কনকনে শীতে বিশ্বনাথের গোয়াহরি বিলে ‘বার্ষিক পলো বাওয়া’ উৎসব
শনিবার, ২৩ মে ২০২৬, ০২:১১ AM

দিনদিন কমছে মাছের আধিক্য

কনকনে শীতে বিশ্বনাথের গোয়াহরি বিলে ‘বার্ষিক পলো বাওয়া’ উৎসব

মোঃ সায়েস্তা মিয়া, বিশ্বনাথ প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ০১/০১/২০২৬ ০৪:৪৬:২৭ PM

কনকনে শীতে বিশ্বনাথের গোয়াহরি বিলে ‘বার্ষিক পলো বাওয়া’ উৎসব

ছবি: জৈন্তা বার্তা


ঘণ কুয়াশাচ্ছন্ন আকাশ আর শীতের তীব্রতাকে উপেক্ষা করে বাঁশ-বেতের তৈরী পলো দিয়ে ‘ঝপ-ঝপা-ঝপ’ শব্দের তালে তালে প্রতি বছরের ন্যায় এবারও উৎসব মুখর পরিবেশে সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার দৌলতপুর ইউনিয়নের গোয়াহরি গ্রামের বড় বিলে (দক্ষিণের বড় বিল) পালন করা হয়েছে বার্ষিক পলো বাওয়া উৎসব।

অতীতের ইতিহাসে আনা হয়েছে পরিবর্তন। গেল বছরগুলোতে প্রতি মাঘ মাসের পহেলা তারিখ এই উৎসব পালন করা হলেও এবার বিলের পানি কমে যাওয়ার কারণে নির্দিষ্ট সময়ের প্রায় ১৫ দিন পূর্বে ইংরেজী নববর্ষের দিনে আজ পালন করা হয়েছে আবহমান বাংলার ঐতিহ্যবাহী পলো বাওয়া উৎসব।

প্রতি বছরের ন্যায় এবারও চিরায়ত বাংলার ঐতিহ্যবাহী পলো বাওয়া উৎসবে যোগ দিতে দেশে এসেছেন অনেক প্রবাসী এবং স্বামী-সন্তান নিয়ে পিত্রালয়ে বেড়াতে এসেছেন গ্রামের অনেক মেয়েরা। গ্রামবাসীর মিলনমেলার ওই পলো বাওয়া উৎসবকে কেন্দ্র করে গোয়াহরি গ্রামে গত কয়েক দিন ধরে বিরাজ করছে উৎসবের আমেজ। তবে বিলের পানি কম থাকায় ও তীব্র শীতের কারণে এবারের পলো বাওয়া উৎসবে অন্যান্য বছরের তুলনায় কম মাছ শিকার করতে পেরেছেন সৌখিন শিকারীরা। মাছের আধিক্য কমছে দিনদিন। 

বৃহস্পতিবার (১ জানুয়ারী) সকাল ১০টায় শুরু হওয়া বার্ষিক পলো বাওয়া উৎসব শুরুর পূর্বে সকাল থেকেই বিলের পাড়ে উৎসবের আমেজ সৃষ্টি হয়। আর নির্দিষ্ট সময়ের পূর্বেই বিলের তীরে চলে আসা গ্রামের সকল বয়সের পুরুষরা ও অন্য গ্রাম থেকে আসা আত্মীয় স্বজন এক সাথে জড়ো হয়ে পলো হাতে হৈ-হুল্লোড় করে বিলে নামেন মাছ শিকার করতে। তবে বিলে পানি কম থাকায় ও শীতের তীব্রতার কারণে বেশির ভাগ শিকারীকেই ফিরতে হয়েছে খালি হাতে। 

পূর্ব পুরুষদের রেখে যাওয়া ঐতিহ্য যুগ যুগ ধরে আজোও বুকে ধারণ করে রেখেছেন গোয়াহরি গ্রামের বর্তমান প্রজন্মের বাসিন্দারা। নিজেদের ঐতিহ্য অনুযায়ী প্রতি বছর মাঘ মাসের পহেলা তারিখ আনুষ্ঠানিকভাবে পলো বাওয়া উৎসব পালন করা হলেও এবার নির্দিষ্ট সময়ের প্রায় ১৫ দিন পূর্বেই পালিত হয়েছে উৎসবটি। আজ (বৃহস্পতিবার) থেকে আগামী ১৫ পর্যন্ত দিন চলবে মাছ শিকারের এই উৎসব। গোয়াহরি গ্রামের পঞ্চায়েতের পক্ষ থেকে ওই পনের দিন বিলে মাছ ধরার ক্ষেত্রে নেই কোন নিশেধাজ্ঞা। এজন্য ওই পনের দিনের ভিতরে বিলে গ্রামের যে কেউ হাত দিয়ে বা টেলা জাল (হাতা জাল) দিয়ে মাছ ধরতে পারবেন। তবে গ্রামবাসীর ঐতিহ্য অনুযায়ী আগামী ১৫ দিন পর ২য় ধাপে এক সাথে আবারও পলো বাওয়া উৎসবে যোগ দিবেন গ্রামবাসী।

গ্রামবাংলার ঐতিহ্যের ওই পলো বাওয়া উৎসবে পলোর সাথে সাথে টেলা জাল (হাত জাল), উড়াল জাল, চিটকি জাল, কুচা’সহ মাছ শিকারের বিভিন্ন রকমের সরঞ্জাম নিয়ে মাছ শিকারে অংশ গ্রহন করেন কয়েক শতাধিক সৌখিন শিকারী। শিকারীদের হাতে শিকার হওয়া মাছের মধ্যে রয়েছে- বোয়াল, কাতলা, রুই, কার্প, শউল, গণিয়া, মিরকা, কাতলা’সহ বিভিন্ন প্রজাতির ছোট বড় মাছ। 

মিলনমেলার ওই পলো বাওয়া উৎসবে যোগ দিতে ও দেখতে বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই গোয়াহরি গ্রামবাসীর পাশাপাশি আশপাশের গ্রামের লোকজন বিলের পাড়ে এসে জমায়েত হতে থাকেন। পুরুষদের পাশাপাশি নারী শিশুরাও আসেন বিলে পাড়ে। ঝপ-ঝপা-ঝপ শব্দের তালে তালে প্রায় ২ ঘন্টা সময়ব্যাপী চলে বার্ষিক পলো বাওয়া উৎসব। অতিরিক্ত ঠান্ডার কারণে ঠিকমতো পলো বাইতে পারেননি অনেকেই। তবে মাছ শিকার করতে নিজ নিজ পলো নিয়ে বিলের ঝাঁপিয়ে পড়া শিকারীদেরকে এসময় মাছ ধরার এ দৃশ্যটি উপভোগ করতে বিলের পারে আসা শিশু থেকে বৃদ্ধ বয়সের পুরুষ-মহিলা এবং দূর থেকে আসা আত্বীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধব দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে উৎসাহ দিতে দেখা যায়।

প্রবাসী রেজাউল করিম বলেন, দীর্ঘদিন পর দেশে এসে পলো বাওয়া উৎসবে যোগ দিয়েছি। বোয়াল-কাতলা’সহ একাধিক মাছ শিকার করতে পেরে খুবই আনন্দ লাগছে।

গ্রামের লাল মিয়া, ইকবাল হোসেন ও প্রবাসী মনোয়ার হোসেন বলেন, এবার শীতের তীব্রতা খুবই বেশি থাকার কারণে অনেক সৌখিন শিকারীই বেশি সময় বিলের পানিতে থাকতে পারেনি। আর বিলের পানির পরিমাণ কম থাকায় মাছ শিকারও কম হয়েছে।

যুবক আব্দুল লতিফ বলেন, শীতের মধ্যে পলো বাওয়া উৎসবে যোগ দিয়ে মাছ শিকার করা ঈদের আনন্দের মতোই লাখছে। তবে মাছের পরিমাণ এবার অন্যান্য বছরের তুলনায় অনেক কম।

সৌখিন মাছ শিকারী সুয়েব খান বলেন, মাছ শিকার করে ভালোই লাগছে। তবে বড় মাছের তুলনায় ছোট মাছের পরিমাণ বেশি।

গ্রামের প্রবীন মুরব্বী ও যুক্তরাজ্য প্রবাসী হাজী তৈমুছ আলী বলেন, এখন আর আগের মতো মাছ শিকার করা যায়না। বিলটি ভরাট হয়ে যাওয়ায় ও পানির চলাচল না থাকায় এমন পরিস্থিতি সৃস্টি হয়েছে। তবে দীর্ঘদিন পর আবারও পলো বাওয়া উৎসবে যোগ দিতে পেরে খুবই আনন্দ পেয়েছি।

গ্রামের আরেক প্রবীন মুরব্বী হাজী আব্দুল কুদ্দুছ বলেন, আমাদের পূর্ব পূরুষগণ সারা বছরই বিল থেকে মাছ শিকার করে খেয়েছেন। সময়ে পরিবর্তনের সাথে সাথে বিলে পানি ও মাছের পরিমাণ কমে এসেছে। তাই এখন পলো বাওয়া উৎসবে যোগ দেওয়া অনেককেই খালি হাতে ঘরে ফিরতে হয়। 

বিশ্বনাথ উপজেলার দৌলতপুর ইউনিয়ন পরিষদের স্থানীয় মেম্বার গোলাম হোসেন বলেন, বিলে পানির পরিমাণ কমে যাওয়ার কারণে এবার নির্দিস্ট সময়ের প্রায় ১৫ দিন পূর্বেই বার্ষিক পলো বাওয়া উৎসব গ্রাম পাঞ্চায়েতের সিদ্ধান্ত মতেই এগিয়ে আনা হয়েছে।

জৈন্তা বার্তা/ ওয়াদুদ