্রার সংস্পর্শও শিশুর বিকাশের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। এর ফলে মস্তিষ্কের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হওয়া, স্নায়ুর কার্যকারিতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং হিমোগ্লোবিনের মাত্রা কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।

অধ্যাপক আবিদ হোসেন মোল্লা ও অধ্যাপক মোহাম্মদ সহিদুল্লা জানিয়েছেন, আগের তুলনায় স্নায়ুর বিকাশজনিত সমস্যায় আক্রান্ত শিশু তাঁদের কাছে বেশি আসছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মতে, শিশুদের রক্তে সিসার এমন কোনো মাত্রা নেই, যাকে সম্পূর্ণ নিরাপদ বলা যায়। তাই সিসার সংস্পর্শ কমানো এবং সম্ভাব্য উৎস শনাক্ত করে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

আগের গবেষণাতেও উঠে এসেছে উদ্বেগের চিত্র

বাংলাদেশে শিশুদের রক্তে সিসার উপস্থিতি এবং তাদের বিকাশের ওপর এর প্রভাব নিয়ে আগেও গবেষণা হয়েছে।

২০১৬ সালে ‘এনভায়রনমেন্টাল হেলথ’ সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি গবেষণায় সিরাজদিখান ও পাবনার ৫২৪ শিশুর তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। ২০ থেকে ৪০ মাস বয়সী শিশুদের রক্তে সিসার মাত্রা পরিমাপের পাশাপাশি তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক ও মোটর বিকাশ মূল্যায়ন করা হয়েছিল। এতে সিরাজদিখানের শিশুদের রক্তে সিসার মাত্রা তুলনামূলক বেশি পাওয়া যায়। ওই এলাকায় রক্তে সিসার মাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে শিশুদের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের পরীক্ষায় কম স্কোর পাওয়ার সম্পর্কও দেখা যায়।

২০২০ সালে ‘জার্নাল অব নিউরোডেভেলপমেন্টাল ডিজঅর্ডারস’ সাময়িকীতে প্রকাশিত বাংলাদেশের ৭৩৪ শিশুর আরেকটি গবেষণায় জন্মের সময় নাড়ির রক্তে সিসার মাত্রা এবং দুই থেকে তিন বছর বয়সে তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ বিশ্লেষণ করা হয়। এতে অপুষ্টিজনিত খর্বাকৃতির শিশুদের ক্ষেত্রে গর্ভকালীন সিসার সংস্পর্শের সঙ্গে বুদ্ধিবৃত্তিক স্কোর কম হওয়ার সম্পর্ক পাওয়া যায়। তবে সব এলাকায় এ সম্পর্ক একই রকম ছিল না।

গবেষকদের ধারণা, অপুষ্টি ও খর্বাকৃতি শিশুদের সিসার ক্ষতিকর প্রভাবের প্রতি আরও সংবেদনশীল করে তুলতে পারে। তবে এসব গবেষণার ফলাফল সিসার সংস্পর্শ ও বিকাশজনিত সমস্যার মধ্যে সম্পর্ক নির্দেশ করে; প্রতিটি শিশুর সমস্যার একমাত্র কারণ সিসা, এমন সিদ্ধান্ত দেয় না।

ঢাকায় সর্বোচ্চ, রাজশাহীতে সর্বনিম্ন

২০২৫ সালের মিকসের প্রাথমিক ফলাফল অনুযায়ী, বিভাগভেদে শিশুদের রক্তে সিসার উচ্চমাত্রার হারে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে।

ঢাকায় ১২ থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের ৬৫ দশমিক ২ শতাংশের রক্তে সিসার উচ্চমাত্রা পাওয়া গেছে। সিলেটে এ হার ৪৬ দশমিক ৭ শতাংশ এবং চট্টগ্রামে ৪২ দশমিক ১ শতাংশ।

অন্যদিকে, বরিশালে এ হার ২৯ শতাংশ, ময়মনসিংহে ৩০ দশমিক ৬ শতাংশ, খুলনায় ১৭ দশমিক ৮ শতাংশ, রাজশাহীতে ১৫ দশমিক ৯ শতাংশ এবং রংপুরে ১৯ দশমিক ৬ শতাংশ।

গবেষকদের সমন্বিত পরিসংখ্যানগত বিশ্লেষণেও বিভাগভেদে এ পার্থক্য পাওয়া গেছে। বরিশালকে তুলনার ভিত্তি ধরে করা বিশ্লেষণে ঢাকায় শিশুদের রক্তে সিসার উচ্চমাত্রার সঙ্গে বেশি সম্পর্ক এবং রাজশাহীতে তুলনামূলক কম সম্পর্ক দেখা গেছে।

গবেষণার ফলাফল শিশুদের সিসার সংস্পর্শের উৎস শনাক্ত, ঝুঁকিপূর্ণ পণ্য ও পরিবেশ পর্যবেক্ষণ এবং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে।সূত্র :প্রথম আলো

জৈন্তা বর্তা / ওয়াদুদ



শীর্ষ সংবাদ:

নিম্নচাপ রূপ নেবে প্রবল ঘূর্ণিঝ/ড়ে, আ/ঘাত হানতে পারে বুধবার
দেশে স্বর্ণের দামে বড় পতন, ভরিতে কমল ৩ হাজার ৩২৪ টাকা
সাইবার ঝুঁকিতে দেশের একাধিক ওয়েবসাইট বন্ধ
প্রধানমন্ত্রী কাল জাপান যাচ্ছেন, বিনিয়োগে নতুন গতির আশা
শেষ পর্যন্ত বাঁচানো গেল না শাবিপ্রবির মুনিরাকে
মক্কায় দুই বাংলাদেশির মৃ/ত্যুদ/ণ্ড: অ/পরাধ, বিচার ও ম/রদেহের বিষয়ে তথ্য চেয়েছে বাংলাদেশ
'আমার মৃ/ত্যুর জন্য ইউএনও দায়ী’-এসিল্যান্ডের ফেসবুক পোস্ট ঘিরে আলোচনা
শাহজালাল মাজারের দানবাক্সে মিলল ৮৮ লাখ ৬৫ হাজার টাকা
নবীগঞ্জ থানার হাজতে ছাত্রলীগ নেতার ভিডিও ধারণ, সহযোগী গ্রে/প্তার
দুর্নী/তিবাজ-চাঁদা/বাজদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছে না সরকার: শফিকুর রহমান